পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক ড. পবিত্র সরকার বলেছেন, ‘‘ভাষা সব মানুষের সম্পত্তি, কিন্তু ‘ভাষাজ্ঞান’ সব মানুষের সম্পত্তি নয়। আমরা হয়তো অনর্গল কথা বলি, আধিপত্যের আসনে থাকলে দরকারের চেয়ে বেশি বলি, কিন্তু ভাষা বলতে ঠিক কী বোঝায় তা আমরা অনেকেই জানি না।’’ স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, বিষয়টি আমিও ঠিক জানি না। কারণ আমি ভাষাবিদ নই।
এমনকি সাহিত্যের ছাত্রও নই। কিন্তু চলতে-বলতে ও লিখতে গিয়ে বহুজনের লেখা পড়ে, সঙ্গ লাভ করে নিজের অনেক ভুল শুধরেছি। এখন খবরের কাগজ, গল্প-উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধের বই, এবং কৌতূহল মেটাতে স্কুলকলেজের বই পড়তে পড়তে হোঁচট খাই। রেডিওর সংবাদ, ঘোষণা, টিভি চ্যানেলে বাংলা শব্দের বানান ও সঞ্চালকদের কথা শুনে আঁতকে উঠি। অতীতে ভাবতাম, দিন-কে-দিন ভুল কমে যাবে। সংশ্লিষ্টরা অভিজ্ঞ হবে, পেশাদারিত্ব গড়ে উঠবে। এক সময় ভুলের কণ্টক-শয্যা ছেড়ে সবাই নির্ভুল পথে যাত্রা শুরু করবে! কিন্তু হায়, তা আর হল কই!
অকপটে জানাই, বাংলা শব্দ, ভাষা, বাক্য নিয়ে আমার জ্ঞান অতি সামান্যই। কিছুদিন সংবাদপত্রে চাকরি করার কারণে শব্দ, বানান নিয়ে সচেতন হতে শিখেছি। পরবর্তীকালে ভাষা ও বানানের ওপর অসাধারণ দখল ছিল যার, সেই সুবল কুমার বণিককে সহকর্মী হিসেবে পেয়ে নিয়ত দেখা করে বা ফোনে আমার ভুল শুধরে নিতাম। সুবলদা গত বছর প্রয়াত হয়েছেন। এখন কোনো শব্দের মানে কিংবা শুদ্ধ বানান জানতে দ্বারস্থ হতে পারি, হাতের কাছে তেমন কাউকে আর পাই না! অগত্যা অভিধানই একমাত্র সহায়!
যাহোক, গণমাধ্যমের কিছু কিছু শব্দ, বাক্য এবং বানান দেখে মাঝে মাঝে খুবই হতাশ হতে হয়। এক সময় প্রতিটি সংবাদপত্রে প্রুফ রিডার বলে এক বা একাধিক ব্যক্তি কাজ করতেন। তাদের দায়িত্ব ছিল বানান ঠিক করে নির্ভুলভাবে বাক্য গঠন করা। মূলত তারা সম্পাদনার কাজটি করতেন। এখনও হয়তো সম্পাদনাকারী ব্যক্তিরা গণমাধ্যমে কাজ করেন। কিন্তু সম্পাদনার মান দেখলে সত্যিই হতাশ হতে হয়। অথচ আমরা জেনে এসেছি যে, গণমাধ্যমের অন্যতম কাজ পাঠককে শিক্ষিত করা। মানুষ সংবাদপত্রের মাধ্যমে প্রতিদিন হরেক রকম খবর জানার পাশাপাশি ভাষাও শেখে। একটি বিষয়কে ভালোভাবে, স্পষ্ট করে পাঠকের কাছে তুলে ধরতে হলে শুদ্ধ ভাষায় লেখা চাই। কেননা বাক্যের গঠনে ভুল হলে, শব্দের প্রয়োগ ভুল হলে কিংবা বানানে ভুল হলে অর্থ বদলে যায়। এতে পাঠক বিভ্রান্ত হতে পারেন। তাই গণমাধ্যমকে ভাষার শুদ্ধতা নিশ্চিত করতে হয়।
আসলে ভাষা নিয়ে আমাদের মধ্যে এক ধরনের উন্নাসিকতা রয়েছে। আমাদের মনোভাবটা অনেকটা এ রকম: যা চলছে, যেভাবে চলছে, চলুক না! কয়েক বছর আগের ঘটনা। একটি দোকানে বিরানি কেনার জন্য লাইন দিয়েছি। একজন ছাত্রী বিক্রেতাকে বলছে, মাটন বিরিয়ানি লিখবেন না। আপনারা খাসির মাংস ব্যবহার করেন। মাটন মানে তো ভেড়া বা মেষের মাংস।
বাড়ি ফিরে অভিধান নিয়ে বসলাম। ছাত্রীটি তো ঠিকই বলেছে। তার মানে এত দিন যা জেনেছি ভুল জেনেছি! অনেকে বলেন, বহুব্যবহৃত হলে ভুলটা আর ভুল থাকে না। তা হলে আমি আপনার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করি না— এখানে ‘ব্যবহার’ কথাটা হওয়া উচিত ‘আচরণ’। বিহেভিয়ার তো তা-ই হয়। আমি এসএলআর ক্যামেরাটা ঠিক ভাবে ব্যবহার করতে পারি না। এখানে ‘ইউজ’। কিন্তু ‘ব্যবহার’ কথাটা যত্রতত্র ব্যবহার করি।
এক বার একটি খ্যাতনামা দৈনিকের বড় শিরোনাম ছিল-‘সংসদ অধিবেশনে সাত সাংসদ সোচ্চার’। সুবলদাকে দেখিয়েছিলাম, তিনি তো হেসেই লুটোপুটি। হাসতে হাসতেই বললেন, সংসদকক্ষ তো দুর্গন্ধে ভরে গিয়েছে! আমি কিছু বুঝতে পারি না। তিনি বললেন, ওটা হবে ‘সরব’। সোচ্চার মানে নিজে উচ্চারিত। গণ্ডগোল বা হইচই করাটা সোচ্চার নয়। উনিই এক দিন ভোটের প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর বাংলাদেশ-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচের শিরোনাম দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘মরণবাঁচন লড়াই’ কেন? মরার জন্য কেউ লড়ে?
আমাদের গণমাধ্যমে প্রায়ই ‘ভোর রাতে’ শব্দটি প্রয়োগ করা হয়। দৈনিক পত্রিকায়ও এটা শিরোনাম হয়। প্রায়ই লেখা বা বলা হয় ‘এ জাতীয়’। হওয়া উচিত ‘এ ধরনের’ বা এ রকম। হিন্দু বা মুসলিম জাতি বা স্ত্রী জাতি অবশ্য ভিন্ন কথা। ন্যাশনাল-ই জাতিগত বা জাতীয়। যেমন, জাতীয় ক্রিকেট, দল, জাতীয় আয়, জাতীয় পশু, জাতীয় সংগীত, জাতির জনক।
ক্রিকেটের খবরে প্রায়ই লেখা হয়, শূণ্য রানে আউট হন। শূন্য রান-টা কী? ডাক মানে 0। শূন্য রান কেন? বোলিং করা, ব্যাটিং করা— পাশাপাশি দুটো ক্রিয়াপদ কেন? SH থাকলে উচ্চারণ হয় ‘শ’। তা হলে, ASHES তো অ্যাশেজ হওয়া উচিত। কিন্তু লেখা হচ্ছে অ্যাসেজ। টেনিসে সেট ও গেইম নিয়ে নিয়মিত ভুল হয়। এক সময় তো নিয়মিত ‘শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ’, ‘ইহলোক ত্যাগ’, ‘পরলোক গমন’ ‘চিরবিদায়’ লেখা হত; এখন এগুলো কিছুটা কমেছে। কিন্তু ব্রাকেটের মধ্যে ইন্না লিল্লা…কেন লিখতে হয়? খবর জানানোর সময় মৃতের ‘জান্নাত কামনা’ করার প্রয়োজন কি খুব বেশি? শুধু কি তাই? আমাদের দেশে সর্বজনীন এখনও ‘সার্বজনীন’ হয়ে আছে। সেটা মানবাধিকার সনদের ক্ষেত্রে যেমন আছে, দুর্গোৎসবেও আছে!
এক সময় কোনো কোনো বাসের গেটে লেখা থাকত ‘বাস না থামা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন’। Till Stop-এর এ কেমন তর্জমা! তা হলে তো বাস থামবে না। ঠিক হতো ‘বাস থামা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন’। ‘প্রধান অতিথি না আসা পর্যন্ত সভা হবে না’, এটা তো ভুল। হওয়া উচিত ‘প্রধান অতিথি এলেই সভা হবে’। প্রায় লেখা হয় ‘ফলশ্রুতি’। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, ‘ফলশ্রুতি’ মানে ‘কর্মফল শ্রবণ’। কিংবা সেতুমন্ত্রী ‘পায়ে হেঁটে’ নির্মাণকাজ পরিদর্শন করেন। উনি কি হাতেও হাঁটেন? অথবা দুর্ঘটনার খবর পেয়ে প্রধানমন্ত্রী ছুটে যান? হ্যাঁ, আমাদের প্রধানমন্ত্রী অনেক ফিট, তাই বলে উনি দৌড়ে যান? লেখা হয়ে থাকে, পৃথিবী এখন হাতের মুঠোয়। মুঠো তো হাতেই। হাতের মুঠো কেন লেখা হবে? কোয়েশ্চেন-এর মানে প্রশ্ন। পার্বত্য সমস্যা, তিস্তা সমস্যা হোক। ‘তিস্তা প্রশ্নে’, ‘পার্বত্য প্রশ্নে’ কেন হবে? মাঝে মাঝে মনে হয়, দুর্ঘটনাস্থল না লিখে দুর্ঘটনাস্থান লিখলে কেমন হয়? সাগরে, পদ্মায় কিংবা লেকে নৌকোডুবি হলে কি দুর্ঘটনাস্থল লেখা হবে?
কেউ কেউ আবার এমন কথাও বলেন যে, বাংলা হলো ‘হিন্দুয়ানি ভাষা’। এর বেশিরভাগ শব্দই এসেছে সংস্কৃত থেকে। আর সংস্কৃত হচ্ছে ‘হিন্দুর ভাষা’! এই শ্রেণির মানুষের ভাষাজ্ঞান নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ আছে। এটা জোর দিয়েই বলা যায় যে, রোজকার জীবনে যেসব শব্দ ঝরনাধারার মতো সাবলিলভাবে বাঙালির জবানে চলে আসে, সেগুলোর বেশিরভাগই হয় আরবি, নয় তো ফারসি। ‘শুরু’ শব্দটির কথাই ধরা যাক। ‘আরম্ভ’ বললে একটা গুরুগম্ভীর ভাব এসে যায় কিন্তু ‘শুরু’টা বেশ মোলায়েম। এবং, মজার বিষয়, ‘মোলায়েম’টাও আরবি (আবার ‘মজা’ও তাই)! বই, খাতা, কাগজ, কলম, দোয়াত— এগুলোও আরবি। আমাদের দেশের চীনপন্থীরা ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’ বলার তুলনায় ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন বেশি। কারণ ওতে নাকি বেশি ‘জোশ’ পাওয়া যায়। এখানে ‘ইনকিলাব’ আরবি, ‘জিন্দাবাদ’ ফারসি। শুধু তাই নয়, শহিদ, মিনার, ময়দান, জমায়েত, মিছিল, দাবি-দাওয়া— এগুলোর সবই তো আরবি। বাংলার শব্দভাণ্ডারে এরকম আরবি-ফারসি শব্দ আছে চার থেকে ছয় হাজার (‘হাজার’ ফারসি)।
কয়েকটা নমুনা বা নজির দেখা যাক (‘নমুনা’ ফারসি, ‘নজির’ আরবি): কম, বেশি, দরজা, দরকার, সরকার, জবর, খবর, সবজি, ময়দা, কাবাব, কালিয়া, কিমা, কোপ্তা, দোকান, বাজার, মাল, মশলা, ওজন, ফায়দা, মুনাফা, লোকসান, ছোকরা, হাওয়া, শীত, লেপ, তোষক, গরম, জামা, পোশাক, ওজর, ওজুহাত, বাহানা, নরম, রাস্তা, মলম, পায়খানা ইত্যাদি! যাঁরা ভাষাচর্চা করেন, তাঁরা এসব শব্দের আসল পরিচয় জানেন (‘আসল’ আরবি, ‘নকল’ও তাই)। আসলে এসব শব্দ বাংলা। হ্যাঁ, বাংলাই তো। কেননা এগুলো দীর্ঘদিন ধরে বাংলায় চলছে। এগুলো বাংলার ধমনীতে মিশে গেছে।
সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে, ইদানীং শহুরে উচ্চবিত্ত ও কিছু কিছু মধ্যবিত্তের মধ্যে বাংলা ভাষা বর্জনের একটা ধারা বিকশিত হচ্ছে। এমন মানুষও আছেন, যাঁরা এই দেশে জন্মগ্রহণ করে, এই জলআবহাওয়ায় বড় হয়েও বাংলা বর্ণমালা চেনেন না। অথচ এরা হঠাৎ হঠাৎ আনুষ্ঠানিকভাবে বাঙালি হয়ে উঠতে খুব পছন্দ করেন। পহেলা ফাল্গুন, পহেলা বৈশাখ, একুশে ফেব্রুয়ারিতে বাঙালি সেজে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ভাসিয়ে দেন।
এই ‘বিশেষ শ্রেণি’র কথা আর কি বলব (গণমাধ্যমকর্মীদের কথা আগেই বলেছি), আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পর্যন্ত অনেকে নিজেদের মাতৃভাষা বাংলায় শুদ্ধ করে লিখতে-বলতে পারেন না! এর চেয়ে দুঃখের, লজ্জার আর হতাশার কথা আর কি হতে পারে? অথচ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে আমরা সবাই মাতৃভাষা বাংলাকে নিয়ে আবেগের আতিশয্যে ভেসে যাই!
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








