শিরশ্ছেদ, পাথর ছুড়ে মারা, জবাই, পাইকারি হারে হত্যা, জীবন্ত কবর, নানাভাবে ধর্মীয় ও জাতিগত নিধন– কী করছে না ইসলামিক স্টেট বা আইএস!
এই চরমপন্থি গোষ্ঠিটি হঠাৎ করে ইরাক ও আশেপাশের এলাকায় আত্মপ্রকাশ করার পর থেকেই শিউরে ওঠার মতো হিংস্রতা আর রক্তপাতের মাধ্যমে পুরো বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
তাদের হিংস্রতার কারণ সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করেছেন লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স এর অধ্যাপক ফাওয়াজ এ. গারগেজ। ‘জার্নি অব দ্যা জিহাদিস্ট: ইনসাইড মুসলিম মিলিট্যান্সি’র লেখক তিনি।
তিনি বলেন: যে মাত্রায় আইএস বর্বরতা চালাচ্ছে তা সভ্য সমাজের বেশিরভাগ মানুষের কাছে অর্থহীন মনে হতে পারে, কিন্তু আইএসের কাছে তাদের এই কাজের পেছনে যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে। শত্রুকে ভয় দেখানো এবং এর মাধ্যমে নতুনদেরকে প্রভাবিত করে দল ভারী করতে এটি তাদের একটি সচেতন সিদ্ধান্ত।
তার মতে, আইএস কোনো সীমা বা নিষেধ না মেনে সর্বাত্মক যুদ্ধে বিশ্বাসী। এমনকি অন্য সুন্নি প্রতিপক্ষের সঙ্গে বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও এরা কোনো সমঝোতায় বিশ্বাসী নয়।
‘পূর্বসূরি আল-কায়েদার মতো অপরাধকে যুক্তিগ্রাহ্য করার জন্যে আইএস ধর্মের বাণীও আওড়ায় না।’
আইএসের সহিংসতার শিকড় রয়েছে এর আগের দু’টি সংগঠনে। তবে সেগুলোর সন্ত্রাসের মাত্রা এত ব্যাপক ছিল না।
প্রথম ঢেউটির নেতৃত্বে ছিলেন সাঈদ কুতুব-এর শিষ্যরা। মিশরীয় এই কট্টরপন্থীকে আধুনিক জিহাদীতন্ত্রের মূল তাত্ত্বিক মনে করা হয়। বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামীর জন্যও তিনি এক তাত্ত্বিক।
এরা পশ্চিমাপন্থী ধর্মনিরপেক্ষ আরব সরকারগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল, যাদেরকে তারা বলতো ‘কাছের শত্রু’।
ওই গোষ্ঠিটির সন্ত্রাসী কার্যক্রমের শুরু ১৯৮০ সালে মিশরীয় প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত হত্যাকাণ্ড দিয়ে। একটা বড় অংশ পরে আফগানিস্তানে নতুন শত্রু খুঁজে পায়, যা ছিলো সোভিয়েত ইউনিয়ন।
ফাওয়াজ এ গারগেজের মতে, সোভিয়েতের বিরুদ্ধে আফগান জিহাদ দ্বিতীয় ঢেউয়ের জন্ম দেয়।
দ্বিতীয় এ গ্রুপের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু ছিলো ‘দূরের শত্রু’, যাদের মধ্যে ছিলো মূলতঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, আর কিছুটা হলেও ইউরোপের দেশগুলো। আর এর নেতৃত্বে ছিলেন ধনী এক সৌদি নাগরিক, ওসামা বিন লাদেন।
বিন লাদেন এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে হামলার ঘটনা ঘটিয়েছিলেন, যাকে তিনি বলেছেন ‘আত্মরক্ষামূলক জিহাদ’ বা মুসলিম সমাজে কথিত মার্কিন প্রভাবের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ।
পরে জন্ম নেওয়া আইএসের নেতা আবু বকর বাগদাদীর কাছে অবশ্য এসব যুক্তির কোনো মূল্য নেই। তিনি ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা ধর্মের দোহাই আর তত্ত্বের ব্যাপারে মাথা না ঘামিয়ে সহিংসতার ওপর জোর দেন। নিজেদেরকে গড়ে তোলেন কিলিং মেশিন হিসেবে, যাকে শক্তি যোগায় রক্ত আর অস্ত্র।
বিন লাদেনের মূলমন্ত্র ছিল এ রকম: ‘মানুষ একটি শক্তিশালী ঘোড়া ও একটি দুর্বল ঘোড়া দেখলে সবলটিকে পছন্দ করে’। আর আল-বাগদাদীর মূলমন্ত্র হলো ‘সন্ত্রাসের মাধ্যমে বিজয় অর্জন’।
আর এর মাধ্যমে তিনি বন্ধু ও শত্রুদের যে বার্তা দিচ্ছেন, তা হলো – আইএস নামের ঘোড়াটি জয় করতে এসেছে। সরে দাঁড়াও, না হলে পিষ্ট হবে। অথবা আমাদের বহরে যোগ দিয়ে ইতিহাস তৈরি করো।
সাক্ষ্য-প্রমাণ যা পাওয়া যাচ্ছে, তাতে দেখায় যায় আল-নুসরা ফ্রন্টের মতো গোষ্ঠি যারা এক সময় আইএসের বিরোধী ছিলো, তারাও আল-বাগদাদীর ডাকে সাড়া দিয়েছে।
ফাওয়াজ এ গারগেজ বলছেন: ইসলামের শত্রুর বিরুদ্ধে আইএসের যে কৌশল তাতে সাড়া দিয়েছে সারা বিশ্বের অনেক তরুণ, যারা এই গোষ্ঠিকে মুক্তির পথ বলে মনে করে।
‘ইরাক ও সিরিয়ায় আইএস বিশাল এলাকা দখল করে খেলাফত প্রতিষ্ঠা করেছে। সাফল্যের চেয়ে বড় আর কিছু নেই, ফলে অনেকেই তাদের সঙ্গে যোগ দিচ্ছে।’
খেলাফতের উত্থানের কথায় পশ্চিমা অনেক মুসলমান সেখানে গেছে। প্রথম দিকে লন্ডন, বার্লিন আর প্যারিসের অনেক তরুণ স্বধর্মীদের রক্ষায় জিহাদের ভূমিতে গেছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আইএস-এর হাতে পড়ে অংশ নিয়েছে নিরীহ মানুষের শিরশ্ছেদের মতো ঘটনায়।
আইএসের লাগামছাড়া কট্টরপন্থার শেকড় রয়েছে ইরাকে আল-কায়েদার ভেতরে, যার নেতৃত্বে ছিলেন আবু মুসাব আল-জারকাওয়ি।
আল-কায়েদা শিয়াবিরোধী না হলেও আইএস শিয়াবিরোধী হিসেবে বেড়ে উঠেছে। আল-যারকাওয়ি এবং আল-বাগদাদী দু’জনই শিয়াদেরকে বিধর্মী বলে মনে করেন। তাই শিয়াদের হত্যা না করতে আল-কায়েদা নেতা আইমান আল-জাওয়াহিরির একের পর এক ডাক উপেক্ষা করেছেন আল-বাগদাদী।
এর মাধ্যমে ইরাকে শিয়া-সুন্নি বিভেদ আর সিরিয়ায় জাতিগত দাঙ্গার সুযোগ নিয়ে আল-বাগদাদী সুন্নিদের মধ্যে একটি শক্তিশালী সমর্থক গোষ্ঠী গড়ে তুলেছেন।
এতোদিন আইএস মূলতঃ শিয়াদের নিয়ে ব্যস্ত ছিলো। ‘দূরের শত্রু’র দিকে নজর ছিলো কম। এখন যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ তাদের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়েছে, তাই গোষ্ঠিটি তাদের সব শক্তি প্রতিশোধের জন্যে ব্যবহার করতে পারে।
কয়েকমাস আগে আল-বাগদাদী বলেছিলেন, আমেরিকায় গিয়ে হামলা চালানোর মতো সক্ষমতা তার সংগঠনের নেই। তবে তিনি চান আমেরিকানরা মাঠে নামবে এবং তিনি তাদের খুন করবেন। মনে করা হচ্ছে প্যারিস হামলা সেই ‘যুদ্ধেরই’ অংশ।






