রাজধানীর আজিমপুরে জঙ্গি বিরোধী অভিযানে নিহত ব্যক্তির নাম শিপার কাদেরী
বলে নিশ্চিত করেছে তার পরিবার। এ জঙ্গির সাংগঠনিক নাম ‘জামশেদ’। তার মরদেহের ছবি দেখে কাদেরী বলে সনাক্ত করে পরিবারের সদস্যরা। তবে সনাক্ত করলেও
মরদেহ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন তারা।
গাইবান্ধার পুলিশ সুপার আশরাফুল ইসলাম চ্যানেল আই অনলাইনকে জানান, তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী নিহত শিপারের
দাদা পাকিস্তানের নাগরিক। দেশটির পেশোয়ার অঞ্চল থেকে বাংলাদেশে এসে গাইবান্ধায় বসবাস শুরু করেন। এরপর সেখানেই বিয়ে করে স্থায়ী হন।
শিপারের বোন তানজিনা পুলিশকে বলেছেন, ২০১৪ সালে স্বপরিবারে
হজ করে আসার পর বাবা-মাসহ অন্যরা শিপারের মধ্যে ধর্মীয় উগ্রতা লক্ষ্য করেন। এসময় সে অন্য ব্যক্তিদেরও উগ্রতার পথে ভেড়াতে চেষ্টা করেন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শিপারের স্ত্রী আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’-এ চাকরি করতেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলেন। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সিটি ব্যাংকের কর্মকর্তা আব্দুত তাওয়াতের মেয়ে। তাদের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে।
অতি আধুনিক এই মেয়েটি স্বামীর সঙ্গে হজ করে ফিরে আসার পর তার পোশাক এবং আচরণে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। গত এপ্রিলে মালয়েশিয়া যাচ্ছে জানিয়ে বিমানবন্দরে যাওয়ার কথা বলে উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরের বাসা থেকে স্ত্রী-সন্তানসহ বের হওয়ার পর তারা নিখোঁজ হয় বলে জানান শিপারের বাবা আব্দুল বাতেন কাদেরী।
তবে বাতেন কাদেরীর দেয়া তথ্য নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহে আছে পুলিশ। কারণ তিনি নিজেই ছেলেকে স্বপরিবারে বিমান বন্দরে দিয়ে এসেছেন পুলিশকে প্রথমে এই তথ্য জানালেও এখন বলছেন, অসুস্থতার জন্য সেদিন বিমানবন্দরে যাননি তিনি! গুলশানে হলি আর্টিসান ঘটনার পর তার ছেলে জঙ্গি তৎপরতায় জড়িয়েছে এ নিয়ে শঙ্কিত হলেও এই শঙ্কার কথাও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাননি তিনি।
এ ধরণের স্ববিরোধী বক্তব্যের জন্য দীর্ঘদিন মধ্যপ্রাচ্যে বসবাস করা শিপারের বাবাকেও সন্দেহের চোখে দেখছে গোয়েন্দারা।
পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মো. ছানোয়ার হোসেন চ্যানেল অাই অনলাইনকে বলেন, আমাদের ধারণা শিপারের দুই সন্তানের মধ্যে ১ জন বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে তদন্তকারীদের গোলকধাঁধায় ফেলার চেষ্টা করছে। উত্তরা মাইলস্টোন স্কুলের ছাত্র ১৪ বছরের আফিফ কাদেরী আদর এবং তার ভাই ১৫ বছরের আবিরও জঙ্গি তৎপরতায় জড়িয়ে থাকতে পারে।
তদন্তকারীদের পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, শিপারের চাচাতো ভাই সুইডেন প্রবাসী মাহবুব কাদেরী। আরেক চাচাতো বোনের স্বামী অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা। এ দু’জনের সঙ্গে শিপারের যোগসূত্র খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
গাইবান্ধা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মেহেদী হাসান চ্যানেল আই অনলাইনকে জানান, ঢাকা কলেজ থেকে হিসাব বিজ্ঞান এবং একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন শিপার। ২০০১ সালে যোগ দেন ‘কল্লোল গ্রুপে’। পরে মোবাইল টেলিকম অপারেটর অ্যাকটেল (পরিবর্তিত নাম রবি) ও রবিতে চাকুরিরত অবস্থায় ডাচ বাংলা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের অ্যাসিসট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে যোগ দেন। তবে সেই চাকরিও ছেড়ে দিয়ে আরও দুইজন অংশীদার নিয়ে ‘আল-সাকিনা হোম ডেলিভারি সার্ভিস’ নামে একটি ব্যবসায় শুরু করেন শিপার।
২০১৪ সালে হজ থেকে ফিরে পরিচিতদের মধ্যে উগ্রপন্থী ইসলামী মতবাদ প্রচার শুরু করে সে। তাদের বাড়ি গাইবান্ধা জেলা সদরের ‘বাইটকামারী’ গ্রামে।
গত শনিবার ১০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর আজিমপুর বিজিবি ২ নম্বর গেটের কাছাকাছি ২০৯ নম্বর লালবাগের বাড়িতে জঙ্গি থাকতে পারে এমন গোপন তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটকে সঙ্গে নিয়ে অভিযান পরিচালনা করে পুলিশ। পরে অভিযানে যোগ দেয় সোয়াট।
ওইদিন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার পর থেকে পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। উপস্থিতি টের পেয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর চড়াও হয় জঙ্গিরা। অভিযানে ‘জামশেদ’ নামে এক জঙ্গি নিহত হয়। আহত অবস্থায় আটক করা হয় ৩ নারী জঙ্গিকে।
আহত নারী জঙ্গি শীলা, মিরপুর রূপনগরের জঙ্গি বিরোধী অভিযানে নিহত আরেক জঙ্গি প্রশিক্ষক মেজর (অব.) জাহিদের স্ত্রী বলে ধারণা করছে পুলিশ।







