এ এক আশ্চর্য প্রবণতা চালু হয়েছে দেশে। বনিবনা না হলে, কারো ধর্মাচার পছন্দ না হলে, কারো চিন্তা পছন্দ না হলে, স্রেফ খুন করা হচ্ছে। কখনও চাপাতির কোপে, কখনও বন্দুকের গুলিতে, কখনও বা বোমার আঘাতে কেড়ে নেয়া হচ্ছে ভিন্ন চিন্তা, ভিন্ন মত, ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের জীবন।
আমাদের দেশে আকস্মিকই যেনো ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন মতের মানুষেররা উগ্র ধর্মবাদীদের প্রধান টার্গেটে পরিণত হয়েছেন। একের পর এক সন্ত্রাসী আক্রমণের শিকার হচ্ছেন ভিন্ন ধর্ম আর মুক্তবুদ্ধি চর্চাকারী ব্যক্তিরা। অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এই হামলাগুলো চালানো হচ্ছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলায় একটি ইসকন মন্দিরে প্রার্থনা চলাকালে গুলি ও বোমা হামলা চালানো হয়েছে।
শুধু দিনাজপুরেই এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে এ নিয়ে চারটি সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটল। গত ১৮ নভেম্বর সকালে জেলা শহরের মির্জাপুর এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে আহত হন গির্জার ধর্মযাজক ও চিকিৎসক ইতালির নাগরিক পিয়েরো পিচম। এরপর গত ৩০ নভেম্বর রাতে চিরিরবন্দর উপজেলার রানীরবন্দরে গুলি করে হত্যার চেষ্টা করা হয় হোমিও চিকিৎসক বীরেন্দ্রনাথ রায়কে।
তিনি ইসকনের জেলা শাখার সভাপতি। আর গত ৪ ডিসেম্বর রাতে বোমা হামলা হয় কাহারোল উপজেলার ঐতিহাসিক কান্তজিউ মন্দির প্রাঙ্গণে রাসমেলা উপলক্ষে আয়োজিত যাত্রাপালার প্যান্ডেলে। এতে আহত হন ছয়জন। এর আগে বগুড়ার শিবগঞ্জে শিয়া সম্প্রদায়ের এক মসজিদে ঢুকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে মুয়াজ্জিনকে। তারও আগে রাজধানীর হোসেনী দালানে তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতিকালে এই শিয়া সম্প্রদায়ের লোকজনের উপর বোমা হামলা চালানো হয়। এই আক্রমণেও একাধিক ব্যক্তি প্রাণ হারান।
গত ২৪ নভেম্বর ফরিদপুর হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অলোক সেনকে ফরিদপুরে নিজ বাসার সামনে কুপিয়ে আহত করে দুর্বৃত্তরা। ৮ নভেম্বর রংপুর নগরীর আর কে রোডের আইডিয়াল মোড়ে নিজ বাসার সামনে দুর্বৃত্তদের গুলিতে গুরুতর আহত হয়েছেন বাহাই সম্প্রদায়ের নেতা রুহুল আমিন। সম্প্রতি রংপুর, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে খ্রিস্টান মিশনারির প্রধানদের হত্যার হুমকি দিয়ে উড়ো চিঠি পাঠানো হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে যারা খ্রিষ্টান ধর্ম প্রচার করছে, তাদের সকলকে এক এক করে বিদায় করা হবে। এই আক্রমণের ঘটনাগুলো অত্যন্ত পরিকল্পিত তাৎপর্যপূর্ণ। ভিন্ন মত ও ভিন্ন ধর্মের মানুষদের আক্রমণ করে বুঝিয়ে দেয়া হচ্ছে, এদেশে বিশেষ একটি ধর্মমতের বাইরে কেউ থাকতে পারবে না। এখানে তারা কেউ নিরাপদ নয়।
এই সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীরা যেনো সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে-সেটাও আক্রমণের অন্যতম কারণ হতে পারে। অথচ এ ব্যাপারে সরকার কার্যকর কিছুই করতে দেখা যাচ্ছে না। না আক্রমণকারীরা চিহ্নিত হচ্ছে, না কারো শাস্তি হচ্ছে! এসব ঘটনার সঙ্গে আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদী রাজনীতির একটি যোগ বা প্রভাব রয়েছে। নিজের ধর্মমতকে শ্রেষ্ঠ মনে করা, অন্যের উপর সেই মত চাপিয়ে দেয়া, যারা তাদের মত অনুযায়ী না চলবে, তাদের গর্দান কেটে হত্যা করা-এ সবই হচ্ছে জঙ্গিবাদী রাজনীতির মূল বৈশিষ্ট্য। এই রাজনৈতিক দর্শন এখন ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে।
ভারতবর্ষে অবশ্য উগ্র ধর্মবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার রাজনৈতিক চরিত্রের উন্মেষ ঘটেছে বৃটিশ শাসনের আমলে, বিশেষভাবে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর। ভারতবর্ষের দুটি প্রধান ধর্মীয় সম্প্রদায় যাতে এক জোট হয়ে বৃটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আর বিদ্রোহ না করতে পারে সে জন্য তারা গ্রহণ করেছিলো ধর্মীয় বিভাজন নীতি। তারা হিন্দুকে বেশি হিন্দু এবং মুসলমানকে বেশি মুসলমান হওয়ার জন্য প্ররোচিত করেছে।
১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষে বৃটিশ শাসনের অবসান ঘটে অখণ্ড ভারতবর্ষকে খণ্ড বিখণ্ড করে ধর্মীয় দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টির মাধ্যমে। পাকিস্তানের সামন্ত-ভূস্বামী ও সামরিক বাহিনীর হাত ধরে কালক্রমে পাকিস্তান একটি ইসলামিক-সামরিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ধর্মপরায়ণ হলেও ধর্মের নামে রাজনীতি এবং ধর্মের নামে শোষণ নির্যাতন তারা যে পছন্দ করে না একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির বিজয় তার বড় প্রমাণ।
একাত্তরে পাকিস্তানের সামরিক জান্তা এবং তাদের এদেশীয় সহযোগী জামাতে ইসলামী, মুসলিম লীগ প্রভৃতি দল পাকিস্তান ও ইসলামকে সমার্থক বিবেচনা করে বাঙালিদের ইসলামের শত্রু হিসেবে গণ্য করেছে। এভাবে তারা ধর্মের নামে গণহত্যা ও নারী নির্যাতনসহ যাবতীয় ধ্বংসযজ্ঞ বৈধ করতে চেয়েছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় এজেন্টরা ইসলাম ও পাকিস্তান রক্ষার কথা বলে তিরিশ লক্ষ বাঙালিকে হত্যা করেছে, সোয়া চার লাখেরও বেশি নারীকে ধর্ষণ করেছে, শত সহস্র জনপদ ধ্বংস করে দিয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের এত বড় ঘটনা বিশ্বের আর কোথাও ঘটেনি। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার গণতন্ত্র, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রকে মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করে সংবিধান প্রণয়ন করে। এতে বলা হয়েছিলো ধর্মের নামে কেউ কোন রাজনৈতিক দল করতে পারবে না। কিন্তু নানা ষড়যন্ত্রের রাজনীতির কারণে সেই ধারা তেমনটা এগুতে পারেনি।
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে মূলত একাত্তরে পরাজিত পাকিস্তানপন্থীরা আবার ক্ষমতা দখল করে নেয়। জেনারেল জিয়াউর রহমান একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেও ক্ষমতায় থাকার জন্য তিনি সামরিক বাহিনীর প্রধান হিসেবে যে দল গঠন করেছিলেন সেই দলের একটি বড় অংশ ছিল মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী।
জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখল করে প্রথমেই বাংলাদেশের সংবিধান থেকে রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে গৃহীত ধর্মনিরপেক্ষতা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্র মুছে ফেলে, সংবিধানের উপরে ‘বিসমিল্লাহ …..’ লাগালেন এবং ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠনের উপর যে নিষেধাজ্ঞা ছিল সেটি প্রত্যাহার করে বাংলাদেশকে পাকিস্তানি যুগে ফিরিয়ে নেয়ার উদ্যোগ নিলেন।
স্বাধীন বাংলাদেশে জেনারেল জিয়ার আমল থেকে সংখ্যালঘু ধর্মীয় ও এথনিক সম্প্রদায়ের উপর নতুনভাবে নির্যাতন আরম্ভ হয় এবং এর ধারবাহিকতায় খালেদা জিয়ার শাসনামলে এদেশে প্রথম ধর্মীয় রাজনীতির উগ্র প্রকাশ দেখা যায়। বোমা মারা, ভিন্ন মতালম্বীদের হত্যা ইত্যাদি সন্ত্রাসী তৎপরতা এ সময়েই বিস্তার লাভ করতে থাকে।
রাজনীতিতে অতিমাত্রায় ধর্মের ব্যবহার মানুষের মনোজগতেও পরিবর্তন নিয়ে আসে। সাধারণ মানুষের ধর্মপ্রীতির সঙ্গে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার কোন সম্পর্ক নেই -এ কথা যেমন সত্য, আবার এটাও অস্বীকার করা যাবে না যে, ধর্মপ্রীতির প্রাবল্য ও উগ্রতা চেতনাকে ধাবিত করে মৌলবাদের দিকে, অসহিষ্ণুতার দিকে, ভিন্ন ধর্ম ও মতের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ ও সহিংসতার দিকে। দেশকে সবদিক থেকে পিছিয়ে দেয়া এবং অস্থিতিশীল করে একটি অকার্যকর রাষ্ট্র বানানোর ষড়যন্ত্র হচ্ছে বহুকাল থেকে। বলা যায় বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে সেই ষড়যন্ত্র চলে আসছে সমান ভাবেই।
আর এই ষড়যন্ত্রীরা বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও হত্যার চেষ্টা করেছে অনেকবার। এর মধ্যে সরাসরি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হয়েছে ঢাকায় আওয়ামী লীগের সন্ত্রাস বিরোধী সমাবেশে গ্রেনেড হামলা করে।
২১ শে আগষ্টের সেই নৃশংস হামলার বিচার আজও শেষ হয়নি। সেই ষড়যন্ত্রী ও অপশক্তি এখনো সমান ভাবেই দাবার চাল দিয়ে চলেছে। বাংলাদেশ যেন মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধকে ধারণ করে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে সেই অপচেষ্টা চলছে বিরামহীন ভাবে।
সম্প্রতি যে সব হত্যাকাণ্ড ঘটছে, নাশকতা হচ্ছে এসব কিছুই একই সূত্রে গাঁথা বলেই বিষেষজ্ঞ মহল মনে করেন। বর্তমান বাংলাদেশ এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার পাকিস্তানপন্থী ধর্মব্যবসায়ীদের আঁতে ঘা দিয়েছে। গত চার দশক ধরে গড়ে উঠা তাদের স্টাবলিশমেন্ট চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
এ অবস্থায় পাকিস্তানপন্থী ও জাতীয়-আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীরা উগ্র ধর্মবাদীদের মাধ্যমে মরণ-কামড় দেবে-এটাই স্বাভাবিক।সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তারই প্রমাণ! এর বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারলে আমাদের পরিণতি হবে পাকিস্তানের মত।
দেশের সকল প্রগতিশীল শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে ক্ষমতাসীনরা ‘মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় লড়াই’য়ে বিজয়ী হবে, না দম্ভ আর অহংকারকে সম্বল করে একা একা দানবের বিরুদ্ধে অসম লড়াইয়ে সামিল হবে-সে সিদ্ধান্ত আজ তাদেরকেই নিতে হবে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







