সে বছর লিপ ইয়ার ছিল। সে বছর তাই ২৯ ফেব্রুয়ারি ছিল। বছরটি ১৯৮৪। একজন চতুর সম্ভোগী হায়াবিহীন জেনারেলের শাসন। সেই শাসনকে রুখে দাঁড়াতে ছাত্র-শ্রমিকসহ সমাজের নানা অংশ সংগ্রামমুখর। ১ মার্চ ১৯৮৪ ঘোষিত হরতাল কর্মসূচি সকল বিরোধী পক্ষের।
২৮ ফেব্রুয়ারি তারিখে পুলিশের গাড়ি এসে পিষ্ট করলো সেলিম-দেলোয়ারের শরীর ও জীবন। মিছিলের শরীরে পুলিশী নৃশংসতা। এই ২০১৭ সনেও ক’দিন আগে বুড়ো জেনারেল লজ্জার সর্বপ্রকার মাথামুণ্ডু চিবিয়ে বললো, আমার নয় বছরের শাসনে আমার হাতে কোন রক্তের দাগ নেই। ১৯৮৩ সনের ১৪ ফেব্রুয়ারি? জয়নালসহ যারা জীবন দিলেন? নূর হোসেন? টিটো? এমনি আরো কত শত শত? পতিত একনায়কেরা বেঁচে থাকলে আরো অধঃপতিত হয় বুঝিবা।
বিশাল আদমজী চটকল। নারায়ণগঞ্জ সমীপবর্তী। ১৯৬৬ সনে ৬-দফা স্বাধিকার আন্দোলনে ৭ জুন হাজার হাজার শ্রমিক পথে নেমে এসে বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের রসায়ন বদলে দিয়েছিল। সে সংগ্রামের অন্যতম নায়ক ‘নোয়াখাইল্যা’ অচেনাপ্রায় সাদু। কালে সাদু বাড়-বাড়ন্ত তাগড়া হল। তাকে গপ করে গিলে ফেললো সামরিক জান্তা। এরশাদের প্রধান আদমজী পাণ্ডা সাদু কিছুতেই তার পরগণায় হরতাল-ধর্মঘট করতে দেবে না। ১৯৮৪ সনের ১ মার্চ আহুত হরতালেও না।
কিন্তু ততোদিনে আদমজী চটকল গভীরে যুক্ত হয়ে গেছে আরেক অমর অঙ্গীকারের রসায়ন। নাম তাজুল। জন্মনাম মো. তাজুল ইসলাম। যে তত্ত্বের কাছে তাজুলের অঙ্গীকার সমর্পিত, তাতে শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার পথরেখা তার হাতে। জন্ম ছিল যার আজন্ম সংগ্রাম। বাস্তব প্রকৃত হার্ডলস রেস।
দারিদ্র্য অতিক্রমের শিশু কিশোর তাজুল। এক ব্যতিক্রমী অসাধারণ স্নায়ুবীর। কোন বাধাই মানবে না। তীক্ষ্ণ মেধাবী। শ্রমী শৈশব। শ্রমী কৈশোর। পাশাপাশি পড়াশুনা। তখন জেএসসি ছিল না। পিএসসি ছিল না। বৃত্তি পরীক্ষা ছিল। পঞ্চম এবং অষ্টম শ্রেণীতে বৃত্তি পুরস্কৃত ছিল তাজুল। এসএসসিতে মানবিক বিভাগে প্রথম বিভাগ। এইচএসসিতেও তা-ই। ১৯৬৮ সনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাবীকুঞ্জ অর্থনীতি বিভাগে ঠাঁই হল যার।
১৯৬৬ সনে ঢাকা কলেজে এইচএসসিতে ভর্তি হবার পর তাজুলের সঙ্গে প্রথম দেখা। ছাত্র ইউনিয়নের ঘর ‘অগ্রদূত’। ১৯৮৪ সন পর্যন্ত তাজুলের সাথে সে পরিচয়সূত্র ছিল ধারাবাহিক। এসময়কালে দেখেছি বিপ্লবী অঙ্গীকারের দৌড়ে তাজুল ছড়িয়ে যাচ্ছেন সমসাময়িক সকলকেই কী চমৎকার শিল্পিত অভিযাত্রায়।
সেই শিল্পিত অভিযাত্রার পশ্চাতে যে সকরুণ বেদনা, যন্ত্রণা, দুঃখ, দারিদ্র্য জটিলতার বুলডজার পেষণেও তাজুল অটল। তাজুলের জীবনসঙ্গিনী নাসিমা অবস্থাপন্ন ঘরের মেয়ে হয়েও এই দারিদ্র্য-গ্লানিকে অশেষ ধৈর্য্যে বরণ করে স্বামীর বিপ্লবী জীবন-অঙ্গীকারকে শিথিল করতে দেননি।
আদমজী চটকলে ২৯ ফেব্রুয়ারি গর্জন করে উঠল তাজুল-সমুদ্রের ঢেউ। এবার ঐ স্বৈরদানবদের পরাভূত করবোই। আদমজী চটকলের চাকা বন্ধ করবই। অতএব শুরু হল মিছিল। এককালীন ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক তাজুল।

হরতাল সফলের জন্য অন্তিম প্রচার মিছিল সম্পন্ন করতে তুললেন সাহসের ঝড়। স্বৈরদানবের সাঙাতেরা ঝাঁপিয়ে পড়লো তাজুলের ওপর। তারপর ঢাকা মেডিকেলে পড়ে থাকা লাশ। শহীদের লাশ।
এবং তারপরই পৃথিবী প্রথম জানলো চমকে যাওয়া এক সংবাদ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ শিক্ষার্জনের একজন মানুষ মানবমুক্তির সংগ্রামে তাঁর বিবেচনায় অঙ্গীকারের সর্বোচ্চ শিখরে ওঠে নিজেই আদমজী চটকলে বদলী শ্রমিকের কাজ নিয়েছিলেন। যেন বহিরাগত শ্রমিক নেতা বলে তাকে কেউ ওই চটকল থেকে বিতাড়িত করার অজুহাত খুঁজে না পায়। সে অজুহাত না পেয়েইতো ওরা তাজুলকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেবার সুপরিকল্পিত ছক আঁকলো।
তাজুলের জন্মভিটা তখনকার কুমিল্লা জেলার মতলবগঞ্জে। কারখানা মালিকেরা অনেককাল আগে থেকেই ‘আঞ্চলিক বিভেদ’কে পুষে শ্রমিকদের একজোট না হবার স্থূল কৌশলে কারখানা চালাতো, অতএব ‘ঢাকাইয়া-বরিশাইল্যা-কুমিল্লা- নোয়াখাইল্যা’ কতো যে বিভাজন! তাজুল ক্রমশ: জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল জোয়ারের পানির মতো। এমন উচ্চশিক্ষিত একজন। বদলী শ্রমিক। বস্তির গিঞ্জি ঘরে বসবাস। শ্রমিক হয়ে শ্রমিকের দুঃখ স্পর্শ করা, হৃদয় সন্ধান এমন দৃশ্য দেখেনি আদমজী চটকল কোনোদিন। কোনভাবেই তাজুলকে বিচ্ছিন্ন করার সুযোগ-অজুহাত খুঁজে না পেয়ে পৃথিবীর সকল নিপীড়িতের মুক্তিসাধক তাজুলকে জন্মভিটির পরিচয় ‘কুমিল্লা’ বলে কোণঠাসা করতে চাইলো শোষক-দুর্নীতিবাজ মাফিয়া সাদু চক্র। তাজুল-জীবনসঙ্গিনী নাসিমাও বিশ্বাস করতেন, ঐ সাদুর ‘ নোয়াখাইল্যা’ বিভাজন ফাঁদে পা দিয়েছিল এমনকি তাজুলের নোয়াখালি-সস্তুত সহযোদ্ধাদের কেউ কেউ পর্যন্ত। জীবনের অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত নাসিমার এই ধারণা অটুট ছিল। তার দুঃখ ছিল, সংগঠন পর্যায়ে এটার যথাযথ তদন্ত পর্যন্ত হল না।
তাজুলের প্রয়াণকাল ধরা হয় ১ মার্চ, লিপইয়ার জটিলতা এড়াতে। ১৯৮৪ সালের সেই প্রয়াণ অচিরেই আন্দোলনের প্রান্তরে পরিণত হন মহাপ্রয়াণে। একজন নিবেদিত নকশালপন্থী সেসময় আমাকে বলেছিলেন, আমরা নকশালরাতো অস্ত্র হাতে প্রবল উত্তেজনায় রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করি। কিন্তু তাজুলের বিপ্লবী মহিমাতো গগণভেদী। এভাবে মাটি কামড়ে বিনা প্রচারে বছরের পর বছর পড়ে থেকে সমাজপরিবর্তন সাধনার কথাতো ভাবাই যায় না। তখন আন্দোলনের মাঠে ময়দানের কণ্ঠনিনাদ ছিল: ‘বিপ্লবের লাল ফুল, তাজুল তাজুল।’

এভাবে ‘ শ্রেণীচ্যুত’ হওয়া আদৌ সম্ভব কিংবা যৌক্তিক কিনা সে প্রশ্ন তুলেছেন পৃথিবী জুড়ে অনেকেই। গবেষণা-পর্যালোচনা হচ্ছে। কিন্তু সব প্রশ্নের কুয়াশা ভেদ করে তাজুল যে উদাহরণটি সৃষ্টি করলেন, তা হচ্ছে ‘ইচ্ছাশক্তি’। এমন উদাহরণ কম হয়। ক্ষুদিরাম হাসিমুখে কৈশোরের শংকা বিতাড়িত করে ফাঁসির রজ্জুতে আত্মোৎসর্গ করেছেন। সেই ক্ষুদিরাম ভারতবর্ষের স্বাধীনতার একজন অনন্য চরিত্র। তাজুল শ্রমিকশ্রেণীর অন্যরকম ক্ষুদিরাম।
২০১৭ সাল। আমরা নবপ্রজন্মের বাঙালি সন্তানদের কাছে তাজুলের উজ্জ্বল উপস্থিতি দেখছি না। কোন চারণ বাউলের তাজুল হারাবার গান বাংলার উদার প্রকৃতিতে অনুরণিত হচ্ছে না। তাজুলের প্রয়াণকালে দেশের অগ্রণী কবি-সাহিত্যিকেরা রচনা করেছিলেন বেদনামর্ম। তারপর?
হয়তোবা পৃথিবীতে শ্রমিকশ্রেণীর শিরোনামে গড়ে ওঠা প্রধান দূর্গাটির কাঠামো ভেঙে যাবার ফলে, সেখানে ক্রমশ: পুঁজিতন্ত্রের অধিষ্ঠানে পৃথিবী জুড়েই পুরোনো পথরেখা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়াতে তাজুলের আত্মদানও উজ্জল বিভা ছড়াতে সক্ষম হচ্ছে না! এসব পর্যালোচনাও ভবিষ্যতেরই হাতে। এ সময়কালে দু’টি সন্তানসহ তাজুল-জীবসঙ্গিনী বেঁচে থাকার লড়াইয়ে যে অসমসাহসের উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন, তা-ও অভাবনীয়। গত বছর সেই নাসিমা প্রতিষ্ঠিত দু’সন্তানকে রেখে পৃথিবী ছেড়েছেন কঠিন রুগ্নতার কষ্টে।
তাজুল পৃথিবীতে নেই। আর তার সেই সুপ্রিয় বেছে নেয়া বিপ্লবপ্রান্তর আদমজী চটকলটিও চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। কেউ কেউ বলেন, তাজুল বেঁচে থাকলে ওই চটকল এতো সহজে বন্ধ করা যেতো না। পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। আমাদের সে সময়কার সরকার ‘জ্বী হুজুর’ বলে তা মেনে নিয়েছে। আমাদের সে সময়কার শ্রমিকনেতৃত্ব কার্যত: প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়নি। কেউ কেউ বলে থাকেন, প্রতিরোধ গড়ে তোলার সম্ভাবনাসমূহের পথ টোপ-প্রলোভনে আটকে দেয়া হয়েছিল। আদমজী অঞ্চলে জন্ম নেয়া প্রজন্ম সেই এলাকা ছেড়ে দেবার সময় যে আহাজারি-কান্না আকাশে বাতাসে ছড়িয়েছিল, গণমাধ্যমে তার ছিঁটেফোঁটা দেখেছি।
আমরা অনেকেই মাঝেমধ্যে তাজুলের অন্তিমশয়ানের সেই মতলবগঞ্জে যাই। রাজধানীতে পুষ্পার্ঘ নিবেদন করি। এখনতো তাজুলের পাশেই অন্তিমশয়ানে নাসিমা। স্বামীর স্মরণে অনেককিছু করতে চাইতেন বিপ্লবী জুটির অন্যজন।
‘এক তাজুলের রক্ত থেকে/লক্ষ তাজুল জন্ম নেবে।’ এ রণধ্বনি আমরা কিছুকাল দেশজুড়ে শুনেছি। তাজুলের সংগঠন আদমজীতে আরেকজন তাজুল-বিকল্প স্থাপনের সচেতন চেষ্টা করেও সক্ষম হতে পারেনি। অন্ততঃ দৃশ্যতঃ আমরা দেখিনি। এখানেই আজকের লেখাটির মর্মনিবেদন: চাইলেই কেউ জীবনানন্দ দাশ হতে পারেন না। যিনি বলেছিলেন সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি। চাইলেই কেউ ক্ষুদিরাম হতে পারেন না। চাইলেই কেউ তাজুল নন। এখানে সেখানে অনেক তাজুল সুপ্ত হয়ে আছেন, এমন কথা প্রত্যয় হয় না। মানবমুক্তিসংগ্রামে সকলেই তাজুল হবেন, এমনতো কোন কথা নয়। অনেকে মিলেই হবো একজন তাজুল।
আর অমন বিরণজন্মের তাজুলকে জানাবো বিপ্লবী অভিবাদন, তাঁর জীবন থেকে উজ্জীবন-উদ্দীপন নেবো যার যার মতো করে। অমর তাজুলগাথা থেকে মানবমুক্তির পথ খুঁজবো। সাম্যমুখী সে পথরেখা সঠিকভাবে খুঁজে পেতে যতো সময় লাগে লাগুক। তাজুলের ইচ্ছাশক্তি আর অঙ্গীকারকে আমরা যেন সম্মানিত করি বহমান কর্মধারায়।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








