চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

স্বাস্থ্যসেবা খাতে অনন্য অবস্থানে বাংলাদেশ: ডা. জুবায়ের আহমদ

আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য সত্যিই এটি একটি বড় সুসংবাদ যে, আমরা করোনার ভ্যাকসিন এরই মধ্যে পেয়ে গেছি। কারণ করোনা পেন্ডামিকের এই সময়ে অন্যান্য দেশ যখন মৃত্যুর মিছিল সামলাতে ব্যস্ত, তখন বাংলাদেশ করোনা প্রতিষেধক ভ্যাকসিন বিতরণে ব্যস্ত সময় পার করছে। বাংলাদেশ যে চিন্তায়-চেতনায় এবং কর্মে অন্যান্য অনেক দেশের চেয়ে এগিয়ে তা এখন বিশ্ববাসীর কাছে বেশ দৃশ্যমান। কথাগুলো গণমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলছিলেন মেডিসিন, এলার্জি ও রিউম্যাটোলজি বিশেষজ্ঞ ডাঃ জুবায়ের আহমদ।

সম্প্রতি তিনি বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাত নিয়ে গণমাধ্যমের সাথে খোলাখুলি আলাপ করেন। সেই আলাপে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দূরদৃষ্টি এবং সরকারের আন্তরিকতার কারণেই বাংলাদেশ এ মহামারী থেকে অনেকাংশে রক্ষা পেয়েছে। বাংলাদেশের ঝুঁকি ছিলো অনেক বেশি, কারণ বেশ ঘনবসতি আমাদের দেশে। বিশেষ করে ঢাকাতে এই ঘন বসতি অনেক বেশি। সারাদেশের মানুষের বাস এখানে। আর এ ভাইরাস ছড়ানোর মাধ্যমও ছিলো মানুষ। সুতরাং শুরুতে অন্যান্য দেশের যেখানে করোনা ঠেকাতে নাভিশ্বাস ছুটে গেছে, সেখানে বাংলাদেশ করোনা ভাইরাসকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছে। এটা বাংলাদেশের জন্য তো বটেই, বিশ্বের কাছেও বিস্ময়কর।

বিজ্ঞাপন

আসলে বাংলাদেশ সরকারের নিবিড় তত্ত্বাবধানে এটা সম্ভব হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতা, ভর্তুকি, সহায়তা আর জনগণের সচেতনত-সবমিলিয়ে দারুণ এক দুর্যোগ মোকাবেলা করেছে বাংলাদেশ। সফল এই মোকাবেলার সুফল এখন ভোগ করছে বাঙ্গালী। আর সে কারণেই অন্যান্য অনেক দেশের চেয়ে অনেকটা এগিয়ে এবং অনন্য অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।

তিনি যোগ করে বলেন, আমি মনে করি আমাদের হেল্থ সেক্টর একটা ফরম্যাটে আসা উচিৎ। আর এই ফরম্যাটটাই হবে অর্গানাইজড। আপনি যদি এ খাতে আরো উন্নয়ন এবং স্থায়ী উন্নয়ন ধরে রাখতে চাই তাহলে কিছু পদক্ষেপ নেয়া উচিত। অনেকটা সিঙ্গাপুরের মতো। কিন্তু যদি নর্থ আমেরিকাকে আপনি ফলো করতে চান, তাহলে কিন্তু হবে না, কারণ তাদের দেশের সব কিছুই একটা নিয়মের মধ্যে, শৃংখলার ভেতর দিয়ে চলে। যেমন তাদের সবার জন্য স্বাস্থ্য বীমা নিশ্চিত করা আছে। আমাদের ভৌগলিক অবস্থান, আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট কিন্তু এক না। সেসব দেশে এই পুরো সেক্টরটাই নিয়ন্ত্রণ করে চিকিৎসক এবং চিকিৎসা খাতের সাথে সংশ্লিষ্ট যারা তারা।

আবার ইউকের কথা যদি ভাবি, তাহলে কি দেখতে পাই, তারা কিন্তু সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দিয়েছে। এখন অনেকট ক্লোজ অবজারভেশনে আছে সেখানকার প্রায় সব নাগরিক। এরা প্রযুক্তি বলেন, স্বচ্ছতা কিংবা জবাবদিহিতা বলেন অথবা সামাজিক দায়বদ্ধতার কথাই বলেন না কেন-তাদের অর্জন অনেক বেশী এবং স্থায়ী।

সেই সেবা এখনো বাংলাদেশ নিশ্চিত করতে পারে নি। তবে সে দিকে অগ্রসর যে হচ্ছে তা বেশ দৃশ্যমান। কারণ বাংলাদেশের মানুষের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন কিন্তু হয়েছে। এখন তারা নিজস্ব অর্থ ব্যয় করে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর-লন্ডন কিংবা আরো উন্নত কোন দেশে যাচ্ছে হরহামেশাই। তাহলে সেই আমাদের দেশে কেন ব্য়য় করছে না। আমি মনে করি, এটা শুধুমাত্র আস্থার অভাবের কারণে। মানুষের মনে আস্থাটা তৈরি করার জন্যই হেল্থ সেক্টরটাকে একটা ফরম্যাটে আনতে হবে। মনিটরিং সিস্টেমটা আরো স্ট্রং করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

দেশের টাকা দেশেই রাখার জন্য স্বাস্থ্যসেবা খাতে বাংলাদেশ সরকারের নজরদারি আরো বাড়াতে হবে বলে আমি মনে করি।

স্বাস্থ্যখাতে বীমার ভূমিকা বিষয়ক প্রশ্নের উত্তেরে ডাঃ জুবায়ের আহমদ বলেন, আমাদের দেশে বর্তমানে বেসরকারি বেশ কয়েকটি করপোরেট অফিসে স্বাস্থ্যবীমা সেবার আওতায় এসেছে টেলিফোন কিংবা ব্যাংক খাতের কর্মীরা। তবে সামরিক কর্মকর্তা এবং কর্মচারীরাও এই স্বাস্থ্যবীমার আওতায় সেবা পেয়ে থাকেন। বাকী আছেন কেবল শ্রমজীবীরা।

এক্ষেত্রে একটা বড় সংকট হলো স্বাস্থ্যবীমায় তাদের কি লাভ-এটার প্রচারটা তেমন হয়নি বা হয় না বলতে পারেন। সে কারণে শিক্ষিত মানুষেরাও এ বিষয়ে ততটা সচেতন না। আর নিম্নআয়ের মানুষদের কাছে হয়তো এ বার্তাই পৌঁছায় না। পৌঁছালেও এই স্বাস্থ্যবীমার গুরুত্ব কি বা তার জীবনে এই বীমা কি প্রভাব ফেলবে সে সম্পর্কে জানেই না। ফলে স্বাস্থ্যবীমা করার ব্যাপারে তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। কিংবা অপ্রয়োজনীয় মনে করেন। আর অনেকটা সে কারণেই তাদের পকেটে টাকা থাকা স্বত্ত্বেও নাগরিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে অনেক সময় বঞ্চিত হচ্ছেন। যদিও সরকার কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে নিম্নবিত্ত বলেন আর উচ্চবিত্তই বলেন, সকলের জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। আমি মনে করি স্বাস্থ্যবীমা কেন প্রয়োজন এই বিষয়ক সচেতনতাটা আরো বাড়ানো উচিৎ।

উন্নতদেশগুলোতে কিন্তু স্বাস্থ্যবীমা বাধ্যতামূলক। আমেরিকা বলেন, কানাডা বলেন কিংবা ইউরোপের যেকোন দেশের কথা বলেন না কেন, সেসব দেশে স্বাস্থ্যবীমাটা বাধ্যতামূলক। কিন্তু আমাদের দেশে বীমা কোম্পানীগুলোও অনেকটা দায়সারা গোছের কাজ করে আমি বলবো। কারণ বীমা মানুষ সহজে করতে চায় না। তারউপর স্বাস্থ্যবীমা-একটু কঠিনই মনে করেন তারা। তবুও যথেষ্ট প্রচার এবং গ্রাহকের কাছে স্বাস্থ্যবীমাকে সহজলভ্য করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ বীমা কোম্পানীগুলো নিতেই পারে। গণমাধ্যমকে ডাঃ জুবায়ের আহমদ বলেন, একটা মানুষ শিক্ষিত না হলেও বেঁচে থাকতে পারেন। কিন্তু সুস্থ না থাকলে বাঁচবেন কিভাবে? মানুষকে যেমন খেতে হবে, তেমনি স্বাস্থ্যসেবাও নিতে হবে। এটা জীবনের জন্য প্রয়োজন, বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় একটি বিষয়। স্বাস্থ্য বীমা তাই অতিরিক্ত বা লাক্সারী কোন বিষয় না, এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রয়োজনীয় একটি পদক্ষেপ। সকলেরই স্বাস্থ্যবীমা থাকা উচিত বলে মনে করেন ডাঃ জুবায়ের।

সুস্থতাই জীবন। আমাদের ভালো থাকতে হবে। এজন্য প্রয়োজন সচেতনতা। নিজের প্রতি যত্ন নিতে হবে। আর ব্যক্তির যত্নই সমাজ-জাতি-দেশকে সুস্থ্য সবল এবং সফল করে। আর এ ব্যাপারে সরকারের আন্তরিকতার কোন ঘাটতি নেই।

অনেকে করোনার টিকা নিয়ে একটা নেগেটিভ অ্যাপ্রোচের চেষ্টা করছেন যা অত্যন্ত কষ্টকর। ভ্যাকসিন তো জীবন রক্ষাকারী। বাংলাদেশ সরকার সীমিত সাধ্যের মধ্যেও বাংলাদেশের মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের চেষ্টা করছে। আর ভারত আমাদের অকৃত্রিম বন্ধু, তারা বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়েছে। এটাকে আমাদের স্বাগত জানানো উচিৎ। এ বিষয়ে আমাদের আরো সচেতন আরো পজিটিভ মনোভাব রাখা উচিৎ বলে মনে করেন মেডিসিন, এলার্জি ও রিউম্যাটোলজি বিশেষজ্ঞ ডাঃ জুবায়ের আহমদ।