চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

হাতে-পায়ে খেলিছো, এই বিশ্বলয়ে

ছিয়াশি’র মেক্সিকো বিশ্বকাপ। অদ্ভুত এক জাদুকরের দেখা পেলো ফুটবল বিশ্ব। যার পায়ে পায়ে জাদুর ছাপ। অবশ্য পায়ের জাদু একটু আগ বাড়িয়ে হাতের জাদুতেও পরিণত হয়েছিল! যিনি একাই টেনে নিলেন দলকে, একাই রাঙিয়ে দিলেন সেই মহারণকে, নাম তার ডিয়েগো ম্যারাডোনা।

আর্জেন্টাইন দলকে এনে দিয়েছিলেন দ্বিতীয়, আর নিজেকে প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ। ম্যারাডোনা, আর্জেন্টাইন ফুটবলের এক কিংবদন্তির কথা। আমার নিজের ফুটবল বুঝতে শুরু করার প্রথম পাঠ ছিল পেলে-ম্যারাডোনার নাম। ফুটবলে তর্ক বলতেই ‘ঈশ্বরের হাত’।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

খেলার যদিও আগা-মাথা কিছুই বুঝি না। কিন্তু স্বভাবদোষে বাঙালির যা হয়, সেটা আমারও হল। ম্যারাডোনা হাতে গোল দিয়েছেন, চুরি করেছেন, আর কালো মানিক পেলে সেরা- এ দুটো লাইনই ছিল তর্কের মূল ও সর্বশেষ কথা। সে এক অসাধারণ অনুভূতি!

সেই তর্কের হয়ত অবসান ঘটবে কোনো এক কালে। কিন্তু যে এই তর্কের জন্ম দিয়েছেন তার অবসান ঘটবে না কখনো। সেই বাম হাত তার ভক্ত, রাইভালদের মনেই রয়ে যাবে। ‘ফুঁ’ বলতেই তার নাম যে চলে আসবে। বিজ্ঞানীরা বলে থাকেন একেকটি নক্ষত্রের বয়স মিলিয়ন-বিলিয়ন বছরের। তাই বুঝি ম্যারাডোনা নামের এই নক্ষত্র ভক্তকুলের মনে চিরকালের পথটাই বেছে নিলেন।

‘আমায় একটা বল দাও, যেকোনো জায়গায় দেখিয়ে দেবো আমি কী পারি!’ ম্যারাডোনা এই উক্তিটির জন্যই হয়ত ১৯৬০ সালের ৩০ অক্টোবর বুয়েন্স আয়ার্সে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। রবি ঠাকুরের কবিতার আদলে যদি বলি- সার্থক আর্জেন্টিনা তোমার, জন্মেছিলেন তিনি তোমার দেশে, সার্থক জনম, ফুটবল, তোমায় ভালোবেসে।

চার-চারটি বিশ্বকাপ খেলা এই তারকা ‘ক্যাপ্টেন’ হিসেবে দলকে দুইবার বিশ্বকাপের ফাইনালের মঞ্চে নিয়ে যান। নাপোলির হয়ে ২বার সিরি আ ট্রফি জেতেন। বার্সেলোনার হয়েও মাঠ মাতান তিনি। তবে তার সার্থকতার অনেকটা মলিন হয়ে যায় ভাগ্যের চক্রে মাদক নেশার জগতে।

খেয়াল করে দেখলাম, তিনি যখনই তার আদর্শগত সংগ্রাম, পেশাগত কমিটমেন্ট এবং সাধনার স্থান ‘প্রিয় ফুটবল মাঠ’ থেকে সরে গেলেন, তখনই ঘটল বিপত্তি। অর্থাৎ, সমাজ ও দেশের স্বার্থের জন্য যখন তিনি মাঠজুড়ে লড়তেন, তখন তিনি নিজের সর্বোচ্চ উজাড় করে দিতেন। সেই তিনি ব্যক্তিগত সুখ, ব্যক্তিগত মোহ এবং ব্যক্তিগত অভ্যাসকেই মুখ্য করলেন! তখন মাদকের চোরাবালিতেই ডুবে যেতে হল তাকে। প্রকৃতির অমোঘ শাস্তি, কারেই যেন রেহাই নেই, হোক না সে ফুটবলের ঈশ্বর।

’৯৪ বিশ্বকাপের মাঝপথেই ডোপ টেস্টে পজিটিভ আসায় বাড়ির পথ ধরেন এই কিংবদন্তি। ক্রমে ক্রমে নিস্তেজ এক শরীরে পরিণত হলের। তার মনটি ছিল যৌবনে টইটুম্বুর, কিন্তু শরীর ছিল বার্ধক্যে জর্জরিত। ’৯৭তে পেশাদার খেলা থেকে ভঙ্গুর শরীর নিয়ে ৩৭ বছর বয়সে অবসর নেন। ফুটবল ছিল তার কাছে শিশুর হাতের সরল খেলনার মতো। বাঁ-পায়ে ফুটবলটাকে ঠিক ততটাই সাবলীল আর নৈপুণ্যের সাথে নিয়ন্ত্রণ করতেন। দেখে মনে হতো যে তিনি জেতার জন্য নয়, খেলার জন্যই খেলছেন।

বিজ্ঞাপন

তাই যখনই তিনি জিততেন, করতালিতে মেতে উঠত ফুটবলপ্রেমীরা, হারলে সেই একইভাবে অশ্রুসিক্ত হতো আলবিসেলেস্তেদের দেশ থেকে মামুনুল-জামাল ভূঁইয়াদের দেশ পর্যন্ত।

সফল মহানায়কদেরও ব্যর্থতার চোরাবালিতে পা হড়কে যায়, পঁচা শামুকে পা কাটে। সেই শিক্ষাটুকুই যেন দিয়ে গেলেন ম্যারাডোনা। তার ইচ্ছেশক্তি ছিল, কিন্তু প্রতিজ্ঞার জোরে খামতি ছিল। বারংবার চেষ্টা করেও সরতে পারেননি। মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার তাড়নাটাই যেন ছিল বেশি। করোনাময়ী এবছর রথী-মহারথীদের প্রয়াণ দিবসে পরিণত করছে। বছরটা যেন সৃষ্টিকর্তা যমদূতকেই উৎসর্গ করেছেন।

২০১৬ সালের ২৫শে নভেম্বর কিউবার প্রেসিডেন্ট, ম্যারাডোনার চিরবন্ধু ফিদেল চলে গেলেন। ২৫ নভেম্বর তারিখে ফিদেল কি তাকে এতই ডেকেছিলেন যে, বন্ধুকে সাড়া দিতে হল ঠিক তার প্রস্থানের দিনেই! পুরো পৃথিবীর ফুটবলামোদীর কাছে বিস্ময়কর এক শোকের তারিখ হয়ে রইল ২৫শে নভেম্বর। ফিদেল আর ম্যারাডোনাকে স্মরণ করতে আলাদা আলাদা ছবির কী দরকার?

এক ফ্রেমের ছবি ও এক তারিখেই শোকসভা রচনা করে ম্যারাডোনা যেন স্বর্গের দুয়ারে ফিদেলকে বলছে রবীন্দ্রনাথের সুরে- ‘খোলো খোলো দ্বার, রাখিয়ো না আর বাহিরে আমায় দাঁড়ায়ে/ দাও সাড়া দাও, এই দিকে চাও এসো দুই বাহু বাড়ায়ে।’

ফেসবুকে গতকাল এক নিরশ্বরবাদী (কিন্তু ফুটবল ঈশ্বরভক্ত) লিখেছেন, ‘ঈশ্বর’, তুমি একটু পৃথিবীর দিকে হাত বাড়িয়ে দাও, ‘ফুটবলের ঈশ্বর’ তোমার দিকে তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন! উনাকে তুলে নাও স্বর্গে..।

সত্যিই, ম্যারাডোনা যেন সেই বাম হাত উঁচু করে তুলেছেন, আর স্বর্গ থেকে তার ঈশ্বর তার দিকে হাত বাড়িয়ে বরণ করে নিচ্ছেন। ফুটবলকে বলা হয় পদব্রজের (পায়ের খেলা) জাদু। পায়ে পায়ে ফুটবল খেলে তিনি সুনাম কুড়িয়েছেন, তবে একধাপ এগিয়ে ‘হাতে’ খেলেও কুড়িয়েছেন সমালোচনা।

হাতে-পায়ের এই অভিনব খেলোয়াড়কেও শেষ গন্তব্যে যেতে হল। যমদূত ‘বিপদ’ আকারে এসেছে, তাই কোনো ‘অজুহাত’ই টিকল না এই মাটির পৃথিবীতে। মরণ ঘনিয়ে এলে এই মাটির পৃথিবীতে যত বড় যে-ই হোক, ডান হাত, বামহাত বা কোনো ‘অজুহাত’ই আর খাটে না। যদি ডাক আসে, তখন হাতে-পায়ে ধরলেও কাজ হয় কি? বিদায়, ম্যারাডোনা, চলে গিয়েও তুমি রয়ে যাবে অন্তরে অন্তরে! তোমার দিকে চেয়ে আজ শুধু গাইবো নজরুলের সুরে ‘খেলিছো এই বিশ্বলয়ে বিরাট শিশু, আনমনে..।’

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)