বছর কয়েক আগে একটি মেয়ে সেলফি তুলেছিলো মাওয়ার অন্য পারে। সেই তার শেষ সেলফি তোলা। পদ্মা পাড়ি দিয়ে মাওয়া-ঢাকা হয়ে তার চলে যাবার কথা সুদূর চীনে লেখাপড়ার উঁচু ধাপে অংশী হতে। কিন্তু মাওয়ার কাছেই সেই লঞ্চটির ডুবে যাবার দৃশ্য ভিডিওতে দেখেছি। কী মর্মান্তিক! মেয়েটি বাঁচেনি।
প্রথম স্তবকেই একালের প্রযুক্তি ‘সেলফি’ আর ‘ভিডিও’ দু’টি শব্দ ঢুকে গেলো সাবলীল নদী ধারায়। নির্মলেন্দু গুণ মোবাইল কিংবা সেলফোনের বাংলা করেছেন মুঠোফোন। সেলফি শব্দটির বঙ্গরূপ নিজস্বী। জীবনে বেশ কসরৎ করে ঘরের ভিতর সেলফি তুলে নাম দিয়েছি ‘আমার আমি’। না, অধমের এই প্রকাশন টুকু কেউ অনুসরণ করেছে বলে জানিনা। তাতে কী! সবাই সফল নন। সবাই ব্যর্থ নন। কেউ কেউ। এবার জীবন-সেলফির একটি নাম দিলাম ‘আমার চাঁদপুরে আমি’।
বছর কয়েক পর চাঁদপুর গেলাম। জন্মপীঠ। জননীর ডায়েরিতে তারিখ লেখা ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫১। হিলালের জন্মের আট দিন পর। তারপর এটা সেটা খরচ-এর খেরো খাতা। সে ডায়েরি থেকে ভূমিষ্ঠ হয়েছে আমার জন্মদিন। ১৯৫৪ সালে বন্যার পর পর রিলিফ হিসাবে পাঁচ নম্বর কদমতলী ফ্রি প্রাইমারি স্কুলে যখন মার্কিনী গুঁড়া দুধ আর কাপড় এলো; আমাদের বাড়িতে লজিং মাস্টার হিসাবে অবস্থান নেয়া ফজলে আলী ‘মাশসাব’ (মাস্টার সাহেব) তাঁর উপরোক্ত স্কুলে সাড়ে তিন বছরের মাথায় ভর্তি করে দিলেন। লক্ষ্য গুঁড়া দুধ। লক্ষ্য কাপড়। সেখানে জন্ম তারিখ দিয়ে দিলেন ৫ জানুয়ারি ১৯৫০। স্কুলে ভর্তি হবার বয়স হয়নি বলে এই লুকোচুরি। কোড়ালিয়া রোড, উত্তর শ্রীরামদী, চাঁদপুর সদরের ওই পাটওয়ারী পাড়ির ভিটি সন্তান আমি। দশ বছরের মাথায় আমি পদ্মা মেঘনা যমুনা ডাকাতিয়ার মহামিলন প্রান্তর ছেড়ে বিদায় নিলাম চিরতরের মতো, বাবার কর্মস্থলে, পরিশেষে ঢাকার শহরে।
জন্মপ্রান্তের প্রতি ঋণশোধের সুযোগ এসেছিলো ১৯৭১ সনে। অধিকৃত ঢাকা ছেড়ে চাঁদপুর পৌঁছুলাম এপ্রিলের চার তারিখ। কিছু শহর বাদে সমগ্র দেশ তখন মুক্তাঞ্চল। বাড়িতে পা রেখেই শুনলাম চাঁদপুরের চার ক্ষুদিরাম সম সন্তান বোমা বানাতে প্রাণ দিয়েছে আগের দিন। ৮ এপ্রিল চাঁদপুরে প্রবেশ করলো পাকিস্তানি হার্মাদ সেনাদল। এপ্রিল, মে, জুন। আমরা ছাত্র ইউনিয়নের কয়েকজন বসে ‘চাঁদপুর মহকুমা’ জুড়ে অবিশ্রান্ত ঘুরে ঘুরে চাঁদপুর ঠিকানায় ঠাঁই নেওয়া ছাত্র ইউনিয়নপন্থীদের বাহিনী হিসাবে গড়ে তুলতে জীবনের এক স্বপ্নময়, তৃপ্তিময়, ঝুঁকিময় সময় অতিক্রান্ত করেছি। কতো যে অভিজ্ঞতা। সমাজের কতোরূপ চেহারা। মানবিক, সাহসী, সরলভীতি, হিংস্র, নৃশংস, পরকে আপন করা, আপন হয়ে যাওয়া পর। চাঁদপুরের তদানীন্তন ছাত্র ইউনিয়ন অগ্রণী আবদুর রহমান মিয়াঁজি, মাহবুব পাটওয়ারী, লতিফ মাওলানা, ন্যাপের সাত্তার স্যার প্রমুখ ছিলেন এই বাহিনী গড়ে তোলার মূল উদ্যোক্তা। শুনলাম আগরতলায় আমাদের বামপন্থীদের ক্যাম্প হয়েছে। মাহবুব ভাই আগরতলা চলে গেলেন। সেখানকার ক্র্যাফট হোস্টেলে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের মিলিত বিশেষ গেরিলা বাহিনীর মূল রিক্রুটিং ক্যাম্পের খবর পেয়ে আমরা শিহরিত হলাম। জুন মাসের শেষ দিকে বলাখাল এর কাছে একটি খাল থেকে আমাদের যাত্রা হলো শুরু। সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে আমার দায়ভার পড়লো ঢাকার মানিকগঞ্জে গেরিলা যুদ্ধ বিন্যাসে। সেসব নিয়ে অন্যদিন অন্য কোনোখানে।
যুদ্ধশেষের প্রাপ্য চাই। আমার কাছে, আমাদের বাহিনীর কাছে সেই চাওয়া ছিলো সাম্যময় সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ। দিনে দিনে বুঝেছি ওই চাওয়া-পাওয়ায় পৃথিবী জুড়েই অনেক ফারাক। সমাজতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তোলার সপক্ষে মানুষের রিপুগুলো প্রস্তুত হতে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর সময় লাগবে গোটা বিশ্ব চরাচরেই। সেই প্রস্তুতির কাজ বড়ই জটিল, বুদ্ধিদীপ্ত, সময়সাপেক্ষ। তার জন্য চাই একালের মার্কস। একালের এঙ্গেলস। একালের লেনিন। একজন কিংবা একগুচ্ছ নব ব্যক্তির আবির্ভাব। অনেকে ভাবছেন, আগের মতো করে চললেই হবে। আন্তরিক ওই ভাবনায় একমত নই, তাই বলে তাদেরতো দূরের কেউ হিসাবে ভুলেও ভাবিনা। এমনি কথা ভাবতে ভাবতে বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী, শীতলক্ষ্যা, মেঘনা, পদ্মা-যমুনা, ডাকাতিয়ার স্রোতধারায় মিশে গেলাম। গঙ্গোত্রি গোমুখ তুষারধারা থেকে গঙ্গা, মানসসরোবর থেকে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, নাগাপাহাড় থেকে বরাক-মেঘনা। অজস্র বাঁধ গড়ে কত নদীর মুক্তধারাকে বন্দী করে দীর্ঘমেয়াদে নদী হননের আয়োজন পৃথিবী জুড়ে। পদ্মা-মেঘনা-তিস্তায় ফারাক্কা-টিপাইমুখ-গজলডোবা বাঁধের অভিশাপ বিপন্ন করে তুলছে আমাদের বদ্বীপ অঞ্চল। ওদিকে আন্তঃনদী সংযোগের দৈত্য জেগে উঠছে ভারতে পুনরায়। যা ছোবল দেবে বাংলাদেশকেও ।
ভাবতে ভাবতে চাঁদপুর ঘাট। এখন বাষ্পচালিত স্টিমারের যুগ প্রায় শেষ। এক একটি আলীশান লঞ্চ। নবসময়ের নবলঞ্চমালিক শ্রেনী। লঞ্চে এখন লিফট। কফি, স্যান্ডউইচ। চাঁদপুর ঘাট এখন আর ডাকাতিয়াতে নেই, স্থায়ীভাবে মেঘনাতেই। বর্তমান ঘাট থেকে একটি নতুন রাস্তায় আমাদের কোড়ালিয়া পাটওয়ারী বাড়ির জন্য সহজ পথ রচিত হয়েছে।
জন্মপ্রান্তরের গল্পই আলাদা। কিন্তু লঞ্চ থেকে নামতেই একদল মানুষের চিৎকারে বেকুব বনে গেলাম। ওরা বলছেটা কি! না ভাই, উন্নয়ন নিয়ে যারা যতোই ভেংচি কাটুন, চাঁদপুরের লঞ্চ ঘাটে আসুন। না, যাত্রীর জন্য বলতে গেলে রিকশাই নেই। ইজিবাইক নামের স্বল্পমূল্যের চীনা পণ্যটি এখন শহর-বন্দর-গ্রাম গঞ্জ দখল করে নিয়েছে। সঙ্গে আছে ঢাকা থেকে বিতাড়িত পুরোনো অটো। চাঁদপুর লঞ্চঘাটে চালকেরা সবাই চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলছে, হাজিগঞ্জ, রামগঞ্জ, ফরিদগঞ্জ, রূপসা, রায়পুর, হাইমচর এমনি এককালের দূর দূরান্ত প্রান্ত। একা কিংবা কয়েকজন। চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালি অঞ্চলের বিশাল মানুষ এখন চাঁদপুরের জলপথ ব্যবহার করে ঢাকা আসতে পছন্দ করেন। ১৯৪৭ এর পর চাঁদপুর ম্রিয়মান হয়ে গিয়েছিলো। সেই রেল স্টেশন, সেই স্টিমার ঘাট, সবই দেশভাগে ভঙ্গুর হয়ে গিয়েছিলো। তদুপরি প্রকট নদী ভাঙ্গন। ফলে চাঁদপুরের ভরকেন্দ্র কালিবাড়ির মোড় থেকে ষোলঘর-বাবুরহাটের দিকে। এখন চাঁদপুরের প্রধান স্থানটি কালিবাড়ি মোড়ের প্রতিদ্বন্দ্বী বুঝি একালের ইলিশ-চত্ত্বর।
বাংলাদেশের সব জায়গায় মতোই আদল বদলে গেছে আমার চাঁদপুরের। ১৯৬২ সনে যে চাঁদপুর ছেড়ে গিয়েছিলাম, যে পথ ধরে হেঁটে হেঁটে আমার বয়সী বন্ধুদের সাথে বড় ইস্টিশনে গিয়ে চাঁদপুর-জামালপুর ৩০২ মাইলের টিকেটের বলে কম্পার্টমেন্টে উঠলাম, ইস্টিশনের সেই অংশ এখন মেঘনা গভীরে। মেঘনার এই অংশে একাত্তরে প্রতি রাতে গুলি-বেয়োনেটে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকদের রক্তধারায় হাজার বছরের জলধারাকে রক্তলাল করা হতো। বড় ইস্টিশনে পাথরে জুড়ে দেয়া অংশে বেলে (বাইলা) মাছ মেঘনা কিনারে এসে শিকারীর ফাঁদে পড়তো। বড়দের সঙ্গে এসে সেই প্রান্তে মাছ ধরার সহযোগী শৈশব এখনও মনে পড়ে। আমাদের বাড়ির কাছের যে কাঠের বড় পুল ছিল সেটি এখন কংক্রিটের। কিন্তু সে পুল থেকে আমরা এক প্রকার পোশাকবিহীন লাফ দিতাম যে খালের স্রোতে, সে খাল এখন অপহৃত। সে খাল উদ্ধারে চাঁদপুরের নাগরিক বিবেক কেন যেন ঘুমন্ত।
বিবেক ঘুমন্ত আমারও। যে মহিলা ছোট্টবেলায় আমায় লালন পালন করেছেন, তার বাড়ির পাশ দিয়েই গেলাম, তিনি বেঁচে আছেন কিনা, সে খবর নেবার সময় আমার নেই। ছোট বেলার শাসক ‘মন্নামিয়াভাই’ আজ কবরে, বড় মামা ও বড় খালা প্রয়াত, অকালে প্রয়াত দু’জন ভাতিজী, নবজাত শিশু রেখে পরপারে পাড়ি দেয়া ভাতিজা বউ- এমনি স্বজন আপন কতোজন। বলতে গেলে কারো সঙ্গেই দেখা করতে পারিনি। ঢাকা থেকে এসেছি, যেন আমার অবর্তমানে ঢাকা অচল হয়ে যাচ্ছে, তাই বুঝি তড়িঘড়ি ফেরা।
এবার চাঁদপুর গেলাম কেন, সে কথাটিই বলা হলোনা। বর্ষায় স্বচ্ছ্বতোয়া বুড়িগঙ্গায় নাকি এখন দু’একটা মাছও ধরা পড়ছে, এমন শুভ সংলাপে আমাদের ‘ সোনার তরী’ লঞ্চের যাত্রা শুরু। চাঁদপুরের বিশেষ গেরিলা বাহিনীর সহযোদ্ধারা খবর দিলেন, যেতে হবে আজই। কেননা যুদ্ধ শেষের প্রাপ্য এখন পরিণত হয়েছে ‘ভাতা’য়। সেজন্য লাগবে স্বাক্ষর । বাহিনীর ন্যায্য স্বীকৃতির জন্য লড়েছি। ১৯৯৭ সন থেকে। আমাদের বাহিনীর প্রকাশিত ২০১৩ সনের গেজেট বাতিল করেছে একই সরকারের একই মন্ত্রণালয়ের ‘অপরিণামদর্শী’ উত্তরাধিকারীরা। আইনী যুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী সম্মান, স্বীকৃতি, মর্যাদা, সুযোগ সুবিধা আমাদের প্রাপ্য। গেজেট বাতিলের সময় চাঁদপুরের একটি পত্রিকায় আমাদের ‘ভুঁয়া মুক্তিযোদ্ধা’ বলে বিশাল শিরোনাম দিয়েছিলো। সেই পত্রিকার বিরুদ্ধে এখন উকিল নোটিশ দেবো, একই আকারের শিরোনামে দুঃখ প্রকাশ, ভুল স্বীকার এবং ক্ষমা প্রার্থনার জন্য।
চাঁদপুরের ওই পত্রিকাপ্রবরেরা ওই শহরের মহান আত্মত্যাগী সন্তান, ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়ন বিশেষ গেরিলা বাহিনীর চাঁদপুর প্রধান মরহুম আবদুর রহমান মিয়াঁজিকে পর্যন্ত ‘ভুঁয়া’ বলতে দ্বিধা করেনি। মুক্তিযুদ্ধের সূচনাপর্বে প্রচারের প্রয়োজনে রহমান ভাই এবং আমি চাঁদপুরের খৃষ্টান মিশনারিদের অফিসে ঢুকে এক নিশিতে প্রহরীকে অস্ত্র দেখিয়ে একটি সাইক্লোস্টাইল মেশিন নিয়ে এসেছিলাম। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর কমরেড রহমান সেই ছাপাবার মেশিনটি ওই মিশনে ফিরিয়ে দিয়ে এসেছিলেন। এমন চাঁদপুররত্নকে অসম্মান করার উদ্ধত ও নির্বোধ ব্যক্তি ওরা কারা? আজ আমার চেনা চাঁদপুরের সেই রহমান ভাই, মাহবুব ভাই, লতিফ মাওলানা, সাত্তার স্যার- কেউ নেই। সবাই বাংলামৃত্তিকার গভীরে।
চাঁদপুর শহরের আদল বদলে গেছে আরেকখানে। চরভাঙা উদ্বাস্তুদের প্রতি সেই পঞ্চাশ-ষাটের দশকে দেখেছি চাঁদপুরবাসীর অবহেলামাখা দৃষ্টি। ‘দেশী-চরওয়ালা’ দ্বন্দ্ব তীব্র হয়ে উঠছিল। আজ চাঁদপুর শহরে বড় বড় বসতবাড়ি, স্থাপনা এবং রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক প্রভাব নিয়ে চরভাঙা উদ্বাস্তুদের একটা অংশ। চাঁদপুরের ১৯৬১-৬২ দিকের একজন চৌকস মহকুমা হাকিম সালাহউদ্দিন আহমেদ চাঁদপুরকে গৌরবান্বিত করতে একটি প্রচারধ্বনি গড়েছিলেন: ‘চাঁদপুর ভরপুর জলে স্থলে/মাটির মানুষ আর সোনার ফলে।’ এই কথাটুকু সত্য বটে। কিন্তু সত্যকে খাবলা মেরে মিথ্যাও এগিয়ে গেছে। অন্ধকার অর্থনীতিতে এখন চাঁদপুরে ‘মাটির মানুষ’ বলতে গেলে উপরতলায় অনেক কম। দেশের সব জায়গারই মতো। কাঁচা টাকা এখন গিলে খাচ্ছে পাকা সুস্বাদু ফল। এই সালাহউদ্দিন সাহেব সিএসপি হিসাবে স্বরাষ্ট্র সচিব হয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থার বড় পদে আসীন হয়েছিলেন। আজ হয়তো তিনি পৃথিবীতে নেই। পাকিস্তানের একদা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতিসংঘ প্রতিনিধি আজিজ আহমেদও চাঁদপুরের মহকুমা হাকিম ছিলেন। বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা নূরুল কাদের সিএসপিও একই পদে ছিলেন। সেই চাঁদপুর এখন জেলা।
চাঁদপুর জেলা দেশকে একজন প্রধানমন্ত্রী উপহার দিয়েছিলো, যিনি সামরিক শাহীর অনুচর হয়ে নিজের মান রাখতে পারেননি। চাঁদপুর দেশকে প্রথম নারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী উপহার দিয়ে পৃথিবীকে চমকে দিয়েছিলো। তিনিও কেন যেন হোঁচট খেয়ে গেলেন। চাঁদপুরে তার ভাবমূর্তি এখন প্রশ্নবিদ্ধ। অথচ এই চৌকস, শিক্ষিত নারীর প্রতি আমাদের অনেক আশা ছিলো।
বিকেল পাঁচটার আলীশান আরেক লঞ্চে সেই বিশাল চাঁদপুর মোহনা থেকে ঢাকার পানে রওনা হলাম। একাত্তরে এক দুঃসাহসিক নৌ অপারেশনের কথা মনে হলো। ‘আকরাম’ নামের একটি খাদ্যবাহী জাহাজকে নৌকমান্ডো মুক্তিযোদ্ধারা অই মোহনা দিয়ে ডাকাতিয়ায় গিয়ে বিস্ফোরণে উড়িয়ে দিয়েছিলো। সেই অপারেশনের নায়ক মমিনউল্লা পাটোয়ারী বীরপ্রতীকের সম্মান নিয়ে এখনো বেঁচে আছেন। ‘আকরাম’ জাহাজটিকে বিক্রি করে স্ক্র্যাপ বানিয়ে দেবার জন্য টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো নারায়ণগঞ্জ ডকে। ফুঁসে উঠেছিলো চাঁদপুর, ফুঁসে উঠেছিলো গণমাধ্যম। আজো নারায়ণগঞ্জ ডকে সেটি পড়ে আছে। কী হয় যদি বীরত্বের প্রতীক ওই জাহাজটিকে চাঁদপুর পৌরসভা পার্কে মুক্তিযুদ্ধের চিহ্নবাহী জাদুঘর হিসাবে স্থাপিত করা হতো? এখনও সে সুযোগ আছে।
কর্মজীবনের শেষ সময়ে মমিনউল্লা পাটোয়ারী প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক দায়িত্বও পালন করেছিলেন। বলা যায় তারই তাগিদে আমরা ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়ন বিশেষ গেরিলা বাহিনী আমাদের তালিকাভুক্ত হবার ‘ঐতিহাসিক’ দায়িত্ব পালনের উদ্যোগ নিয়েছিলাম। অনেক অন্যরকম যুদ্ধ শেষে আমাদের বাহিনী আজ রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত।অপরূপ সেই অনুভূতিতে মনটা ভরে গেলো। মেঘনা দিয়ে চলছে লঞ্চ ঢাকার দিকে। অপসৃত হচ্ছে জন্মপ্রান্তর চাঁদপুর। সেই অনবদ্য অসাধারণ মেঘনার বিষন্ন বিকেল আকাশ। ‘আমার চাঁদপুরে আমি’- এই হচ্ছে আজকের অভিজ্ঞতা- সেলফির বিবরণী।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)







