সাভার (ঢাকা): শনিবার মধ্যরাত থেকে সাভারের আশুলিয়ার শেষ প্রান্ত নয়ারহাটে একতলা টিনেশেড বাড়িটি ঘিরে রাখে এলিট ফোর্স র্যাব। সকালে বাড়িটিকে কেন্দ্র করে আকাশে উড়তে থাকে হেলিকপ্টার। অভিযান চলার সময় বাড়িটির এক কিলোমিটারের মধ্যে পুলিশ কর্মকর্তা বা অন্য গোয়েন্দা সংস্থার কাউকেও যেতে দেয়নি তারা।
শেষ পর্যন্ত অবশ্য চূড়ান্ত অভিযানের আগেই আত্মসমর্পণ করে চার ‘জঙ্গি’। র্যাব বলেছে, তারা সারোয়ার-তামিম গ্রুপের সদস্য। ওই চারজন ছাড়াও জঙ্গিবাদে সমর্থনের সন্দেহে বাড়ির মালিক ও পাশের এক দোকান মালিককে আটক করেছে র্যাব।
পরে বাড়িটির ভেতর কিছু তাজা বোমা নিষ্ক্রিয় করে বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট।
গুলি বিনিময়ের পর আত্মসমর্পণ
তার আগে রোববার ভোরের দিকে র্যাবের সঙ্গে ‘জঙ্গি’দের গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটে।
কিন্তু, সকাল দশটার পর থেকেই ‘জঙ্গি’দের আত্মসমর্পণের জন্য মাইকিং শুরু করে র্যাব। এরপর মাইকেই জানিয়ে দেয়া হয়, আত্মসমর্পণের শেষ সময় দুপুর ১২টা। ওই সময়ের মধ্যে ‘জঙ্গি’রা আত্মসমর্পণ না করলে র্যাব বাড়িটিতে আক্রমণ চালাবে।
সময়সীমা শেষ হওয়ার কিছু আগে ‘কৌশলী চাল’হিসেবে ফাঁকা গুলি ছোঁড়ে র্যাব। এরপরই একজন হাত তুলে আত্মসমর্পণ ভঙ্গিতে বের হয়ে আসে। র্যাব তাকে তল্লাশী করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলে জানা যায়, বাড়িতে তারা চারজন ছিল।
চূড়ান্ত অভিযানের প্রস্তুতির মধ্যেই মিনিট বিশেক পরপর অন্য তিন ‘জঙ্গি’ও আত্মসমর্পণ করে।
র্যাবের অভিযান প্রস্তুতি
‘জঙ্গি আস্তানায়’ অভিযানের জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিল র্যাব। নয়ারহাটের মধ্য রাস্তা থেকেই মিডিয়া ছাড়া অন্য যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। চৌরাবাড়ি এলাকার পুরোটাই নিয়ন্ত্রণে নেয় এলিট ফোর্স। বেলা বাড়তে থাকলে র্যাবের স্পেশাল ফোর্স ও বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলের সদস্যরা ঘটনাস্থলে এসে চূড়ান্ত অভিযানের প্রস্তুতি নেয়া শুরু করেন।

সকাল ৯টার পর র্যাবের একটি এপিসি (আর্মার্ড পার্সোনেল ক্যারিয়ার) ওই বাড়ির কাছাকাছি যায় এবং আকাশে একটি হেলিকপ্টার টহল দিতে থাকে।
শেষ পর্যন্ত অবশ্য চূড়ান্ত অভিযানের প্রয়োজন হয়নি।
এলাকাবাসীর জন্য আতঙ্কের একদিন
চৌরাবাড়ি এলাকার সাধারণ মানুষের মূল পেশা কৃষি ও ব্যবসা। শনিবার রাত থেকেই তাদের মধ্যে ছিল আতঙ্ক এবং উত্তেজনা ।
স্থানীয়রা জানান, রাত ১টা থেকেই তারা গোলাগুলির আওয়াজ পান। ভোরের দিকে ও সকাল ১০টার দিকে ধোঁয়াও দেখেন তারা।
তবে জঙ্গিবাদ নিয়ে ওই অঞ্চলের শিক্ষিত-অশিক্ষিত সকলেই বেশ সতর্ক।
আবুল কাশেম নামে একজন এমনকি এটাও বলেন, ‘জঙ্গিদের ধইরা নিয়া গিয়া কী হবে, ওদের এখানেই ম্যাইরা ফ্যালান দরকার।’
যেমন ছিল ‘জঙ্গি আস্তানা’
চৌরাবাড়ি এলাকা জুড়েই সখিপুর বিল। গ্রীষ্মকালে বিলে পানি না থাকলেও বর্ষা মৌসুমের পানি বিলটির সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে। শরৎের আকাশে দীপ্ততা আর বিলের পানি অন্যরকম এক পরিপূর্ণতা এনে দিয়েছে এলাকাটিতে। ঠিক বিলের মাঝখানে খানিকটা ডানের বাড়িটিতেই ‘জঙ্গিরা আস্তানা বানিয়ে বসে’।

বাড়িটির দক্ষিণদিকে একটি মাত্র রাস্তা ছাড়া বাকি তিনদিকেই সখিপুর বিল। একতলা টিনশেড বাড়িটার সামনের দিকটি দোকান হিসেবে দেওয়ার কথা ছিল। এর পেছনের রুমেই ‘জঙ্গি’রা থাকত।
স্থানীয় ইসমাইল আলী বলেন, ওই বাড়িতে পাটশিল্পের কাজ হতো, কিন্তু তারা কখনও বাড়িটিতে মানুষজনের আনাগোনা দেখেননি। রাতের বেলায় দুই-একজন বাড়ি থেকে বের হতো। কিছুক্ষণ থেকে আবার চলে যেতো।
আজাদ নামে বাড়িটি ভাড়া নেয়া হয়
র্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে বাড়ির মালিক ইব্রাহীম জানান, আজাদ নামে একজন গার্মেন্টসকর্মী পরিচয়ে প্রায় দুই মাস আগে বাড়িটি মাসে আড়াই হাজার টাকায় ভাড়া নেয়।
ভাড়া নেওয়ার সময় প্রয়োজনীয় কোনও ডকুমেন্ট সে জমা দেয়নি।
পরে জমা দেওয়ার কথা বলে বাসায় ওঠে। সেটা অার কখনও সে দেয়নি।
র্যাবের কাছে আগে থেকেই তথ্য ছিল
র্যাব-৪ অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি লুৎফুল কবীর জানান, গোপন সংবাদে বেশ কিছুদিন ধরেই অনুসন্ধান চালিয়ে আসছিল তারা। নিশ্চিত হয়ে শনিবার রাতে বাড়িটি ঘিরে ফেলা হয়।
তিনি জানান, অভিযান শুরুর পরপরই ভেতরে থাকা ‘জঙ্গিরা’ র্যাব সদস্যদের লক্ষ্য করে কমপক্ষে পাঁচ রাউন্ড গুলি ছোঁড়ে।
তামিম দারির তথ্যে ‘জঙ্গি আস্তানা’র সন্ধান
‘জঙ্গি আস্তানা’য় অভিযান শেষে র্যাব জানায়, গ্রেফতার চার ‘জঙ্গি’ই নব্য জেএমবি’র সারওয়ার-তামিম গ্রুপের সদস্য। এদের বিষয়ে তারা প্রথম তথ্য জানতে পারে গ্রেফতার তামিম দারির কাছ থেকে।
র্যাব জানায়, হলি অর্টিজান হামলার মূল পরিকল্পনাকারী তামিম চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ তামিম দারিকে গত এপ্রিলে গ্রেফতার করা হয়। তামিম চৌধুরীকে বসবাসের জায়গা দিয়েছিল তামিম দার। তার কাছ থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানতে পারে, ঢাকার আশে-পাশে অবস্থান জঙ্গিরা নাশকতার পরিকল্পনা করছে। এ চারজন তাদের অংশ।

ঘটনাস্থলের পাশে ব্রিফিংয়ে র্যাবের মিডিয়া উইং প্রধান কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান আস্তানা থেকে গ্রেফতার মোজাম্মেল ওই বাড়িতে অবস্থান করা জঙ্গিদের দলনেতা। গ্রেফতার অন্য তিনজনের নাম ইরফানুল, রাশেদুল ও আলমগীর।







