চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

৩ আগস্ট ২০১৫ এবং একজন ‘পাগলা মজিবরের’ কথা

৩ আগস্ট ২০১৫ তারিখে বুড়িগঙ্গা নদীর ধারে মিটফোর্ড হাসপাতালে কয়েক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে থেকে বৃষ্টি গুঁড়ো এবং ভ্যাপসা গরমে জবুথবু দাঁড়িয়ে থাকতে হলো। পঁয়ষট্টি প্রবীণের জন্য এ ভারি বেকায়দা। কিন্তু ঠ্যা. না. বা. মানে ঠ্যালার নাম বাবাজী। কন্যাপ্রতিম বধূমাতার চিকিৎসাশাস্ত্রে স্নাতকোত্তর পরীক্ষার কিয়দংশ। লাইভ রোগী নিয়ে পরীক্ষার প্রশ্ন এবং উত্তর। সকাল ৮টা থেকে ১২টা এবং সকল যানজট হিমালয় অতিক্রম করে এর পরপরই মহাখালিতে বিসিপিএস প্রতিষ্ঠানে মৌখিক পরীক্ষা। এই যানজট হিমালয় অতিক্রান্তির পরীক্ষার জন্যই আমার সহায়ক ভূমিকা।

ভেবেছিলাম ওখানকার কাফেটেরিয়া বা লাইব্রেরিতে বসে থেকে ঘণ্টা কয়েক কাজে লাগাবো, একটি বই সাথে নিয়েছিলাম সে ভাবনায়। মিটফোর্ড হাসপাতাল-এর কলেজখানির নাম স্যার সলিমুল্লা মেডিকেল কলেজ। সেখানে ছাত্র শিক্ষকদের জন্য একটি লাইব্রেরি আছে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘মহাসমুদ্রের শতবর্ষের কল্লোল’ ঐ লাইব্রেরিতে স্তব্ধ হয়ে আছে। তা লাইব্রেরির কাউন্টারে কর্তব্যরত একজন মাঝবয়েসী মহিলাকে বললাম, আমি বইয়ের লোক, আমাকে একটু অপেক্ষা করতে হবে, লাইব্রেরিতে বসে কি একটু লেখা-জোখা-পড়া করতে পারি ঘণ্টা দু’য়েক। উনি বললেন নিষেধ আছে। দেখিয়ে দিলেন আরেকজন বসকে। উনি দেখালেন আরেক বসকে। স্তব্ধ হয়ে গেলাম এবার আমি। মহা কথা শিল্পী কিষাণ চন্দরের সেই ঝড়ে ভাঙ্গা গাছ-বিষয়ক গল্পটির কথা স্মরণে আনলাম। ঐ গাছটি সরিয়ে পথ খুলে দেবে সরকারি কোন দপ্তর, তা নিয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার চমৎকার রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। বোধ করি বিশ্বসাহিত্যে এহেন আমলা-ক্ষমতার জট পাকানো গ্যাঞ্জামের এমন রূপ আর কেউ ফুটিয়ে তুলতে পারেননি।

বিজ্ঞাপন

এদেশে মরহুম এবং প্রয়াত শব্দ দু’টির অর্থ একই। কিন্তু দু’টি শব্দের মধ্যে সমাজে বিরাজমান বিশ্বাসস্বাতন্ত্র্যের ধর্মীয় পরিচয় এ দু’টি শব্দে লেপ্টালেপ্টি করে গেছে। মুসলমান বুঝি ‘মরহুম’ হয় মরে গেলে। আর অমুসলিম হয় ‘প্রয়াত’। ফলাফল একই অবশ্য। আলোচ্য কিষণ চন্দর অতএব ‘প্রয়াত’। তবে ৩ আগস্টের সকালে, এই ২০১৫ সালে, তিনি বড় জীবিত এবং প্রাসঙ্গিক ছিলেন গরীবী জীবনে। লাইব্রেরির পাশে বারান্দাটি বড়। ঠেস দিয়ে দাঁড়ালাম। একটি কম্পিউটার কোম্পানির বিজ্ঞাপিত বদান্যতায় এলাকাটিতে ‘ওয়াই-ফাই’ সুবিধা অবারিত। দু’জন শ্মশ্রুমন্ডিত ছাত্রকে শুধালাম, এই ওয়াই-ফাইয়ের ‘পাসওয়ার্ড কি? বিনয়ী ছাত্রদ্বয় সে পাসওয়ার্ডের সন্ধাান দিয়ে জানালেন, এই ওয়াই-ফাইতো আসলে তেমন কার্যকর নয়। অতএব সময় কাটাবার বিকল্প পন্থাটি ভেস্তে গেলো বুড়িগঙ্গা কিনারে। এবার মনে হলো যাই, দেখে আসি গঙ্গাজননীর বার্ধক্যদশাটি।

পুরোনা ঢাকায় এস এস সি অতিক্রান্ত হলেও কতোকাল এ দিকটায় আসা হয়না। স্মৃতি রিনরিন করে। প্রেসিডেন্ট এবং জেনারেল জিয়া যখন নিহত হলেন, তখন মিটফোর্ড হাসপাতালের প্রসূতি ওয়ার্ডে আমার বড় ভাগ্নে পৃথিবীতে আসার জন্য ভয়ংকর চোটপাট শুরু করে দিয়েছিলেন। তিনি এলেন এবং তার জননীসহ বুড়িগঙ্গা কিনারের পুরোনো ধরনের অভিজাত কেবিন ব্লকে ঠাঁই করে নিলেন। কেবিনে নদীর বৃষ্টিভেজা সুবাতাস। মিটফোর্ড হাসপাতাল তাই আমার স্মৃতিতে এক টুকরো পবিত্র ভালোলাগা। স্যার রবার্ট মিটফোর্ড-এর নামে হাসপাতালটি এখনো নামকরণের সম্মানে অলংকৃত। কে এই মিটফোর্ড? জিজ্ঞেস করলে হাসপাতালের এক নম্বর থেকে সর্বশেষ নম্বর পর্যন্ত কেউ বলতে পারবেন কিনা নিশ্চিত নই। গোটা দশেক সেখানকার পাশ করা এমবিবিএস চিকিৎসক গত কয়েক দশকে আমার নিক্ষেপিত প্রশ্ন-মিসাইলে লজ্জিত হয়েছে বোধ করি। এ কালে হাসপাতালটির উৎস সংবাদসহ ওয়েবসাইট আছে। এর বাংলা ওয়েবসাইটটি এযাবত দেখেছেন মোট ১৭৬ জন। তা-ও পুরো পড়েছেন ক’জন জানিনা।

প্রিয় পাঠক, ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত প্রথম আধুনিক হাসপাতালটির নাম মিটফোর্ড হাসপাতাল। যদিও ৩ আগস্ট পরশু ঘুরে ঘুরে দেখলাম ওখানকার অগ্রণী ব্যাংকে লেখা আছে ‘মিটফোর্ট’ হাসপাতাল শাখা। স্যার রবার্ট মিটফোর্ড ছিলেন ঢাকার কালেক্টর এবং প্রাদেশিক আপীল বিভাগের জজ। স্যার মিটফোর্ডের সময়ে মহামারী আকারে ভয়াবহ কলেরা দেখা দেয়, ঢাকায় দৈনিক ১৫০ থেকে ২০০ লোক তখন কলেরায় মারা যেতো, চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল সীমিত ও অপর্যাপ্ত। মিটফোর্ড সাহেব এমনি পরিস্থিতিতে ছিলেন ভীষন মর্মপীড়িত। ১৮৩৬ সনে ইংল্যান্ডে মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর প্রায় সমুদয় সম্পত্তি (প্রায় আট লক্ষ টাকা) ঢাকায় একটি হাসপাতাল ভবন নির্মাণের জন্য বাংলা সরকারকে উইল করে যান। উত্তরাধিকারীদের বাধার মুখেও সে অর্থের কিয়দংশ দিয়ে সৃষ্ট হয় মানবিকতার এক ব্যতিক্রমী দলিল মিটফোর্ড হাসপাতাল। তখন ১৮৫৪ সাল। হাসপাতালটির এলাকার নামটি ছিল কাটরা পাকুরতলি, বাবুবাজার। পরবর্তী সময়ে ঢাকার নবাব আহসানুল্লা, ভাওয়ালের রাজা রাজেন্দ্ররায়, ভাগ্যকুলের রাজা শ্রীনাথ রায় প্রমুখ হাসপাতাল বিকাশ-বিস্তারে তাদের নবাবী কিংবা জমিদারী কোষাগার থেকে সহায়তা করেন। মিটফোর্ড হাসপাতাল ভবনের সূচনাটি হয়েছিল অবশ্যএকটি ওলন্দাজ কুঠিতে।

এতোসব কথায় পাঠক বিরক্ত বোধ করবেন না। ১৯১৭ সালে মিটফোর্ড হাসপাতালটি প্রথম শ্রেণী হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করে। এই হাসপাতালের বহির্বিভাগ থেকে এখন দৈনিক এক হাজারেরও বেশি রোগী সেবা পেয়ে থাকে। এখানে শয্যাও আছে এক হাজারের মতো। বুড়িগঙ্গার এপার ওপারের লাখ লোক বংশপরম্পরায় মিটফোর্ডের নামাংকিত হাসপাতাল থেকে উপকৃত হয়ে থাকে। পৃথিবীতে এতো অবদানমুখী হাসপাতাল আর কয়টি?

এই হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নির্মিত হয়েছিল ঢাকা মেডিকেল স্কুল। এমবিবিএস থেকে নিম্নতর এলএমএফ কোর্স চালু ছিল সেখানে যা বাংলাদেশ অঞ্চলে চিকিৎসা সেবা বিস্তারে রেখেছে এক কার্যকর ভূমিকা। তারপর বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে মিটফোর্ড হাসপাতালকে কেন্দ্র করে একটি আধুনিক মেডিকেল কলেজ নির্মিত হয়, যাদের ছাত্রদের ব্যবহারিক শিক্ষাকেন্দ্র হয় পাশের মিটফোর্ড হাসপাতাল। ঢাকার নবাব, ইংরেজদের প্রিয় লেজুড় স্যার সলিমুল্লার নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস, এতিমখানা প্রভৃতি অনেক প্রতিষ্ঠান আছে। স্যার রবার্ট মিটফোর্ড-এর কোনো নবাবী কিংবা জমিদারী ছিলোনা। তিনি ছিলেন বেতনভোগী কর্মচারী। জীবনের শেষ সঞ্চয়টুকু তিনি উৎসর্গ করেছিলেন ঢাকার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য। তাঁর হাসপাতালের কলেজটি তাঁর নামে হলে কি চিকিৎসা শিক্ষা ব্যবস্থার দফারফা হয়ে যেতো? এমন উদার, মহৎপ্রাণ, আত্মত্যাগী মানুষটির প্রতীক প্রতিষ্ঠানটিতে এমন নবাবী অনুদানের অংশীদারকে না বসালে কী ক্ষতি হতো? পুরোনা ঢাকা ধনে, জনে, মানে, প্রয়োজনে এখনও একটি অত্যাধুনিক কার্যকর বিশাল হাসপাতাল প্রত্যাশা করে। হোকনা সেটা ঐসব নবাব কিংবা নবাবজাদাদের সম্পত্তিতে। ঐ নবাব পরিবারের অধিকাংশ আমাদের ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত যে ভূমিকা রেখেছে, তা নিশ্চয়ই আনন্দদায়ক কোনো খবর নয়।

ভ্যাপসা গরমে নেয়ে নেয়ে ঘুরে দেখলাম। ঐ মিটফোর্ড হাসপাতালে স্যার রবার্ট মিটফোর্ডের নাম, পরিচয়, ভূমিকার তেমন কোন উজ্জল উল্লেখ নেই। এই ‘মিটফোর্ড’ শব্দটির উৎস সূত্র কেউ জানেনা। অথচ হাসপাতালটিকে কেন্দ্র করে চর্ব্য-চূষ্য-লেহ্য-পেয় বানিয়ে মাল কামাচ্ছে উপর থেকে নীচ পর্যন্ত কতোজনা। ‘কৃতজ্ঞতা’ শব্দটি ওখানে মুমূর্ষু। এমনি বাস্তবতায়ও বাংলাদেশের দু’টি পরিবারের দু’জন ট্র্যাজিক ব্যক্তিত্ব শেখ হাসিনা এবং মোহাম্মদ নাসিমকে বলছি, স্যার সলিমুল্লাহর নামে করতে হলে অন্যত্র করুন, দয়া করে ‘রবার্ট মিটফোর্ড কলেজ ও হাসপাতাল’ নামে দু’টি প্রতিষ্ঠানকে একীভূত করে বীর বাংলাদেশকে কৃতজ্ঞতা ও স্বীকৃতির নব পরিচয়ে সম্মানিত করুন। তদুপরি একটি হাসপাতাল মিউজিয়াম কক্ষ গড়ে মিটফোর্ডসহ অন্য সকলের অবদানকে সমুজ্জল করে তুলুন। জানিনা অদূরে বুড়িগঙ্গার কিংবদন্তীসম পচা পানিতে এই আবেদন না হারিয়ে পচে গলে যায়।

বিজ্ঞাপন

মিটফোর্ড হাসপাতালের ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারীদের কাফেটরিয়াটিকে একটি বয়লার হাউজ মনে হয়েছে। দু’দন্ড বসে একটু পড়বো তার উপায় ছিলোনা। এই হাসপাতাল আর সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের বিভাজনী দেয়ালের পাশে একটি নর্দমা আছে। ঐ নর্দমা দিয়ে নগরীর বর্জ্যসুধা বেচারী গঙ্গাবুড়িকে হাবুডুবু করে দেয়। এই কলেজ, এই হাসপাতাল এখন পুরোনো ঢাকার ক্ষমতা কারবারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। কারাগার এবং মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একজন ক্ষমতা খেলোয়াড় এখন হঠাৎ অনুপস্থিত। মরহুম পিন্টুর একদা নিবিড় সাথী তার জিয়াপ্রেম উত্তরিত করেছেন বঙ্গবন্ধুপ্রেমে। এককালে সিমেন্টের গভীরে মাটির অনুপ্রবেশে টাকশাল উজ্জল করার এক বিশাল ঐতিহ্যে ও দক্ষতায় স্বীয় সম্পদভান্ডার পরিপূর্ণ করার মহাসাফল্য রয়েছে তার। মাফিয়া হবার আজন্ম দক্ষতাবিহীন একজন আওয়ামী ডাক্তার এ নব্যমুজিবপ্রেমীর সঙ্গে টক্কর খেয়ে এখন কুপোকাৎ। নব্যহিরো হাজী সাহেব ভেবেছিলেন পুরোনো ঢাকার বিশাল মাঠ তার অপ্রতিদ্বন্দ্বী ভাগ্যের বিরাট প্রান্তর হয়ে যাবে। দক্ষিণের তিনি হবেন রাজাধিরাজ মেয়র। হায়রে হায় কোথা থেকে নেমে এলো এক হঠাৎ ধূমকেতু। প্রাক্তন মেয়র পুত্র ও নানা ঘাটে বিশ্বাস বন্টন করা লোক হলেও সেই হলো নব রাজাধিরাজ, নবমেয়র। মনে ভারি একশতটন কষ্ট অপ্রস্তুত হাজী সাহেবের। নতুন মেয়রের জয়গান লেখার হাজারো ক্যাডার পুরোনো ঢাকায় গিজগিজ করছে এখন। ঐ যে মিটফোর্ড হাসপাতাল আর সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের বিভাজনী দেয়াল, সেখানে সেসব ক্যাডারের দেয়াল লিখনীতে ৩ আগস্ট যা দেখলাম, তা বলতেই উপরোক্ত ভনিতা।

দক্ষিণের নবমেয়রের পক্ষে দেয়াল লিখনীর কথাগুলো নিম্নরূপ :
‘অমুক পদের নির্বাচনে মহান অমুককে জয়ী করুন।’ সৌজন্যে পাগলা মজিবর। পাঠক, আমরা জানি সেই বিংশ শতাব্দীর সত্তর আশির দশক থেকেই সমাজের এখানে সেখানে খুচরা মাফিয়াদের নামকরণ। ‘কালা জাহাঙ্গীর’ কতটুকু কৃষ্ণবর্ণের সেটা দেখার সুযোগ হয়নি অনেকেরই। কিন্তু এই কালা মিয়ার নামে যে কত সহস্র টেলিফোনে অর্থ-খুন-অপহরণের হুমকি বর্ষিত হতো তা থরথর কম্পিত-শংকিত সাধারণেরা জানতো। মীরপুরে ছিল এক ‘গালকাটা কামাল’। কতো যে ব্যাকা-ত্যাড়া-খাড়া-বিশেষণের কতোজন। কেন যে মিলনের নামের আগে ‘মুরগী’ যোগ হলো জানিনা। ‘কানা-ল্যাংড়া-টাউকা-কুঁজা’ শব্দগুলি অবমাননাকর বিধায় ব্যবহার করা ঠিক নয় বলে পরামর্শ দেন প্রতিবন্ধী অধিকারের লোকজন। কিন্তু এসব বিশেষ বিশেষ পরিচয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এসবে এতটুকু অসুখী নন। কেননা ঐ বিশেষ পরিচয় চিহ্নই যে তার পকেটকে বিশেষ গতি ও পরিমাণে পরিপুষ্ট করে।

আমাদের ‘পাগলা মজিবর’ ছাড়িয়ে গেছে সব রেকর্ড। এই দেশে এ পর্যন্ত নিজে কখনো নিজের অমন পরিচিতি-পদবীর হাস্যকর নামকে এভাবে ব্যবহার করে দেয়াল লিখনীকে নেতার ‘মন ও নয়ন’-এর দৃষ্টি আকর্ষন করতে উদগ্রীব হতে দেখিনি। দক্ষিণের প্রথম মেয়র সাহেব যেন মেয়র না হতে পারেন, সেজন্য বহু শক্তি গোপনে প্রকাশ্যে জান-প্রাণ দিয়েছে। এ অবস্থায় তার পক্ষেও যে জান প্রাণ দিতে ‘পাগলা’, ‘কানকাটা’, ‘বাইশ আঙ্গুইল্যা’ প্রভৃতি ইহারা জান প্রাণ দিয়ে নির্বাচনী মাঠে তৎপর ছিল, তার প্রমাণ দিতেই বুঝি অমন বেশর্মা দেয়াল লেখা!

তা এখন ‘পাগলা মজিবর’ সাহেবের কর্মতৎপরতা কি? জানিনা, তবে অনুমান করতে পারি। দক্ষিণের প্রথম মেয়রের অধিষ্ঠানের সুযোগে এককালের নির্বাচন-খাটুয়া ‘পাগলা মজিবর’ নিশ্চয়ই এখন অনেক বড় দাবীদার। এমন কতোজনেরই তো আছে কতো কতো অ্যাকশন। দেয়ালে থাকে নামের পরিচয়। কিন্তু সমাজে থাকে তাদের কাম কাজের পরিচায়ক। দেয়ালের এক নাম, সমাজে দশ কাম, শত উপদ্রব। যে উপদ্রবে সাধারণ মানুষের জীবন ঝালাপালা হয়ে যায। এই জনগণ উন্নয়ন আর পদ্মা সেতুও চায়। দেশের নিজ অর্থেই হোক, যথাদ্রুত হোক। কিন্তু এসব দেয়াল লিখনীর মহান ‘পাগলা মজিবর’ ধরনের লোকেরা যে এহেন জনগণেরই জানপ্রাণ ভর্ত্তা করে দিয়েছে।

ছাত্রলীগের সম্মেলন গেল। ওরা বললো ‘ছাত্রলীগের ইতিহাস বাংলাদেশের ইতিহাস’। পাকিস্তান থেকে মুক্তিযুদ্ধ তেইশ বছর বিচারে এর চেয়ে সত্য কথা আর কিছুই নয়। সেই ইতিহাসের ধারায় সাম্প্রদায়িক-রাজাকার-আলবদর-পাকিস্তানপন্থীদের উগ্র হামলার বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের রক্তদানের ইতিহাসও কম উজ্জ¦ল নয়। কিন্তু সকলি গরলি ভেল। ছাত্রলীগের ইতিবাচক কাজের সমভূমি ডুবে গেছে নেতিবাচক কাজের সুনামিতে। মিডিয়ার ওপর ভাই ক্ষেপে টেপে লাভ নেই। দেশে এখনও এমনই ভাল কাজ করার সুযোগ রয়েছে যে মিডিয়ার বাপের বাপরাও ইতিবাচক রিপোটিং করতে বাধ্য হবে।

ছাত্রলীগের নবনির্বাচিত সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক। তাদের নিকট-শিক্ষকের কাছে শুনেছি দু’জনই অস্ত্রবাজি, চাঁদাবাজি করেনি, হলে ফাও খায়নি, জোর জবরদস্তি করেনি। লেকাপড়ায় নিয়মিত এবং ভালো। শুনে ভালো লেগেছে। কিন্তু সারা দেশে ক্ষমতার একচ্ছত্র পরিবেশে আওয়ামী পরিবারের সক্রিয় নেতৃত্বের নানা অংশ সর্বস্তরে যা করে চলেছে, ছাত্রলীগের নবনেতৃত্ব চাইলেই কী তার বাইরে থেকে এসবকিছু উল্টিয়ে দিতে পারবে ? অসম্ভব!

তাহলে ? এখন প্রায় সকলেই পেতে চায়। চাই চাই চাই। না পেলেই সশব্দ রক্তপাত। মাতৃউদরের গভীরের শিশুও চাই চাই হিংস্রতার বেপরোয়া আক্রমণের শিকার। এমন ছাত্র-যুব-কৃষক-শ্রমিক-আওয়ামী লীগ যে হায় খোদ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেই ছিন্ন ভিন্ন বিপন্ন করে তুলেছে। বঙ্গবন্ধু কন্যা এই কঠিন বাস্তবতা নিয়ে কি ভাবছেন জানিনা। তবে ‘পাগলা মজিবর’ বাহিনী দেশজুড়ে কী করবে, কী করছে তা জানাটা এতটুকু মুশকিল নয়। ছাত্রলীগের ইতিহাস যেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার গলার ফাঁস না হয়, নবনেতৃত্ব সে চেষ্টায় নিয়োজিত হলে জাতির অশেষ মঙ্গল হয়…….এ কথাটি মনে রাখলে ছাত্রলীগের সম্মেলন ও প্রধানমন্ত্রীর ভাষন অর্থ খুঁজে পাবে বোধ করি। নইলে পাগলা মজিবরেরাই সমাজ শাসন করে চলবে।

(এ
বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর
সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View