চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

হাকিম চত্বরের প্রিয় ‘হাকিম ভাই’

আশি ও নব্বই দশকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের কাছে এক প্রিয় নাম ‘হাকিম ভাই’। কম বেশি সবার জীবনের স্মৃতিতেই যেনো খানিকটা এই নামটি জড়িয়ে আছে দারুণ এক মুগ্ধতায়। যে নামটি মনে পড়তেই চোখের সামনে ক্যাম্পাস জীবনের হাজারো মধুর স্মৃতি ভেসে উঠে। অনেকে এই নামটি শুনতেই আবেগে আপ্লুত হয়ে উঠেন। আশি ও নব্বই দশকের শিক্ষার্থীদের কাছে এই নামটি শুধু প্রিয়-ই নয়, দ্রুত অদ্ভূত এক স্মৃতিকাতরতার মধ্যেও নিয়ে যায়।

‘হাকিম ভাই’ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাতে নিতান্তই একজন চা বিক্রেতা ছিলেন। একেবারেই সহজ-সরল অবয়বে গড়া মানুষটি দিনরাত চা সরবরাহ করতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে শিক্ষক, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, অভিনেতা সবাই-ই কমবেশি তার চায়ের ভক্ত ছিলেন। আর এ কারণেই হাকিম ভাই-এর চায়ের দোকানে সবসময় ভীড় জমেই থাকতো। তবে ভীড়টা বড় বেশি হতো সকাল এবং সন্ধ্যে বেলাতে। অজস্রজন হাকিম ভাইয়ের চা পান করতে করতে নানা আলোচনায় মাতোয়ারা হয়ে উঠতেন। সেই আলোচনায় রাজনীতি, সাহিত্য, নাটক, গল্প, প্রেম-ভালবাসা কোনো কিছুই বাদ যেত না। আবার অভিমানী অনেক তরুণ-তরুণীর কাছেও এক আস্থার মানুষ ছিলেন হাকিম ভাই। এদিক-ওদিক ঘুরেফিরে শেষ খবরটি নিতেন হাকিম ভাই-এর কাছ থেকেই। অনেক প্রেমিক-প্রেমিকাই হাকিম ভাই-এর কাছে চিঠি, গিফট পর্যন্ত রেখে যেতেন। ‘হাকিম ভাই’ সেগুলো সযত্নে রেখে দিতেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের ঠিক বিপরীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের যে দ্বার ঠিক তার ডান পাশেই ‘হাকিম ভাই’-এর চায়ের পসরা ছিল। দোকানটি ছিল একেবারেই সাদামাটা। বসার জন্য তেমন কোনো আয়োজন ছিল না। ইটের উপর কয়েকটা তক্তা সাজানো ছিল-এই যা। ওখানেই জমে উঠতো তুমুল আড্ডা। তবে শুধু চা পান বলে কথা নয়, অনেকেই ‘হাকিম ভাই’-এর সাথে দুটো কথা বলার জন্যেও চলে আসতেন। আর তাই ভরদুপুরেও দেখা যেত কেউ না থাকলেও শুধু হাকিম ভাইকে কাছে পেয়েও খুশির শেষ নেই। ছুটির দিনে অনেকেই বাসা থেকে ভোরে সোজা চলে আসতেন হাকিম চত্বরে, শুধুই এককাপ চা খাওয়া আর হাকিম ভাই-এর সাথে কথা বলার জন্যে।

‘হাকিম ভাই’ অনেকেরই কাছেই ছিল অন্যতম যোগাযোগ মাধ্যম। রাজনৈতিক কর্মী, প্রেমিক- প্রেমিকা, বন্ধুস্বজনদের একাধিক চিরকূট প্রতিদিন সংরক্ষণ করতে হতো ‘হাকিম ভাই’কে। রোকেয়া হলের মেয়েদের অনেকের কাছেও ‘হাকিম ভাই’ ছিলেন বড় এক নির্ভরতা। ‘হাকিম ভাই’ সর্বদা হেসে কথা বলতেন। কখনও বিরক্ত হতেন না। কারোর উপর রাগ করতেন না। কাকে কীভাবে সম্মান জানাতে হবে তা ভালো করে জানতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরা কখন, কোথায় চায়ের জন্য দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকতেন এসব ছিল তার নখদর্পণে। এরশাদ আমলে দেশের বরেণ্য, বিখ্যাত-প্রখ্যাত এমন কোনো কবি লেখক নেই যে যিনি একবার হাকিম চত্বরে পা রাখেননি। আবার সে সময় ক্যাম্পাসের অনেক নায়ক-গায়কের প্রিয় স্থান ছিল হাকিম চত্বর। তরুণ শিক্ষকদের অনেকেই হাকিম চত্বরে এসে চুটিয়ে আড্ডা দিতেন।

ঢাকার দোহারের বাসিন্দা স্বল্পভাষী ‘হাকিম ভাই’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চায়ের দোকান শুরু করেছিলেন সত্তর দশকের শেষলগ্নে। ২০০০ সালের ৪ ডিসেম্বর ‘হাকিম ভাই’ আকস্মিক মৃত্যুবরণ করেন। আগের দিন গ্রামের বাড়িতে যান, ওখানেই মৃত্যুবরণ করেন। ‘হাকিম ভাই’-এর চায়ের দোকানটি বড় বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল সামরিক সরকার এরশাদ ক্ষমতায় আসার পর। জনপ্রিয়তা এতোটাই ছড়িয়ে পড়ে যে ‘হাকিম ভাই’ এর মৃত্যুর আগেই ‘হাকিম ভাই’-এর চায়ের দোকান-এলাকা ‘হাকিম চত্বর’ নামে সর্বত্র খ্যাত হয়ে উঠে। এখনও তাই ‘হাকিম চত্বর’ নামটি দারুণ এক সুবাস ছড়িয়ে আছে। সন্দেহ নেই প্রগতিশীল ছাত্রদের প্রাণবন্ত আড্ডা আর আন্দোলনের অন্যতম স্মৃতি স্মারক ‘হাকিম চত্বর’। আশির দশকে স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে ‘হাকিম চত্বর’ ছিল আন্দোলনকামী ছাত্র ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের সবচেয়ে প্রিয় এক স্থান। স্বৈরাচার ও তার দালাল এবং জামাত-শিবির প্রতিরোধে ছাত্র জমায়েত ও মিছিলের সূচনা হতো ‘হাকিম চত্বর’ থেকেই।

এরশাদ আমলে ‘হাকিম চত্বর’-এ জাসদ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের আড্ডা মারার জায়গা হিসেবে বেশি পরিচিত ছিল। এখানে বসেই জাসদ ছাত্রলীগের নেতাকমীরা বহু আন্দোলনের পরিকল্পনা করতেন। জাসদ ছাত্রলীগের নেতা আরিফ মহিউদ্দিন শিকদার, ফখরুল আহসান শেলী, তোহা মুরাদ, শফি আহমেদসহ অনেকেরই নিবিড় যোগাযোগের বড় জায়গা ছিল এই ‘হাকিম চত্বর’। জাসদ ছাত্রলীগের সেই সময়কার চেনা মুখ জিন্নাহ, শিপন, মুরাদ, আকরাম, মুকুর, শামীম, বাদল শিকদাররা মুখরিত রাখতো হাকিম চত্বর। কবি ইস্তেকবাল হোসেন, আবৃত্তিকার আহকাম উল্লাহ, অভিনেতা শ্যামল জাকারিয়াদের কাছে এখনও হাকিম চত্বর স্মৃতির এক বড় অধ্যায়।

‘হাকিম চত্বর’ থেকেই জাসদ ছাত্রলীগের সাহসী লড়াকু নেতা-কর্মীরা বহু লড়াই-সংগ্রামের সূচনা করেন। সে কথাই বলছিলেন তৎকালীন জাসদ ছাত্রলীগের সাবেক ছাত্রনেতা শফি আহমেদ। বলেন, ‘হাকিম চত্বর জুড়ে রয়েছে হাজারো স্মৃতি। যে স্মৃতির শেষ নেই। কত স্মৃতি! হাকিম ভাই মানুষটা ছিলেন অন্যরকম। আমাদের প্রতি কেন জানি সবার থেকে বেশি সহানুভূতিশীল ছিলেন। নিরবে-নিভৃতে আমাদের লড়াই-সংগ্রামের সহায়কও ছিলেন তিনি। অনেক গোপন সংবাদ তার কাছে আমরা রেখে যেতাম। আমাদের অন্য কর্মীরা সেটা শুনে সেই ভাবে নির্দেশনা পালন করতো।’

একদিনের ঘটনার কথা তিনি উল্লেখ করে বলেন, ‘ছাত্রদের তীব্র আন্দোলন ঠেকাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একবার অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেয় এরশাদ সরকার। এমতাবস্থায় আমরা ক্যাম্পাসে যাওয়া আসা ছাড়িনি। বুয়েটও বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে গোপনে আমরা কয়েকজন বুয়েটের শহীদ স্মৃতি হলের তৎকালীন ভিপি বন্ধু আবুল হাসনাতের রুমে থাকি। প্রতিরাতে ওয়াল টপকিয়ে আমরা হলে প্রবেশ করতাম। দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এসে আড্ডা দিতাম। একদিন বিকেলে কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, কণ্ঠশিল্পী হ্যাপী আখন্দসহ আমরা হাকিম চত্বরে বসে আছি। এর মধ্যে পুলিশ ও বিডিআরের টহল ভ্যান আসে। কণ্ঠশিল্পী হ্যাপী বলে শফি ভাই আমরা এখানে নিরাপদ নই, চলেন অন্যদিকে চলে যাই। এ কথা শুনে কবি রুদ্র বলেন, আমাকে একটা গ্রেনেড দেন। আমি পুলিশ ভ্যানের উপর ছুঁড়ে দিই। গ্রেনেডের কথা শুনে হাকিম ভাই হাসতে থাকেন। এর আগেই গোয়েন্দাদের কিছু বিষয়ে সতর্ক করে দেন হাকিম ভাই। এটা সত্য আমাদের অনেক পরিকল্পনার খবরই তিনি রাখতেন ও জানতেন। আবার আমাদের সতর্কও করতেন। গোয়েন্দারা কখন এসেছিল তা জানিয়ে দিতেন। মানুষটা আপাদমস্তক অন্যরকম ছিলেন। তার চাওয়া-পাওয়া ছিল না। আর তাই সারাজীবন তিনি আমাদের ভালবাসা পেয়েছেন।’

আজ থেকে ১৮ বছর আগে ‘হাকিম ভাই’ চিরবিদায় নিলেও এখনও তিনি ক্যাম্পাসে অবিনশ্বর এক নাম। এখনও পুরনোদের অনেকেই হাকিম চত্বরে গিয়ে স্মৃতি হাতড়ান। ‘হাকিম ভাই’ এর মৃত্যুর পর তার স্মরণে হাবিবুর রহমান জিন্নাহ, আকরাম হোসেন-এর নেতৃত্বে গড়ে তোলা হয় ‘হাকিম ভাই’ স্মৃতি পরিষদ। প্রতিবছর ‘হাকিম ভাই’ স্মৃতি পরিষদ-এর পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় হাকিম চত্বরে। স্মরণে আনা হয় ‘হাকিম ভাই’কে। ‘হাকিম ভাই’ আজও অমলিন আমাদের হৃদয়ে, অনুভবে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)