প্রায় দুই দশক আগে জলাধারের ক্ষতি করে বেআইনিভাবে গড়ে তোলা হয় ১৮ তলা বিজিএমইএ ভবন। হাইকোর্ট ২০১১ সালে এক রায়ে ভবনটি ভাঙ্গার নির্দেশ দেয়, যা গত ২ জুন আপিল বিভাগের রায়েও বহাল থাকে। হাইকোর্ট রায়ে বলেছিল, বিজিএমইএ ভবনটি সৌন্দর্যমণ্ডিত হাতিরঝিল প্রকল্পে একটি ক্যান্সারের মতো। এ ধ্বংসাত্মক ভবন অচিরেই বিনষ্ট না করা হলে এটি শুধু হাতিরঝিল প্রকল্পই নয়, সমস্ত ঢাকা শহরকে সংক্রমিত করবে। দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্যের শিল্পোদ্যোক্তাদের সমিতির এই ভবনের বিষয়ে রায়ে বলা হয়, ‘আর্থিক পেশিশক্তির অধিকারী বলে’ শক্তিশালী একটি মহলকে ‘আইনের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে’ এমন যুক্তি কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
আদালত বললেও আমাদের দেশে এখনও পর্যন্ত এই ‘আর্থিক পেশিশক্তির অধিকারী শক্তিশালী মহল’কে ‘আইনের ঊর্ধ্বে’ই থাকতে দেখা যাচ্ছে। সর্বোচ্চ আদালতের চূড়ান্ত রায়ের পরও অন্যায় ও অবৈধভাবে গড়ে তোলা এই ভবনটি ভেঙ্গে ফেলার কোন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
পাশাপাশি আমরা এই চিত্রও দেখছি, আখকলের জন্য একোয়ার করা জমি ‘অবৈধ দখলমুক্ত’ করতে গোবিন্দগঞ্জের হতদরিদ্র ভূমিহীন সাঁওতাল সম্প্রদায়ের উপর কী নিষ্ঠুর নির্যাতন চালানো হলো। আখকলের কর্মচারীরূপী ভাড়াটে গুণ্ডা, শাসকদলের স্থানীয় ঠ্যাঙারে বাহিনী আর ক্ষমতাসীনদের আজ্ঞাবহ সশস্ত্র পুলিশ বিনা উস্কানিতে ‘দখলমুক্ত’ করার নামে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের উপর নিষ্ঠুর হামলা ও গুলি চালালো। তিনজন সাঁওতাল পুরুষকে হত্যা করা হলো। বেশ কয়েকজনকে জখম করা হলো। সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর প্রায় আড়াই হাজার সদস্যকে ঘরছাড়া করা হলো। তাদের বাড়িঘর লুটপাট ও আগুলে পুড়িয়ে দেয়া হলো! একই রাষ্ট্র, দুই আইন! সাঁওতালরা গরিব বলেই কী এই জুলুম? তিনজন মানুষকে হত্যা করার দায় কে নেবে? এই হত্যার কী বিচার হবে না? দেশটা কী শুধু বড়লোকের?
অথচ আমরা সব সময় গালভরা বুলি শুনি যে, আইনের চোখে সবাই সমান। রাষ্ট্রের সব নাগরিক আইনে সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। কাগজেকলমে অবশ্য এটা এখনও সত্যিই আছে। কেবল বিধিবদ্ধ আইনই নয়, আমাদের সংবিধানের মাধ্যমেও নাগরিকের সে অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। সংবিধানে তৃতীয় ভাগের মৌলিক অধিকার অংশে ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।’ এই অধিকারটি শুধু অধিকারই নয়, মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। মৌলিক অধিকার হচ্ছে এমন অধিকার যা রাষ্ট্র তার নাগরিকদের প্রদান করতে আইনত বাধ্য। অর্থাৎ রাষ্ট্র নাগরিকদের এ সব মৌলিক অধিকার বলবৎ করতে অঙ্গীকারাবদ্ধ। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আইনের দৃষ্টিতে বিশেষ সুবিধা পাওয়ার অধিকারী নয়।
প্রশ্ন হলো, শাসকরা তাহলে কোন আইনে সাঁওতালদের ‘উচ্ছেদ’ করল? তাদের হত্যা করল? আর সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশ সত্ত্বেও বেআইনিভাবে গড়ে তোলা ১৮ তলা বিজিএমইএ ভবন কেন সরকার এখনও ভাঙ্গছে না? যারা অন্যায়ভাবে এই ভবন বানিয়েছেন, অন্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে ভবনের অংশবিশেষ বিক্রি করে টাকা হাতিয়েছেন, তাদের ব্যাপারে সরকারে এত পক্ষপাত ও করুণা কেন? সরকারের কর্তাব্যক্তিরা এর কী জবাব দেবেন?
আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসমর্থকরা সব সময় মুখে বড় বড় কথা বলেন। অথচ বিজিএমইএ ভবন তথা অন্যায়ের এ মনুমেন্টটি কিন্তু তাদের সরকারের আমলেই ‘বন্দোবস্ত’ দেয়া হয়েছিল। ১৯৯৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে বিজিএমইএ তাদের প্রধান কার্যালয় ভবন নির্মাণের জন্য সোনারগাঁও হোটেলের পাশে বেগুনবাড়ি খালপাড়ের এ জায়গাটি নির্ধারণ করে এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) কাছ থেকে ৫ কোটি ১৭ লাখ টাকায় জমিটি কেনে। তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই বছরই বিজিএমইএ ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন (পরবর্তীকালে যদিও প্রধানমন্ত্রী বিজিএমইএর ভবনটিকে হাতিরঝিল প্রকল্পের ওপর ‘বিষফোঁড়া’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন)! ২৮ নভেম্বর শুরু হয় ভবন তৈরির কাজ। ২০০৬ সালের অক্টোবরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বিজিএমইএ ভবন উদ্বোধন করেন।
এত বড় একটা জালিয়াতির ঘটনা তো উৎরে যেতেই বসেছিল। ইংরেজি দৈনিক ‘নিউ এজ’কে ধন্যবাদ জানাতে হয় এজন্য যে, তারা রাজউকের অনুমোদন ছাড়াই বিজিএমইএ ভবন নির্মাণ করা নিয়ে ২০১০ সালের ২ অক্টোবর একটি প্রতিবেদন ছাপে। ওই প্রতিবেদনটি সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ডিএইচএম মনির উদ্দিন আদালতে উপস্থাপন করেন। পরদিন ৩ অক্টোবর বিজিএমইএ ভবন কেন ভাঙার নির্দেশ দেওয়া হবে না জানতে চেয়ে হাইকোর্ট স্বপ্রণোদিত হয়ে (সুয়োমোটো) রুল জারি করে। এ রুলের ওপর শুনানি শেষে হাইকোর্ট রায় দেয়।
কিন্তু টাকার গরমে ধরাকে সরা জ্ঞান করা বিজিএমইএ নেতারা আইনের মারপ্যাঁচে নিজেদের অপকর্মকে জায়েজ করার আপ্রাণ চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। হাইকোর্টের ওই রায় পুনর্বিবেচনার জন্য তারা সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন করেন। আপিল বিভাগ হাইকোর্টের দেওয়া আগের রায় বহাল রাখে। সর্বশেষ গত ২ নভেম্বর বিজিএমইএর করা লিভ টু আপিল খারিজ করে দেয় আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ। বিজিএমইএ ভবন ভাঙার বিষয়ে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ে অবিলম্বে ওই ভবন নিজ খরচে ভাঙতে বিজিএমইএকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বিজিএমইএ নির্দেশ পালনে ব্যর্থ হলে রায়ের কপি পাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে রাজউককে ভবনটি ভাঙ্গতে বলা হয়েছে। আদালত জলাশয় ও পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করে বিজিএমইএ ভবন নির্মাণ করার বিষয়টিকে একটি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করে এ ব্যাপারেও পদক্ষেপ নিতে পরিবেশ অধিদফতর, জেলা প্রশাসক ও পুলিশের মহাপরিদর্শককে নির্দেশ দিয়েছেন।
প্রশ্ন হলো, রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে এমন একটি স্থাপনা কীভাবে গড়ে উঠতে পারল? এই ভবন নির্মাণের দায় কার? তাদের কী খুঁজে বের করা হবে? নাকি পার পেয়ে যাবে? আদালতই বলেছে যে, গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ওই ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেয়া আইনসম্মত ছিল না। কেননা, জলাশয় আইন ২০০০-এর ৩৬ ধারা অনুযায়ী এ ধরনের ভবন নির্মাণ অবৈধ। তাছাড়া ১৯৯৫ সালে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী এ ভবন নির্মাণের সঙ্গে জড়িতরা শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। এছাড়া রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এ ভবন নির্মাণে এখতিয়ার বহির্ভূত অনুমোদন দিয়েও মহা অন্যায় করেছে। এই ভবনটি একরাতে নির্মিত হয়নি। এটি সবারই চোখে পড়েছে। অথচ যাদের এ ব্যাপারে কথা বলার কথা, এ অন্যায়ের মনুমেন্টটাকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার কথা-তারা নীরবতা পালন করেছে। তাদেরও খুঁজে বের করা দরকার।
অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম যথার্থই বলেছেন, বিজিএমইএ ভবন ভেঙে ফেললেই সব শেষ হয়ে গেল না। ১৮ তলা এ ভবনটি নির্মাণ করে বিজিএমইএ গত ১০ বছরে ভবনের ভাড়া ও ফ্লোর বিক্রি বাবদ যে আয় করেছে তা সরকারের কোষাগারে জমা দেওয়া সমীচীন হবে। এতে দৃষ্টান্ত স্থাপন হবে। কেউ আর খাস জমিতে সুউচ্চ ভবন নির্মাণ করে ব্যবসা ফাঁদার চেষ্টা করবে না। র্যাংগস ভবন ভাঙার মাধ্যমে অতীতে এ ধরনের দৃষ্টান্ত রয়েছে। আদালতের রায় অনুযায়ী বিজিএমইএ ভবন ভাঙা হলে এবং তাদের কাছ থেকে জরিমানা আদায় করলে সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।
প্রশ্নটা শুধু আইনের শাসনেরই নয়, সংবিধান রক্ষার, ন্যায়ের এবং ন্যায্যতারও বটে। বিজিএমইএ ভবনের মালিকরা কী সর্বোচ্চ আদালতের চেয়েও শক্তিশালী? তা না হলে সর্বোচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তের পরও ভবনটি ভাঙ্গা বা সরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে কোন ধরনের তৎপরতা শুরু করা হয়নি কেন?
সরকারের উচিত অবিলম্বে ভবনটি ভেঙ্গে ফেলা। অথবা আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষণা দেয়া যে, তাদের পক্ষে বিজিএমইএর স্বার্থের বিরুদ্ধে যাওয়া সম্ভব নয়। সর্বোচ্চ আদালত বললেও না! সাংবিধানিক বিধান থাকলেও না!
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







