প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণার পর দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠে ব্যাংক হিসাবে এক লাখ টাকার ওপরের ব্যালেন্সে ৮শ টাকা হারে আবগারি শুল্ক কর্তনের বিষয়টি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে যানবাহন, চায়ের দোকান, আড্ডাস্থল- সব জায়গায় অর্থমন্ত্রীর সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠে সবাই। এর ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় সবচেয়ে বেশি বাড়াবে যে বিষয়টি, সেই মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাটের বিষয়টি অনেকটা চাপা পড়ে গেছে; যা নিয়ে বাজেটের আগে বার বার আন্দোলনের হুমকিও দিয়েছিলেন ব্যবসায়ীরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভ্যাট নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। সহনীয় পর্যায়ে না আসা পর্যন্ত চেষ্টা চলবে। আশাকরি সরকার ভোক্তাদের বিষয়টি বিবেচনা করবে। তবে অর্থমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ভ্যাট ও বাড়তি আবগারি শুল্ক কমানো হবে না।
১৯৯১ সালের ভ্যাট আইনে ৫৩৬টি এইচএস কোডভুক্ত পণ্যে ভ্যাট অব্যাহতি ছিল। এসব কোডের অধীনে ছিল প্রায় এক হাজার পণ্য। আর নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর হচ্ছে আগামী ১ জুলাই থেকে। এতে এক হাজার ৪৩টি এইচএস কোডভুক্ত পণ্যে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ফলে ভ্যাট অব্যাহতির তালিকায় থাকছে দুই হাজারের বেশি পণ্য। কিন্তু ভ্যাট অব্যাহতির তালিকা দীর্ঘ হলেও এক্ষেত্রে শুভংকরের ফাঁকি রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, যেসব পণ্যে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে বেশিরভাগই অপ্রয়োজনীয় ও অপ্রচলিত পণ্য। এসব পণ্য ভোক্তার কাজে লাগে না। অন্যদিকে প্রয়োজনীয় যেসব পণ্যে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর বিপরীতে সম্পূরক শুল্ক ও আমদানি শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। ফলে চূড়ান্তভাবে এসব পণ্যের দাম বাড়বে। যা চাপ বাড়াবে ভোক্তার ওপর।
এ বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংঠন কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) চেয়ারম্যান গোলাম রহমান চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, আমরা ভ্যাট নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রেখেছি। এনবিআরের সাথে আলোচনা চলছে।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রকে রাজস্ব আহরণ করতে হবে। কিন্তু নিত্যপ্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের ওপর ভ্যাটরে হার বেশি হলে ভোক্তার জন্য চাপ বাড়বে। ভোক্তার কাজে আসবে না এমন অনেক পণ্যে ভ্যাট অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এতে শুধু অপ্রয়োজনীয়ভাবে অব্যাহতির তালিকাই বড় হয়েছে।
ভ্যাট অব্যাহতির তালিকায় রয়েছে শুকর, গাধা, খচ্চরের মত অপ্রচলিত ও অপ্রয়োজনীয় পণ্য। এছাড়া রয়েছে মাছের গুঁড়া, শামুক ও কাকড়া বাদে জলজ অমেরুদণ্ডী প্রাণী আমদানি-সরবরাহ পর্যায়ে। যা জনসাধারণের কাছে অপরিচিত পণ্য। বাঁধাকপি, ফুলকপি, টমেটো, আলুর মতো সবজি খোলা বিক্রি হয় অলিতে-গলিতে। এসব পণ্যে ভ্যাট বসানো সম্ভব নয় বলে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এইচএস কোড অনুযায়ী একেকটি সবজিকে একেকটি পণ্য হিসেবে গণনা করায় অব্যাহতিপ্রাপ্ত পণ্যের তালিকা বড় হয়েছে।
পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, নতুন ভ্যাট আইনে নিত্য ভোগ্যপণ্যে যে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, তা আগেও ছিল। ফলে মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষেরা নতুন কোনো সুবিধা পাবে না। চা, বোতলজাত পানি, ব্রাশ, টুথপেস্ট, আসবাবের অতিপ্রয়োজনীয় পণ্যে ভ্যাট বসবে। বিদ্যুতে ভ্যাট বাড়ছে। বিদ্যুৎ বিভাগ দাম না কমালে আগের চেয়ে বাড়তি খরচ গুণতে হবে গ্রাহককে। রেস্তোরাঁয় খেতে গেলে ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হবে। খরচ বাড়বে এসি বাস, ট্রেন কিংবা লঞ্চে যাতায়াত ও উড়োজাহাজে ভ্রমণে।
নতুন আইনে বেশিরভাগ ভোগ্যপণ্যে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হলেও এগুলো আমদানিতে শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। যেমন হিমায়িত খাদ্য, বিভিন্ন ধরনের ফলমূল ও মসলাজাতীয় পণ্যে সরবরাহ পর্যায়ে কোনো ভ্যাট রাখা হয়নি। কিন্তু এগুলোর ওপর ২৫ শতাংশ হারে সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। ফলে চূড়ান্তভাবে এটি ভোক্তার ব্যয় বাড়াবে।
সম্প্রতি এনবিআরের এক কর্মশালায় গোলাম রহমান বলেন, এনবিআরের মতে, নতুন ভ্যাট আইনে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে না। কিন্তু নানা কারণে দ্রব্যমূল্য বাড়বে বলে আমাদের আশঙ্কা। যেমন চায়ে আগে ৪ শতাংশ ভ্যাট থাকলেও এখন ১৫ শতাংশ। কিন্তু চা তো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। এতে কি দ্রব্যমূল্যের ওপর প্রভাব পড়বে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতে ৩ শতাংশ থেকে ভ্যাট বাড়ানো হয়েছে ৪ শতাংশে। এখানে ভ্যালু এডিশন ধরা হয়েছে ২৬ দশমিক ৬৭ ভাগ। এর ফলে এই খাত প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারাবে বলে মনে করেন স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি আলী জামান। তিনি বলেন, ভ্যাটের কারণে এ খাত হুমকির মুখে পড়বে।
এদিকে গ্রাহকের ব্যাংক হিসাবে বছরের কোনো সময় এক লাখ টাকা বা তার বেশি ব্যালেন্স থাকলে তা থেকে ৮০০ টাকা আবগারি শুল্ক কর্তনের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী; যা আগে ছিল ১৫০ টাকা। এছাড়া ১০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ১ হাজার ৫০০ টাকার বদলে ২ হাজার ৫০০ টাকা, ১ কোটি থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত ৭ হাজার ৫০০ টাকার বদলে ১২ হাজার টাকা এবং ৫ কোটি টাকার বেশি লেনদেনে ১৫ হাজার টাকার বদলে ২৫ হাজার টাকা আবগারি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়।
বাজেটে অর্থমন্ত্রীর এ প্রস্তাবের পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সভা-সেমিনারে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। এতে ভোক্তাদের উপর বাড়তি চাপ নিয়ে আসা ভ্যাট চলে যায় আলোচনার বাইরে।
আলী জামান বলেন, আবগারি শুল্কের চেয়ে মারাত্বক বিষয় হচ্ছে ভ্যাট। অথচ সবাই আবগারি সমালোচনায় ব্যস্ত। এর ফলে নিরবেই ভ্যাটের বোঝা বসছে জনসাধারণের ঘাড়ে।







