জাগৃতির প্রকাশক নিহত ফয়সাল আরেফিন দীপনের বাবার হতাশা-ক্ষোভের সুরে সুর মেলালেন নিহত ব্লগার ও বিজ্ঞান লেখক অভিজিত রায়ের স্ত্রী বন্যা আহমেদ। দীপনের বাবার মতো বন্যাও অভিজিত হত্যার বিচার চান না।
নিহত ফয়সালের বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও বিশিষ্ট লেখক আবুল কাসেম ফজলুল হক ছেলে হত্যার প্রতিক্রিয়ায় ক্ষুব্ধ-হতাশ হয়ে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আমি কোনো বিচার চাই না। আমি চাই শুভবুদ্ধির উদয় হোক। যাঁরা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ নিয়ে রাজনীতি করছেন, যাঁরা রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে রাজনীতি করছেন, উভয় পক্ষ দেশের সর্বনাশ করছেন। উভয় পক্ষের শুভ বুদ্ধির উদয় হোক।’ দীপনের বাবার কথা সর্মথন করে একই কথা বললেন নিহত ব্লগার ও বিজ্ঞান লেখক অভিজিত রায়ের স্ত্রী বন্যা আহমেদ।
যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বন্যা সামাজিক গণমাধ্যমে ক্ষোভ-হতাশা প্রকাশ করে লিখেছেন, দীপনের বাবার মত আমিও বিচার চাইনা। আমি নিশ্চিত জানি টুটূলের স্ত্রী, দীপনের স্ত্রী, অনন্তের বোন, রাজিব, বাবু, নীলয়ের বন্ধুরাও আর বিচার চান না।
একের পর এক ব্লগার-লেখক হত্যার বিষয়ে দেশের রাজনীতির সমালোচনা করে বন্যা লিখেছেন, ‘এই সরকারের কাছ থেকেও কিছু চাওয়ার নেই আমাদের, একটাই অনুরোধ ওনাদের কাছে, দয়া করে দিনরাত আর ‘আমরা সেক্যুলার পার্টি’ বলে গলা ফাটিয়ে নিজেদের এনার্জি নষ্ট করবেন না। আপনারা আপনাদের লক্ষ্য পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত চুপ করেই থাকুন; অভিজিত, অনন্ত, রাজিব, নিলয়, বাবু, দীপনরা আপনাদের জন্য একেকটা স্কোর কার্ড। মৌলবাদীদের চাপাতিতে নিশ্চুপভাবে তেল দিয়ে যান, না হলে আপনাদের ভোট কমে যেতে পারে। আপনারা খুব ভালো করে জানেন যে আপনাদের মৌনতাই ওদের অস্ত্রে শান দিতে সহায়তা করে যাচ্ছে। হয়তো আমরা দিনের বেলায় ভুল করে একে নিশ্চুপতা ভাবি। কে জানে, রাতের অন্ধকারে আপনারা হয়তো মুখর হয়ে ওঠেন, ভোট ভাগাভাগি করে নেওয়ার খেলায় যোগ দেন তাদের সাথে। আপনাদের দোহাই লাগে আপনারা ভোটের থলি পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত চুপ করেই থাকুন, আমরা আপনাদের কাছে আর কোনদিন বিচার চাইতে আসবো না। ‘
মুক্তচিন্তা আর আধুনিক শিক্ষার তীর্থ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার পরিবেশ-নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিষয়ে বন্যা লিখেছেন, ‘আমি আশির দশকের শেষে ঢাকা মেডিকেলে পড়েছিলাম দুই বছর। মনে আছে আমরা বলতাম, জামাত শিবির কোনোদিনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গনে ঢোকার সাহস পাবে না। তখন তো আনাসারুল্লাহর মত জঙ্গিদলদের কথা চিন্তাও করতে পারতাম না। আজ শুধু তারা সেখানে ঢোকেইনি, চোখের সামনে একের পর এক হত্যার উন্মত্ত হোলি খেলাও চালিয়ে যাচ্ছে। আর আমরা সবাই ওদের প্রলয় নৃত্য দেখে অসহায়, স্তম্ভিত। দীপনের বাবা, অভিজিতের বাবারা যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন সেখানেই, চোখের সামনেই, জঙ্গীরা চাপাতি চালায় তাদের ছেলেমেয়েদের উপর, বড্ড সাহস আজ তাদের। আজকাল আর রাতের আঁধারে চুপিসারেও আঘাত হানতে হয়না ওদের। আলোকিত রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ, পুলিশের সামনেই তারা বুক ফুলিয়ে চাপাতি চালায়। আমি নিজেইতো, মাথায় চারটা চাপাতির আঘাত আর ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হতে থাকা আঙ্গুল হারানো হাত নিয়ে, রাস্তায় দাঁড়িয়ে সাহায্য ভিক্ষা করেছিলাম শত শত মানুষের কাছে! লোকে লোকারণ্য সেই রাস্তায় কেউ কি এগিয়ে এসেছিল? জীবন এগিয়ে আসার আগে মানুষেরা গোল হয়ে ঘিরে মজা দেখেছে, পুলিশও ছিল সেই ভীড়ে।’
ক্রমাগত ঘটে যাওয়া নৃশংস ঘটনায় জনমত ও প্রতিরোধ গড়ে উঠছে না উল্লেখ করে হতাশা জানিয়ে বন্যা আরো লিখেছেন, আমাদের শোক আর ক্রোধে পরিণত হয়না, আমরা আর ৫২ তৈরি করতে পারিনা, আমরা আর ৬৯, ৭১ তৈরি করতে পারিনা। নির্যাতনের এই রাষ্ট্রযন্ত্র আজ এতটাই সার্থকভাবে আমাদের স্তব্ধ করে দিতে পেরেছে যে, আমরা ভয়ে নিথর হয়ে যাই। অনেকের কাছে শুনেছি, আজকাল যারা এগিয়ে আসে সাহায্যের জন্য, তাদেরকেই নাকি পুলিশ উলটো হেনস্থা করে, সেই ভয়ে কেউ আর এগিয়েও আসেনা। তাই নীলয়কে ঘরে ঢুকে হত্যা করা যায়, অনন্তকে রাস্তার দিনের আলোয় শিকার করা যায়, টুটুল, রণদা, তারেককে অফিসে ঢুকে বহু মানুষের মধ্যেও কোপানো যায়, দীপনকে আজিজ সুপার মার্কেটের মত ভীড়ের জায়গায়ও খুন করা যায়। খুনীরা জানে ওদের আর কোন ভয় নেই, ওরা জানে ওদের অভয়ারণ্য সর্ব-বিস্তৃত, ওরা জানে ওদেরকে নিশ্চুপতার জয়মাল্য দিয়ে বরণ করা হবে। অথবা আরো এক ডিগ্রী বাড়িয়ে বরং আমাদেরকেই ৫৭ ধারায় ঝুলিয়ে দেওয়া হবে।
শনিবার রাজধানীর লালমাটিয়ায় ও পরে শাহবাগে একই স্টাইলে জোড়া হামলার ঘটনা ঘটে। প্রকাশনা সংস্থা ‘জাগৃতি’র প্রকাশক ফয়সাল আরেফীন দীপন হত্যা এবং প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান শুদ্ধস্বরের প্রকাশক টুটুল ও তার দুই বন্ধুকে হত্যাচেষ্টার ঘটনার দায় স্বীকার করেছে আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশের শাখা আনসার আল ইসলাম।







