উন্নত বিশ্বে এবং বাংলাদেশের বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থার তুলনামূলক একটি চিত্র পাওয়া যাবে ‘তিন ভুবনের শিক্ষা’ বইটিতে। ব্যক্তিগত বা সাবজেক্টিভ দৃষ্টিকোণ থেকে জাপান, নেদারল্যান্ড ও বাংলাদেশের বিদ্যালয় স্তরে শিক্ষাব্যবস্থার পরিস্থিতি বর্ণনা করা হয়েছে এই বইতে।
তিন দেশের তিন বাঙালি অভিভাবক নিজেদের অভিজ্ঞতার বর্ণনা করেছেনা- তানজীনা ইয়াসমিন লিখেছেন জাপানের অভিজ্ঞতা, তানবীরা তালুকদার তুলে ধরেছেন নেদারল্যান্ডের চিত্র আর বাংলাদেশের পরিস্থিতি বর্ণনা করেছেন রাখাল রাহা। সাবজেক্টিভ বয়ান তিনটি, আস্থার সাথে পাঠকের কাছে গৃহীত হবে। তিনজনই কথাসাহিত্যিক, তাই বইটি ফিকশন পাঠের আনন্দও দেয়।
এই বইটি বাংলাদেশের শিক্ষাসংক্রান্ত নীতিনির্ধারক, অভিভাবক ও শিক্ষকদের অবশ্যপাঠ্য। কারণ এই বইতে বর্ণিত আছে, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার করুণ পরিস্থিতির, আর তার বিপরীতে আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থার বর্ণিল বয়ান। এই বিপরীত পরিস্থিতির পাঠ-অভিজ্ঞতা পাঠকমাত্রের মনে গভীর অভিঘাত তৈরি করবে এবং বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের জন্য ব্যাকুল করে তুলবে।
বইটি আমাদের নীতিনির্ধারক, শিক্ষক ও অভিভাবকদের এরকম কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি করে দেবে- একটি শিক্ষাব্যবস্থার নীতিগত, দর্শনগত ও পরিকল্পনার জায়গায় আমরা কত পিছিয়ে আছি, আমাদের শিক্ষকদের দায়দায়িত্ব ও পাঠদানের মনোভঙ্গিতে কত সীমাবদ্ধতা রয়েছে, অভিভাবক হিসেবে আমরা কত ভুল জায়গায় মাথা ঠুকে মরছি!
জাপান আর নেদারল্যান্ডের অভিজ্ঞতা পড়লে মনে হবে, বাচ্চারা বাসায় কিছুই প্রায় পড়ে না, সবই স্কুল পড়িয়ে দেয়। এমনকি পড়াশোনার বাইরে পিতামাতার অনেক কাজ স্কুলই শিখিয়ে দেয়- কীভাবে নিজের জিনিস গুছিয়ে রাখতে হয়, কীভাবে টয়লেট ব্যবহার করতে হয় ও পরিস্কার রাখতে হয়, কীভাবে জুতার ফিতা বাঁধতে হয়, কীভাবে নিজে নিজে খাবার খেতে হয় ও খাবারশেষে প্লেট গুছিয়ে রাখতে হয় ইত্যাদি। ট্রাফিক নিয়ম মানা, কেনাকাটা করা, সহপাঠীদের সঙ্গে একসাথে কাজ করা, সব বর্ণ-শ্রেণির মানুষকে সম্মান করতে শেখা-স্কুল থেকেই বাচ্চারা শিখে ফেলে। বয়ঃসন্ধির পরিবর্তনকালের শিক্ষাও শিক্ষকরা শিখিয়ে দেন। অথচ আমাদের দেশে এগুলো পরিবার থেকে কেবল শেখাতেই হয় না, স্কুলের পড়াও বাবা-মাকে পড়িয়ে দিতে হয়। স্কুলের পরে বাচ্চাকে নিয়ে কোচিংয়ে-প্রাইভেটে দৌড়াদৌড়ি করতে হয়।
তানবীরা জানাচ্ছেন নেদারল্যান্ডে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত বাচ্চাদেও মুখস্থ করার বা পড়ার জন্য কোনো বাঁধানো বই-ই নেই। সবটাই হাতেকলমে, খেলায়, ছবিতে, গানে বা সিনেমার মাধ্যমে শেখানো হয়। আর বাংলাদেশের লেখক রাখাল রাহা জানাচ্ছেন, তার মেয়ের বইয়ের বোঝা কমাতে তাকে কী প্রাণান্ত পরিশ্রমই না করতে হয়েছে! স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি লিখে আবেদন জানিয়েছেন, বোর্ডের বইয়ের বাইরে যেন অতিরিক্ত বই না দেয়া হয়। একপর্যায়ে তিনি হেডমাস্টারের উৎসাহে স্কুলকমিটিতে ঢুকেছেন এবং সেখানে তিনি দেখেছেন স্কুলপরিচালনার নামে কী নোংরা রাজনীতি চলে! সংস্কারের বহু চেষ্টা প্রায় বিফলে গেলে, তিনি কমিটি থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। তিনি জানাচ্ছেন, পরিচালনা কমিটি সভাপতি-সদস্য থেকে শিক্ষকবৃন্দ, কারোরই শিক্ষার উন্নয়নে মনোযোগ নেই, সবারই মনোযোগ টাকাকড়ি আর দলাদলিতে।
জাপানের কাহিনীতে জানতে পারছি, বৃত্তি নিয়ে পাঠরত মার পাশে সন্তান প্রসবের সময় পরিবারের কেউ ছিল না, তবুও নিরাপদে সন্তানের জন্ম হয়েছে। আড়াই মাসে বাচ্চাকে ডে-কেয়ারে পাঠিয়ে নিশ্চিন্তে ল্যাবে গিয়েছেন তিনি। প্রথমে ডে-কেয়ার সেন্টার আর পরে স্কুল বাচ্চাটির পড়াশুনার, আদব-কায়দা শেখানো ও স্বনির্ভর করে তোলার দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছে।
নেদারল্যান্ডের শিশুটি বাসার চাইতে স্কুলে সময় কাটাতে বেশি পছন্দ করতো। স্পেন থেকে ছুটিশেষে মধ্যদিনে বাসায় পৌঁছলে শিশুটি বাবা-মাকে বাধ্য করে স্কুলে দিনের বাকি সময়ের জন্য পাঠাতে। আর বাংলাদেশের কাহিনিটি পড়লে, পাঠকের মনখারাপই হবে কেবল। হাহাকারের সঙ্গে প্রশ্ন জাগবে মনে, ওরকম শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা কি একেবারেই অসম্ভব?
তিন ভুবনের শিক্ষা। প্রকাশক: শিক্ষা ও শিশু রক্ষা আন্দোলন। প্রচ্ছদ: সব্যসাচী মিস্ত্রি। মূল্য: ৩০০ টাকা।








