ইতিহাস লুকিয়ে রাখা যায় কিংবা বিকৃত করা যায়। কিন্তু চিরন্তন সত্য হলো ইতিহাস কোন না কোনভাবেই প্রকাশিত হয় তার আপন নিয়মে। এ সত্যতার প্রমাণ দিচ্ছে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম তাদের মনের অজান্তে লুকিয়ে থাকা দেশ প্রেমের তাগিদে-২১ ফেব্রুয়ারি, ৭ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বর পালন করার মাধ্যমে। তারা দেশকে ভালোবেসে এ দিনগুলোতে লাল সবুজের পতাকাকে নানা আঙ্গিকে নিয়ে উৎসবে মুখরিত হয় স্বাধীনতার গৌরবে গৌরাম্বিত হয়ে।
বাংলাদেশের যুগ যুগান্তরের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান–একজন মহান ব্যক্তিত্ব তা অনস্বীকার্য ও সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। তথাপি বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ এ বিষয়টিকে আগামী প্রজন্ম কি ভাবে দেখছে তা বর্তমান সমাজের অনেকের কাছে একটি প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর এ প্রশ্নের উত্তরের বাস্তবতা অনেক সময় সমাজ, রাষ্ট্রকে আহত করে। যার অন্তরালে রয়েছে অতীত ও বর্তমান প্রেক্ষাপটের কিছু বিশেষ কারণে।
অন্যদিকে তরুণ প্রজন্মের ইতিবাচক দিক হচ্ছে তারা তাদের জাতির পিতার মহানুভবতার কথা জানে। এবং মান প্রাণে বিশ্বাস করে বাঙালী জাতীয়তাবাদের নামের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত রয়েছে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ও দেশ প্রেম। যে দেশ প্রেম নেই কোন ছলচাতুরী। আছে শুধু নিখাদ ভালোবাসা। কিন্তু এ প্রজন্মের জানার মাঝেও আশঙ্কাজনকভাবে যে বিষয়টি সত্যি তা হলো, হাজার বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে তরুণ প্রজন্মের জ্ঞান খুব সীমিত।
এক্ষেত্রে আশার আলো তখনই দেখা যাবে যখন তাদের চেতনা আর বিশ্বাসে এই মহান ব্যক্তির জীবন সম্পর্কে তরুণ প্রজন্মের ধ্যানধারণাতে কোন দ্বিধা থাকবে না। কিন্তু নিমর্ম বাস্তবতা হলো, ইতিহাসের মূলধারাতে তাদের নিয়ে প্রবেশ করলে বিষয়টি ভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপিত হয় ভিন্ন জন হতে। যা বোধ করি একটি জাতির জন্য আগামী দিনের অশনি সংকেত হিসাবে বাজতে থাকে বর্তমানেও। কেননা একটি জাতির অস্তিত্ত্ব টিকে থাকে তার অতীত ইতিহাস ,বর্তমান কর্মকাণ্ড আর আগামী প্রজন্মের ভাবনার উপর। অথচ এদেশের জনগণ এখন উপলব্ধি করতে পারে অতীতে ইতিহাস নিয়ে কি নোংরামি হয়েছে। দীর্ঘকাল ধরে কীভাবে আমাদের ইতিহাস ও ইতিহাসের সবচেয়ে অবিচ্ছেদ্য অংশ অবহেলিত ও অসম্মানিত হয়ে আসছে নানাভাবে।
বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তরুণ সমাজ, বিশেষ করে ইংরেজি শিক্ষা ব্যবস্থায় যারা অভ্যস্ত তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি অনেকটাই আশাহত। কেননা তাদের অধিকাংশেরই উত্তর, “আমি জানি না” বা “ রাজনৈতিক বিষয়ে আমার আগ্রহ নেই”। দুর্ভাগ্যজনক হলে এটাই বাস্তব সত্য।
এখন যদি তরুণ প্রজন্মকে তাদের এই ব্যবহারের জন্য “অজ্ঞ ও রুঢ়” বলে অভিযুক্ত করা হয় তবে তা সম্পূর্ণ না হলেও অনেকাংশে বর্তমান সময়ে ভুল হিসেবে বিবেচিত হবে। কেননা মহান এই ব্যক্তি সম্পর্কে অনীহা ও অজ্ঞতার জন্য তাদেরকে এককভাবে দোষারোপ করা যাবে না। বস্তুত আমাদের দেশের বিদ্যমান প্রতিহিংসাপরায়ন রাজনীতির তিক্ত অভিজ্ঞতা পর্যবেক্ষণের ফলেই তারা এরকম ধারণা পোষণ করেছে।
এ অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই এ নেতিবাচক ধারণার কারণগুলো ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। আর সে ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব বিশ্লেষণ অনেক বেশি মাত্রায় পীড়াদায়ক এ জাতির জন্য। তাদের মতে, স্কুল জীবন থেকেই রাজনীতি সম্পর্কে তাদের বিরূপ মনোভাবের সূত্রপাত ঘটে। যার একটি কারণ হলো অনেক ক্ষেত্রেই পারিবারিক সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। বাবা মা কিংবা পরিবারের অন্য সদস্যরা চেষ্টা করে নিজেদের মতামতকে চাপিয়ে দিয়ে সন্তানকে প্রভাবিত করতে। এতে করে পিতামাতা ইতিহাসকে নিজের ইচ্ছেমতও পরিমার্জিত করে ব্যাখ্যা করেন। যার ফলে সন্তানরা তাদের পিতামাতার মতো সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বেড়ে ওঠে।
তারপর এই অতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটি পালন করে আমাদের তথাকথিত আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা ও গণমাধ্যম। শিক্ষাজীবনে একজন ব্যক্তির মূল্যবোধের সঠিক বিকাশ হয়। সাথে সাথে তার নিজস্ব সংস্কৃতি ও ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন হবার প্রকৃত সময় এটি। কিন্তু তরুণ প্রজন্মের এ বিষয়ে অভিজ্ঞতা হতবাক করার মতো। বিগত দিনগুলোতে স্কুল কলেজে শাসক আকবর, হুমায়ন বা বাবরের পিতা কে তা শেখানো হত। কিন্তু আমাদের জাতির পিতা সম্পর্কে কখনও কিছু শেখানো হয়নি। এমন কি সরকার পরিবর্তন হওয়ার সাথে সাথে পাঠ্য পুস্তকের বিষয়বস্তর ও পরিবর্তন হয়ে যেত ।
আর একটি বিতর্কিত ঘটনার সৃষ্টি করে মুষ্টিমেয় শিক্ষকরা। শিক্ষকদের দায়িত্ব হলো দেশের ইতিহাস সম্পর্কে সঠিক শিক্ষা প্রদান। কিন্তু তারা নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্বাস ও নেতাদের দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়ে ভুল শিক্ষা দিয়ে সত্যকে আড়াল করে। শুনতে বিস্ময়কর হলেও এটাই বাস্তবতা ।
একটি সাবলীল উপস্থাপন এবং মনোমুগ্ধকর টিভি অনুষ্ঠান সহজেই প্রভাবিত করতে সক্ষম হয় মানুষকে। এখানেই তথ্য প্রচারে গণমাধ্যমের প্রকৃত সার্থকতা। কিন্তু টেলিভিশনের পর্দায় বা পত্রপত্রিকায় কিছু ভদ্রবেশী দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদদের অর্থহীন বক্তব্য দেখে বা পড়ে তরুণ প্রজন্ম দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
বাবা-মা, শিক্ষক, রাজনীতিবিদদের থেকে শেখা ও জানা গড়মিল তথ্য তরুণদের চিন্তাকে এলোমেলো করে দিত। যার ফলে তরুণরা আর এ বিষয়ে এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করতে চাইত না।
সময় বদলাচ্ছে। একবিংশ শতাব্দীর তরুণ সমাজ নিজস্ব ধ্যান-ধারণার উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। রাজনীতিবিদ, শিক্ষক বা পিতামাতা আর তাদেরকে প্রভাবিত করতে পারে না। আজকের তরুণ সমাজ এতটাই বাস্তববাদী ও মুক্তমনা যে তারা খুব ভালভাবেই জানে রাজনীতিবিদরা যাই বলুক না কেন তারা তাদের নিজস্ব চিন্তা চেতনার উপর নির্ভর করতে পারে। ইতিহাস কে জানতে হবে নিজে সন্ধান করে। আর তাদের সন্ধানে সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে বিভিন্ন পরিকল্পনার মাধ্যমে। মুজিব বর্ষ কেবল উৎসব নয়। এর ধারাবাহিকতায় কাজ করে যেতে হবে।

তাই, এখনই সময় এ জাতির তরুণ প্রজন্মকে বাংলার প্রকৃত ইতিহাসের সাথে একাত্ম করার। সময় এসেছে এই দেশের স্বাধীনতা ও সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর যে আত্মত্যাগ সে সম্পর্কে অবহিত করার। ইতিহাস পাতা থেকে ইতিহাসকে সরিয়ে দেয়ার অর্থ হলো শুধুমাত্র এই মহান ব্যক্তিত্বের অবমাননা নয় বরং সমগ্র জাতিকে অপমান করা।
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম আগামী শতকের কাণ্ডারি হয়ে যে যার অবস্থান থেকে দেশের অগ্রযাত্রায় কাজ করবে। তাই এই তরুণ প্রজন্মকে বঙ্গবন্ধুর সাহসিকতা ও প্রজ্ঞা দিয়ে অনুপ্রাণিত করতে হবে। তাহলে বাংলার মাটিতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর যে রক্ত মিশে আছে সেখান থেকে জন্ম হবে হাজারো বঙ্গবন্ধুর। যারা বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের মাধ্যমে জাতিকে উপহার দিবে অর্থনৈতিক মুক্তি। সে সাথে মানবিক মূল্যবোধের প্রকৃত অর্থ অনুধাবন করে দূর করবে প্রতিহিংসাপরায়নতার রাজনীতির হানাহানি।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







