ফুলহাতা কামিজ আর হিজাব সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়েছে চিরচেনা শাবানাকে। চলচ্চিত্র ছেড়ে পরিপূর্ণ ধার্মিক হয়ে উঠেছেন বাংলা ছবির জীবন্ত এ কিংবদন্তী। স্বামী এক সময়কার জাঁদরেল প্রযোজক ওয়াহিদ সাদিক, দুই মেয়ে এবং একমাত্র পুত্রকে নিয়ে শাবানা যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন গত ২৩ বছর ধরে। বছর দুয়েক পর পর ঢাকায় বেড়াতে আসেন। কদিন ঘুরে, আবার ফিরে যান মার্কিন মুলুকে। গত ডিসেম্বরে ঢাকায় এসেছেন শাবানা। ফিরবেন চলতি সপ্তাহেই। তার আগে শাবানা তার বারিধারার বাসায় সোমবার সন্ধ্যায় স্মৃতির ঝাঁপি খুলেছিলেন চ্যানেল আই অনলাইনের সঙ্গে আলাপে।
সন্ধ্যা ৭ টায় সময় দিয়েছিলেন শাবানা ও তার স্বামী ওয়াহিদ সাদিক। কিন্তু বারিধারা যেতে যেতে রাজধানীর জ্যাম পাক্কা ৫৫ মিনিট দেরি করিয়ে দেয়। বারিধারায় ঠিকানা খুঁজে যখন শাবানার বাসার দরোজায় কলিং বেল বাজাই, তখন কাটায় কাটায় রাত ৮টা! দরোজা খোলেন, ওয়াহিদ সাদিক। কুশল বিনিময় সেরেই তিনি বলেন, ‘ঢাকার ট্রাফিক এখন মেজর প্রবলেম। আগে এমন ছিল না। যে সময় জ্যাম নষ্ট করেছে তাতে আমেরিকার এক স্টেট থেকে অন্য স্টেটে অনায়াসে যাওয়া যেত। এখন মানুষ যতো, গাড়িও তত!’ এর ফাঁকেই দরোজার ওপাশ থেকে একগাল হাসি দিয়ে উঁকি দিলেন শাবানা। আহা! সেই চিরচেনা হাসি। এখনও যেন আগের মতো রঙিন শাবানা। তবে বদলে ফেলেছেন কর্মপথ।
শাবানার ড্রয়িং রুমে ঢুকতেই দেখা গেল, তার বিভিন্ন অর্জন ও সম্মাননায় সেলফ ভর্তি! স্বামী-সন্তান ও সোনালি দিনের বিভিন্ন ছবিতে সাজানো ঘর। এক কথায় দুকথায় জমে উঠলো শাবানার সঙ্গে আলাপ। প্রথমেই তিনি জানালেন, তার চলচ্চিত্রে আসার ঘটনা। বললেন, চলচ্চিত্রে আমার প্রথম অভিনয় প্রয়াত এহতেশাম সাহেবের মাধ্যমে। উনি ছিলেন আমার বাবার ফুফাতো ভাই। ‘নতুন সুর’ আমার প্রথম ছবি। তখন আমি ক্লাস ফাইভে পড়ি। উনি আমার বাবাকে বলেছিলেন, ‘তোর মেয়েটাকে আমি একটি ছবিতে নিতে চাই।’ বাবা তখন এভাবে বলেছিলেন, ‘আমার মেয়ে কীভাবে অভিনয় করবে! সে এতো লাজুক কারও সামনেই আসতে চায় না।’ কিন্তু এহতেশাম সাহেব ছিলেন নাছোড়বান্দা! উনি বলেছিলেন, ‘তোর মেয়েটার মতো একটা মেয়েই আমি খুঁজছি। এরপর বাবা রাজি হন।’ ওই ছবির নায়ক-নায়িকা ছিলেন রহমান-রওশানারা। একটা বাড়িতে শুটিং হয়েছিল। প্রথম শট ছিল এমন, খুশিতে আমি দৌড়ে এসে বলবো, ‘ভাইয়া ভাইয়া আপুর বিয়ে। আমাকে জড়িয়ে ভাইয়া বলবে তাই নাকি রে!’ প্রথম শটই ওকে ছিল। তারপর থেকে মায়ের চেয়ে বাবাই সবচেয়ে বেশি সাপোর্ট করেছেন। আমার বাবাও কিন্তু দুটো ছবি পরিচালনা করেছিলেন। ‘মুক্তি’ এবং ‘মালকাবানু’। এরমধ্যে ‘মালকাবানু’ ছবি বাম্পারহিট ছবি। গানগুলো এখনও মানুষ গায়।
শাবানা যখন স্মৃতির ভুবনে, তখন পাশেই বসা ছিলেন স্বামী ওয়াহিদ সাদিক। যিনি নামকরা প্রযোজক, এসএস প্রোডাকশন (শাবানা সাদিক)-এর কর্ণধার। এহতেশাম, আমজাদ হোসেন, সুভাষ দত্ত, আজিজুর রহমান, মতিন রহমানদের মতো কিংবদন্তী নির্মাতারা এ প্রোডাকশনের ছবি বানিয়ে নিজেদের সমৃদ্ধ করেছেন। শাবানা প্রথম ওয়াহিদ সাদিকের প্রযোজনায় নায়িকা হিসেবে অভিনয় করেন ‘চকোরী’ ছবিতে। প্রথম ছবিতে পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন কত? জানতে চাইলেই হেসে ফেলেন দেশ বরেণ্য এ অভিনেত্রী।
বলেন, ‘আমাকে একটু মনে করার সময় দাও।’ পাশ থেকেই ওয়াহিদ সাদিক বললেন, ৫ কোটি! সঙ্গে সঙ্গে শাবানার উত্তর, ৫ হাজার টাকা পেয়েছিলাম। হাসতে হাসতে তিনি বলেন, সেই ১৯৬৭ সালের ৫ হাজারের মূল্য এখন কত হতে পারে ভেবে দেখো তো!
কথা বলতে বলতে শাবানা সময় নিয়ে চলে গেলেন ভিতরের ঘরে। তখন কথা বলছিলাম ওয়াহিদ সাদিকের সঙ্গে। প্রথমেই তিনি বলে উঠলেন, ইন্ডাস্ট্রির এই বাজে অবস্থার কারণ হচ্ছে নেতৃত্বের অভাব। আমি আবার ছবি বানাতে চাই, কিন্তু লগ্নি ফেরত আসার গ্যারান্টি কে দেবে? সিনেমা বানিয়ে চালাবো কোথায়? বলেন, সিনেমা প্রদর্শনের জন্য হল নেই। হল বাড়াতে সরকারের সঙ্গে বসতে হবে। ১৭ কোটি মানুষের জন্য কমপক্ষে ১৭শ সিনেমা হল দরকার। সিনেমা বাড়লে সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ কমে আসবে। যোগ্য একজন মানুষকে দেখি না, যিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়ে সমস্যাগুলো জানাবেন। ঠিকভাবে নেতৃত্ব দিয়ে জানাতে পারলে প্রধানমন্ত্রী সব সমস্যার সমাধান করে দেবেন। বছর দুয়েক আগে আমি যখন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখার করতে গিয়েছিলাম, উনি বলেছিলেন আমি তো সমস্যা সমাধানের জন্য আছি। কিন্তু কেউ আমার কাছে সমস্যাগুলো নিয়ে আসে না। আমি সবসময় প্রস্তুত চলচ্চিত্রে সমস্যা দূর করার জন্য।
ভেতর ঘর থেকে শাবানা ফিরে এসে সোফায় বসে যোগ করে বললেন, আগে বিনোদনের সবচেয়ে বড় মাধ্যম ছিল সিনেমা হল। হলে গিয়ে ছবি দেখতো মানুষ। এখন এতোগুলো মাধ্যম এসেছে যে মানুষ হলে যেতে চায় না। তাদের হলে ফেরাতে দরকার নিত্য নতুনত্ব। আর এটার জন্য প্রথম স্টেপ হতে হবে একজন ভালো পরিচালক। এর সঙ্গে গল্প। পরিচালক ভালো হলে ছবি এমনিতেই ভালো হয়। শিক্ষিত মেধাবী পরিচালক গল্প নির্বাচনেও সচেতন থাকেন। শিল্পীরা কাদার মতো। পরিচালক যেভাবে গড়বেন শিল্পী সেভাবেই স্ক্রিনে নিজেকে মেলে ধরতে পারে। ভাল ভাল জিনিস বাজার থেকে আনা হল, কিন্তু রান্নার মানুষ যদি রান্নাটা ভালো করতে না পারে তাহলে সেটা তো খেতেও মজা লাগবে না। ঠিক একজন পরিচালকও তেমনি। এজন্যই বলা হয় ‘ফিল্ম ইজ অলয়েজ ডিরেক্টোরিয়াল মিডিয়া’।
কথায় কথায় শাবানা ফিরে যান তার ব্যস্ত থাকার দিনগুলোতে। নস্টালজিক হয়ে বলেন, কত সুন্দর সময় গেছে আমার। কত ব্যস্ততা মাথায় নিয়ে বাসায় ফিরেছি। মাসের ত্রিশ দিনই ক্যামেরার সামনে শুটিং করেছি। শুটিং শেষে পরের দিনের শুটিংয়ের আবার প্রস্তুতি। প্রথম প্রথম ওখানে গিয়ে খুব মিস করতাম। রাজ্জাক, আলমগীর, সোহেল রানা, বুলবুল আহমেদ, ফারুক, জাফর ইকবাল, জসিমদের সঙ্গে সমানতালে কাজ করেছি। আমার সাথে কে থাকছে এটা আমি কখনোই দেখতাম না। আমি দেখতাম আমার চরিত্র ও পর্দায় উপস্থিতি কেমন হবে সেটা। ববিতা, কবরী, আমি একই সময়কার। আমাদের মধ্যে কোনো জেলাসি ছিল না। শবনম, সুচন্দা আপা আমাদের সিনিয়র। সবার সঙ্গেই আমার সুসম্পর্ক ছিল। তবে আমাদের দেখা সাক্ষাত কম হতো। সে সময় সবাই কাজ নিয়ে এতো ব্যস্ত ছিল পাশাপাশি ফ্লোরে শুটিং হলেও দেখা করা আড্ডা দেওয়ার সময় হতো না। সকাল-দুপুর দুই শিফটে আমরা কাজ করতাম। রাতে ডাবিং থাকতো। ব্যস্ততা থাকলেও কারও মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ছিল না। সবার মাঝে ভালো কাজের চেষ্টা ছিল। কাজের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ছিল।
শাবানাদের সময়ে কাজের বাইরে অন্য কিছু করার সুযোগই পাওয়া যেত না। এমনকি তিনি ‘সমিতি’ বিষয়টির সঙ্গে পরিচিতও নন বলে জানান। শাবানা বলেন, শুনেছি এফডিসিতে এখন আর আগের মতো শুটিং থাকেনা। বিভিন্ন সমিতির চর্চা হচ্ছে। আমাদের সময় এসব ছিল না। কাজ করে কূল পেতাম না। এফডিসিতে সমিতিচর্চার সঙ্গে আমরা পরিচিত ছিলাম না।আমাদের সময়ে সমিতি চর্চার সময় কোথায়? তখন সবাই কাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। কত ভালো কাজ উপহার দেওয়া যায়, সেটা নিয়েই চলত প্রতিযোগিতা। দেশ ছেড়ে অনেক দূরে থাকি, চলচ্চিত্র ব্যবসা নিয়ে খুব জানাশোনা আমার নেই। শুনেছি খারাপ অবস্থা। হলগুলো নাকি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একের পর এক।
পরের প্রজন্মের শিল্পীদের খুব বেশি খোঁজ খবর রাখেন না বলেও জানান এই কিংবদন্তী। বলছিলেন, মিশা সওদাগরের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ হয়। প্রথম যেবার মিশা আমাদের প্রোডাকশনে কাজ করেছিল সেই আমলে তাকে তিন লাখ টাকা দিয়েছিলাম। সে যে কি খুশি ছিল কাজ করে বলে বোঝাতে পারবো না। এখনকার নায়কদের মধ্যে শাকিব খানের কাজের কথা একটু একটু শুনি। শুনেছি সে ভালো কাজের চেষ্টা করে যাচ্ছে। কলকাতাও নাকি কাজ করে পরিচিতি পেয়েছে। রিয়াজ, ফেরদৌস মনে হয় আগের মতো কাজ করছে না। এর বাইরে শাকিব ছাড়া অন্য নায়কদের বিষয়ে জানি না। নায়িকাদের মধ্যে মৌসুমী, শাবনূর, পপি, পূর্ণিমা প্রত্যেকেই ভালো শিল্পী। তাদের পরে আর কারও সম্পর্কে আমার ধারনা নেই।
কথা শেষ হতে হতেই শাবানা ডাক দিলেন খাবার টেবিলে। দেখালেন নিজ হাতে রান্না করেছেন নানা পদের খাবার। নিজ হাতে আপ্যায়ন করতে করতে বললেন, আমি সবসময় অতিথিদের নিজের হাতে রান্না করে খাওয়াতে পছন্দ করি। খাওয়া শেষ করতে করতে বললেন, আগে আমি যেগুলো কাজের চাপে করতে পারিনি এখন সেগুলো করছি। ঘর সংসার করছি।
জীবনের বেশিরভাগ সময় কাজ করতে করতে কেটে গেছে। বাচ্চাগুলো মিস করেছি। এখন ওদের দেখাশুনা করি, ওদের বাচ্চারা যখন নানুমনি বলে ডাকে, কাছে এসে খেলে তখন মনে হয় জীবনে এর চেয়ে সুন্দর কিছু হতে পারে না! এর বাইরে যেটুকু সময় পাই ইবাদত, রোজা পালন করি। ছবিটবি এখন খুব কম দেখা হয়। তবে আমার নাতি নাতনিরা মাঝেমধ্যে ইউটিউবে দেখে। ওরা আমাকে বলে নানুমনি সত্যিই, রিয়েলি ইউ আর অ্যা বিগ অ্যাক্ট্রেস! মাঝেমধ্যে এও বলে আমরা যদি তোমার মতো অভিনয় করতে চাই, হতে পারবো? খুব মায়া লাগে ওদের মুখ থেকে একথা যখনই শুনি।-বলছিলেন শাবানা।

আলাপের শেষে শাবানা জানান, জীবনে প্রায় সবই পেয়েছি। ২৩ বছর অভিনয় থেকে দূরে থাকলেও আজও রাস্তায় কেউ দেখলে সমাদর করেন। শাবানা বলেন, পরিবার পরিজন নিয়ে সুখেই আছি। আমি চলে গেলে মানুষ আমাকে হয়তো মনে রাখবে, এমন কিছু কাজ করেছি। কোনো অপূর্ণতা নেই আমার জীবনে। সবার কাছে দোয়া কামনা করছি, আমি যেন সুস্থতা নিয়েই ভালো থাকি।








