‘আমাদের বাঙালিদের সকল যুদ্ধ ও সংগ্রামে রবীন্দ্রনাথ গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছেন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, সামরিক শাসন ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামসহ সকল যুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন আমাদের সেনাপতি।’
শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালা মিলনায়তনে খামখেয়ালী সভা আয়োজিত সংঠনটির ৪র্থ বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ‘রবীন্দ্রগুণী সম্মাননা ২০১৮’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির লিখিত বক্তৃতায় এসব কথা বলেছেন।
এদিকে খামখেয়ালী সভা রবীন্দ্রচর্চায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিন গুণীজনকে এবার ‘রবীন্দ্রগুণী সম্মাননা’ জানিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে রবীন্দ্রনাথ চর্চার অন্যতম প্রতিষ্ঠান টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক মঞ্জুলা বসু, প্রয়াত অধ্যাপক-গবেষক করুণাময় গোস্বামী ও রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী মিতা হক পেয়েছেন এই সম্মাননা।
খামখেয়ালী সভার সভাপতি মাহমুদ হাশিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রবীন্দ্রগুণী ও ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক।
প্রধান অতিথির লিখিত বক্তব্যে আসাদুজ্জামান নূর জানান, ‘প্রথম যখন আমি খামখেয়ালী সভার কোন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম, এটি কোন হাস্যরসের আড্ডা হিসেবে ভেবেছিলাম। কিন্তু গিয়ে দেখি এটি গুরুগম্ভীর ও শিল্পরস আস্বাদনের আলোচনা অনুষ্ঠান। তিনি খামখেয়ালী সভার এধরনের উদ্যোগের প্রশংসা করেন এবং এটিকে আরো সামনের দিকে এগিয়ে নেয়ার আহবান জানান।’ কণ্ঠ সমস্যার কারণে বক্তব্য দিতে পারেননি তিনি।
করুণাময় গোস্বামীর পক্ষ থেকে সম্মাননা গ্রহণ করেন তার সর্বশেষ কর্মস্থল ক্যামব্রিয়ান এডুকেশন গ্রুপের কর্ণধার এম কে বাশার। সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর ও প্রাবন্ধিক-গবেষক আহমদ রফিক তাদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন। তার মেয়ে তিথি গোস্বামী প্রবাস থেকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে একটি পত্র পাঠান আয়োজকদের। পরে সেটি পড়ে শোনানো হয়।
তিথি গোস্বামী বলেন, ‘বাবা সারা জীবন মানুষের সাথে মানুষের মিলনের কথা বলে গেছেন। তিনি সারা জীবন তরুণদের প্রতি আস্থাশীল ছিলেন। দুনির্বার তরুণের মতো কাজ করে গেছেন আজীবন।’
১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠার পরে পশ্চিমবঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চর্চা আরো জোরদার করার লক্ষ্যে কাজ করে চলেছে টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউট। সেই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক অধ্যাপক মঞ্জুলা বসু বলেন, ‘৫৩ বছর ধরে আমি টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সঙ্গে যুক্ত, এই পুরস্কার যে তাদের জন্যও এক দারুণ সম্মান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চর্চায় এই পুরস্কার আমাদের আরো অনেক প্রেরণা যোগাবে।’
মিতা হক, বলেন, ‘বেশ কদিন ধরেই আমি একটু কম কাজ করছি। এই পুরস্কারটি আমাকে একটু উজ্জ্বীবিত করবে, এবার একটু জোরেশোরেই গানটা করতে হবে।”
আহমদ রফিক বলেন, ‘আজকের রবীন্দ্রগুণীরা নিজ নিজ কক্ষ থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য, গান আর তার জীবনের নানা দিক নিয়ে কাজ করেছেন। আমরা তো গুণীজনদের সময়মতো সম্মান দেই না। এ পুরস্কারটি প্রাপ্তির পরে রবীন্দ্রগুণীরা তাদের চর্চায় নানামাত্রিক বিস্তার ঘটাবেন।’
সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, “৫২’র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালির আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার যুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের সেনাপতি। সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তিনি আমাদের প্রেরণার উৎস।
সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতের প্রথিতযশাদের নিয়ে ১৮৯৭ সালে কবিগুরু ‘খামখেয়ালী সভা’ নামের একটি আড্ডা চালু করেছিলেন। দীর্ঘ ১১৭ বছর পর ২০১৪ সালে শহর ঢাকায় খামখেয়ালী সভা শীর্ষক সেই আড্ডাটির আবার পুনর্জাগরণ হয়। আর এ বছর পুনর্জাগরিত সেই আড্ডাটি পদার্পণ করলো চতুর্থ বছরে। সেই সুবাদে হয়ে গেল খামখেয়ালি সভার চতুর্থ বর্ষপূর্তি।
এ উপলক্ষে শুক্রবার থেকে দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। শনিবার ছিল সে আয়োজনের শেষ দিন।
সম্মাননা প্রদান ও আলোচনা শেষে ছিল নৃত্য-গীত ও কবিতায় সজ্জিত সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। কবিতাপাঠ করেন আবৃত্তিশিল্পী জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় ও তামান্না তিথি। রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করেন বুলবুল ইসলাম, অদিতি মহসিন, জাকির হোসেন তপন ও ভারতের কণ্ঠশিল্পী অমিতাভ মুখোপাধ্যায়; ছিলো নৃত্যশিল্পী র্যাচেল প্রিয়াংকা প্যারিসের একক পরিবেশনা।







