চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

স্বাধীনতার ৫০ বছর: বাঙালির মুক্তির সনদ ‘৬-দফা’

বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন ও জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সূচনা হয় বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশ বিভাগের পর বাঙালি উপলব্ধি করে এ দেশ আমার না, এই স্বাধীনতা আমার না। ধর্মের ভিত্তিতে কোনো সমাজ বা জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।

পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক নির্যাতিত, নিষ্পেষিত ও বঞ্চিত হতে থাকে প্রতিদিন প্রতিক্ষণ। এই বঙ্গেয় উপত্যকার মানুষ পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে আত্মমর্যাদা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের জন্য লড়াই করতে থাকে। তবে পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলন স্বাধীনতার প্রশ্নে মোড় নেয় মূলত ১৯৬৬ সালের ৬ দফা দাবি উত্থাপনের মধ্য দিয়ে।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লাহোরে বাঙালির মুক্তির সদন ৬ দফা দাবি উত্থাপন করেন। কিন্তু তৎকালীন কিছু প্রগতিশীল বাম রাজনীতিক এটিকে সিআইএর দলিল বলে অভিহিত করেছিলেন। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা ও ৬ দফা বাঙালির মুক্তির সনদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। আর তখনই হয়তো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনীতিক দূরদর্শিতা সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

দিনটি ছিল ৭ জুন ১৯৬৬ সাল। এ দিনটি বাঙালি জাতির মুক্তি-সংগ্রামের ইতিহাসে এক অনন্য প্রতিবাদী আত্মত্যাগে ভাস্বর গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রামী একটি দিন। ১৯৬৬ সালের ১৩ মে আওয়ামী লীগ আয়োজিত পল্টনের এক জনসভায় ৭ জুন হরতালের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। জুন মাসব্যাপী ৬ দফা প্রচারে ব্যাপক কর্মসূচি নেওয়া হয়।

৭ জুন হরতাল চলকালে তেজগাঁওয়ে বেঙ্গল বেভারেজের শ্রমিক মনু মিয়া গুলিতে প্রাণ হারান। এতে বিক্ষোভের প্রচণ্ডতা আরো বাড়ে। তেজগাঁওয়ের ট্রেন বন্ধ হয়ে যায়। আজাদ এনামেল অ্যালুমিনিয়াম কারখানার শ্রমিক আবুল হোসেন ইপিআরের গুলিতে শহিদ হন। একই দিন নারায়ণগঞ্জ রেলস্টেশনের কাছে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন ছয় শ্রমিক। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সন্ধ্যায় কারফিউ জারি করা হয়। হাজার হাজার আন্দোলনকারী গ্রেপ্তার হন। বহু জায়গায় জনতা গ্রেফতারকৃতদের ছাড়িয়ে নিয়ে যান। ৬ দফাভিত্তিক আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। শহিদের রক্তে আন্দোলনের নতুন মাত্রা যোগ হয়। আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সারা দেশের শ্রমকি কৃষক ও জনতাকে সংগঠিত করার জন্য মাঠপর্যায়ে ছড়িয়ে পড়েন।

১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী দলগুলোর জাতীয় সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ঐতিহাসিক ৬-দফা দাবি উত্থাপন করেন। ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমান পরিচালিত ৬ দফা আন্দোলনই ছিল তদানীন্তন সময়ে দেশের সমস্ত রাজনৈতিক কর্মতৎপরতার কেন্দ্রবিন্দু। কারান্তরীণ শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গৌরবময় অধ্যায় হলো ৬ দফা আন্দোলনে নেতৃত্বদান, যা তাকে ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে একক ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী বাঙালি জাতির মুক্তির মহানায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবের সম্মানে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক সভার আয়োজন করে। লাখো জনতার এই সম্মেলনে শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেওয়া হয়। উপাধি ঘোষণা দিয়েছিলেন তৎকালীন ঢাকসু ভিপি তোফায়েল আহমেদ। এ সভায় রাখা বক্তৃতায় শেখ মুজিব ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের এগার দফা দাবির পক্ষে তার পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন। এবং বাঙালি জাতি সানন্দচিত্তে মুক্তির মহানায়কের বঙ্গবন্ধু পদবিকে দ্বিধাহীন চিত্তে আত্মস্থ করে নেয়।

বিজ্ঞাপন

লাহোরে বিরোধী দলগুলোর জাতীয় সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে ৬ দফা দাবি উত্থাপন করেন। সেগুলো নিম্নরূপ:

প্রস্তাব-১: শাসনতান্ত্রিক কাঠামো ও রাষ্ট্রের প্রকৃতি: দেশের শাসনতান্ত্রিক কাঠামো এমনি হতে হবে যেখানে পাকিস্তান হবে একটি ফেডারেশনভিত্তিক রাষ্ট্রসংঘ এবং তার ভিত্তি হবে লাহোর প্রস্তাব। সরকার হবে পার্লামেন্টারি ধরনের। আইন পরিষদের ক্ষমতা হবে সার্বভৌম এবং এ পরিষদও নির্বাচিত হবে সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে জনসাধারণের সরাসরি ভোটে।

প্রস্তাব-২: কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা: কেন্দ্রীয় (ফেডারেল) সরকারের ক্ষমতা কেবল দুটি ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে যথা, দেশরক্ষা ও বৈদেশিক নীতি। অবশিষ্ট সব বিষয়ে অঙ্গরাষ্ট্রগুলোর ক্ষমতা থাকবে নিরঙ্কুশ।

প্রস্তাব-৩: মুদ্রা বা অর্থ সম্বন্ধীয় ক্ষমতা: মুদ্রার ব্যাপারে নিম্নলিখিত দুটির যে কোনো একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা চলতে পারে : (ক) সমগ্র দেশের জন্য দুটি পৃথক অথচ অবাধে বিনিময়ে যোগ্য মুদ্রা চালু থাকবে। অথবা (খ) বর্তমান নিয়মে সমগ্র দেশের জন্য কেবল একটি মুদ্রাই চালু থাকতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে শাসনতন্ত্রে এমন ফলপ্রসু ব্যবস্থা রাখতে হবে, যাতে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে মূলধন পাচারের পথ বন্ধ হয়। এ ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক ব্যাংকিং রিজার্ভেরও পত্তন করতে হবে এবং পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক আর্থিক বা অর্থবিষয়ক নীতি প্রবর্তন করতে হবে।

প্রস্তাব-৪: রাজস্ব, কর, বা শুল্ক সম্বন্ধীয় ক্ষমতা: ফেডারেশনের অঙ্গরাজ্যগুলোর কর বা শুল্ক ধার্যের ব্যাপারে সার্বভৌম ক্ষমতা থাকবে। কেন্দ্রীয় সরকারের কোনোরূপ কর ধার্যের ক্ষমতা থাকবে না। তবে প্রয়োজনীয়তা ব্যয় নির্বাহের জন্য অঙ্গরাষ্ট্রীয় রাজস্বের একটি অংশ কেন্দ্রীয় সরকারের প্রাপ্য হবে। অঙ্গরাষ্ট্রগুলোর সব ধরনেরর করের শতকরা একই হারে আদায়কৃত অংশ নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের তহবিল গঠিত হবে।

প্রস্তাব-৫: বৈদেশিক বাণিজ্য বিষয়ক ক্ষমতা: (ক) ফেডারেশনভুক্ত প্রতিটি রাজ্যের বহির্বাণিজ্যের পৃথক পৃথক হিসাব রক্ষা করতে হবে। (খ) বহির্বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা অঙ্গরাজ্যগুলোর এখতিয়ারাধীন থাকবে। (গ) কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা সমান হারে অথবা সর্বসম্মত কোনো হারে অঙ্গরাষ্ট্রগুলোই মিটাবে। (ঘ) অঙ্গরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে দেশজদ্রব্য চলাচলের ক্ষেত্রে শুল্ক বা কর জাতীয় কোনো বাধানিষেধ থাকবে না। (ঙ) শাসনতন্ত্রে অঙ্গরাষ্ট্রগুলোকে বিদেশে নিজ নিজ বাণিজ্যিক প্রতিনিধি পাঠানো এবং স্ব-স্বার্থে বাণিজ্যিক চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা দিতে হবে।

প্রস্তাব-৬: আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠনের ক্ষমতা : আঞ্চলিক সংহতি ও শাসনতন্ত্র রক্ষার জন্য শাসনতন্ত্রে অঙ্গরাষ্ট্রগুলোকে স্বীয় কর্তৃত্বাধীনে আধাসামরিক বা আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠন ও রাখার ক্ষমতা দিতে হবে।

১৯৬৬ সালের এই দিনে ৬-দফা দাবিতে ও বঙ্গবন্ধুসহ সকল রাজবন্দিদের মুক্তির দাবিতে হরতাল ডেকেছিল আওয়ামী লীগ। তেজগাঁও, ডেমরা, আদমজী ও পোস্তগোলার শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক ও ছাত্রলীগ সেদিন ছিল প্রধান ভূমিকায়। আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ তখন কারাগারে। যারা বাইরে ছিলেন তারা হয় আত্মগোপনে বা কেউ কেউ আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করেন বা রাজনীতি থেকে দূরে সরে যান। এক শীর্ষ আওয়ামী লীগ নেতা, যিনি পেশায় ছিলেন আইনজীবী, ৭ জুন ময়মনসিংহে আদালতের গিয়েছিলেন শুধু সরকারকে জানাতে যে তিনি হরতালে অংশগ্রহণ করেননি।

হরতালের মূল সংগঠক ছাত্রলীগ ও কয়েকটি শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক। এই ভরসায় হরতাল ডাকা হয়। আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান চৌধুরী ছিলেন রসদ সংগ্রহের দায়িত্বে। সেই সময়টায় ইউনিভার্সিটি ও কলেজ ছিল বন্ধ। হরতালে শ্রমিকদের সংগঠিত করার কাজটি করেন সিরাজুল আলম খান। তখন তার নামে হুলিয়া। ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটির আহসানউল্লাহ হলে থেকে তিনি সকলের সাথে যোগাযোগ ও হরতাল সংগঠিত করছিলেন। হরতালে শ্রমিকদের অংশগ্রহণটাই আন্দোলনের গতি বাড়িয়ে দেয়।

৭ জুন পিকেটিং-এর অভাবে অনেক স্থানে গাড়ি নেমে পরেছিল, দোকানপাট খুলেছিল, অফিস আদালতে কাজ চলছিল।কিন্তু একটু পরেই পরিস্থিতি পাল্টে দিল শিল্পাঞ্চলগুলোর শ্রমিকরা, তারা যখন হরতাল করে ঢাকার কেন্দ্রের পথে মিছিল করে আসতে থাকে। আমি থানার লকআপে থেকেও এসব টের পাচ্ছিলাম। পুলিশের ব্যস্ততা দৌড়ঝাপ বেড়ে যায়। তাদের ওয়াললেসের কথাবার্তা শুনি। আদমজী জুট মিল থেকে সায়দুল হক সাদুর নেতৃত্বে শ্রমিকরা মিছিল করে ঢাকার যাত্রাবাড়ি পর্যন্ত আসে প্রায় পনেরো হাজার শ্রমিক। পুলিশ ও ইপিআর-এর বিশাল বাহিনী যাত্রাবাড়িতে তাদের ঢাকায় প্রবেশে বাধা দেয়। শ্রমিকরা সেখানেই অবস্থান করে সারাদিন। পুলিশের অনুরোধের পরও শ্রমিকরা ফিরে যায়নি, তারা জানায় তখনই তারা ফিরে যাবে যদি সিরাজুল আলম খান তাদেরকে ফিরে যাওয়ার কথা বলেন। পুলিশ সিরাজুল আলম খানকে পল্টনের আওয়ামী লীগ অফিস থেকে যাত্রাবাড়িতে নিয়ে আসে শ্রমিকদের বলতে তারা যেন ফিরে যায়।

আর এই হরতালে অন্যতম প্রধান ভূমিকা নেয় তেজগাঁওয়ের শ্রমিকরা। সেখানকার নেতা ছিলেন রুহুল আমিন ভূইয়া। ১৩০টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত তেজগাও ট্রেড ইউনিয়ন অ্যাসোসিয়েসনের সভাপতি ছিলেন তিনি। তিনি মজদুর ফেডারেশনেরও যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। তেজগাঁওয়ে দুইজন শ্রমিক ইপিআর-এর গুলিতে নিহত হয়, মনু মিয়া ও আবুল হোসেন। তেজগাঁওয়ের শ্রমিকরা রেল লাইন বন্ধ করে দেয়, ঢাকার মহাখালি, ফার্মগেট সড়কগুলো অবরোধ করে মগবাজার হয়ে রমনা পার্কের দিকে আসে। তেজগাওয়ে হরতালের প্রস্তুতে ছাত্রলীগ নেতারা, আব্দুর রাজ্জাক, নুর আলম সিদ্দিকি ও আব্দুল কুদ্দুস মাখনসহ আরো কয়েকজন রুহুল আমিন ভূইয়াকে সাহায্য করেন। তারা তেজগাওয়ের শ্রমিকদের মিছিল ঢাকার মগবাজারে নিয়ে আসেন। সাহসি শ্রমিকদের এই ভূমিকাই ছয় দফা আন্দোলনের নতুন গতি দেয়।

ঐতিহাসিক ৭ জুনে ৬ দফাভিত্তিক পরিচালিত আন্দোলনে মনু মিয়াসহ অপরাপর শহিদদের রক্তে রঞ্জিত রাজপথের দিকনির্দেশনাকে কারাগার থেকেও শেখ মুজিবুর রহমান যথার্থভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন এবং তাঁর একান্ত অনুগত আওয়ামী লীগ এবং ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ৬ দফার আন্দোলনকে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশনা দেন। ফলে শহীদ আসাদ, মতিউরসহ অগণিত শহীদের রক্তের সিঁড়ি বেয়ে সৃষ্ট ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে কারামুক্ত শেখ মুজিবুর রহমান জাতিপ্রদত্ত ‘বঙ্গবন্ধু’ অভিধায় ভূষিত হয়ে, পাকিস্তানি জান্তা কর্তৃক ঘোষিত লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক’ (এলএফও) আওতায়, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগ একক ও নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। পরে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা পার্লামেন্ট অধিবেশন আহ্বান করে ক্ষমতা হস্তান্তরে নানা ধরনের ছলচাতুরীর আশ্রয় গ্রহণ করে। এ ছলচাতুরির মধ্য দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক জান্তা জনতা প্রদত্ত গণরায়কে পদদলিত করে অখণ্ড পাকিস্তান রক্ষায় বাঙালির ওপর অত্যাচারের স্টিমরোলার চালাতে থাকে। পূর্ব পাকিস্তান হয়ে ওঠে অগ্নিগর্ভ। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহকর্মীরা ও পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ বাঙালির স্বাধীন আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার লড়াইকে স্বাধীনতার আন্দোলনে অর্থাৎ বাঙালি স্বাধীনতা সংগ্রামের চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করে।

২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলিত হয়। ৩ মার্চ বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে স্বাধীনতার ইশতেহার ঘোষিত হয়। বঙ্গবন্ধু কর্তৃক নির্ধারিত ও অনুমোদিত হয় জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’। ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’। শুরু হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধের রূপরেখায় মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতির দামামা। ২৫ মার্চের কালরাতে অপারেশন সার্চ লাইটের মাধ্যমে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে হাজার হাজার নিরীহ বাঙালিকে হত্যা করে সূচনা করে ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়ের। বঙ্গবন্ধু ঘোষিত স্বাধীনতার চূড়ান্ত ঘোষণা চট্টগ্রাম থেকে আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নান ঘোষণা করেন।

ঐতিহাসিক ৭ জুন বাঙালি জাতির জীবনে এজন্য গুরুত্বপূর্ণ যে, যে কোনো আন্দোলন বা সংগ্রাম বিজয়ী হওয়ার পূর্বশর্ত এই যে, রাজপথ যতক্ষণ না উত্তপ্ত হয়, শহীদের রক্তে রঞ্জিত না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো আন্দোলনই সফল হয়নি এবং কোনো জাতিই স্বাধীনতা লাভ করতে পারেনি।

আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি গণতান্ত্রিক অসাম্প্রদায়িক শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন, প্রগতিশীল মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন জাতির রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। আমরা সে পথ থেকে সরে এসেছি। আমাদের দেশে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে সামরিক হস্তক্ষেপের কারণে আমরা গণতন্ত্র নামমাত্র অর্জন করলেও গণতন্ত্রের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং গণতান্ত্রিক ধ্যান ধারনার সাথে আমরা এগিয়ে চলতে পারি নাই। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান সমূহ আমরা গড়ে তুলতে পারি নাই। যে কারণে বারবার আমাদের নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে এবং আমাদের অন্যান্য রাষ্ট্রের স্তম্ভগুলো আছে এই স্তম্ভগুলোর উপর আঘাত আসে। এখন বর্তমান সময়ে ৭ই জুন যখন পালন করতে যায়, ৭ই জুনের এই ঐতিহ্যের মধ্যে দেখা যায় যে এবার পৃথিবী করোনা আক্রান্ত উন্নত দেশগুলো যেমন- আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, চীন, স্পেন, ইতালি এই সমস্ত রাষ্ট্র প্রায় বিপর্যস্ত। ছোটখাট রাষ্ট্রগুলোও বিপর্যস্ত, আমাদের পার্শ্ববর্তী ভারত ও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, আমাদের উপরেও করোনা আঘাত চলছে! ভেঙে পড়তে পারে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, ভেঙে পড়তে পারে সমস্ত সামাজিক মূল্যবোধ ও ব্যবস্থা!

এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে নতুন পৃথিবীকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হইলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা চিন্তা করি বা ৭ জুনের শহীদদের আত্নদানের কথা চিন্তা করি তাহলে আমাদের নতুন করে ভাবতে কূপমন্ডুকতা, গোঁড়ামি বা অহংবোধ নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিকে মোকাবেলা করা যাবে না। এখানে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের যত চিন্তা চেতনার শক্তি আছে, প্রগতিশীল শক্তি আছে সবাইকে চিন্তা করতে হবে আগামীর ভবিষ্যত নিয়ে, আগামীর পৃথিবী নিয়ে। শুধু দেশ নয় আমাদের সামনের দিকেও চিন্তা করতে হবে। তাই এবারের ৭ জুন সবাই আমরা চিন্তা করি মুজিববর্ষে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব চিন্তা করেছিলেন একটা শোষণ মুক্ত সমাজের লড়াই সেই শোষণ মুক্ত সমাজের দিকে যেন আমরা এগিয়ে যেতে পারি।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)