চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সেলিম ভাইয়ের উজ্জ্বলতা

মানুষ স্বজন হারায়। অপ্রস্তুত বিদায় জানাতে হয় বন্ধু ও সহকর্মীকে। অনেক সময় অন্যের মৃত্যুর মতো বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে মানুষ সাহসীও হয়ে ওঠে। কখনো ভেঙে পড়া থেকে নিজেকে ঠেকানো দায় হয়ে ওঠে। আমার মনে হয় প্রত্যেকেই প্রিয়জনের মৃত্যুকে সহ্য করার জন্য একধরনের মানসিক অবস্থানের অনুশীলন করে থাকে। আবার পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে দেখে সে অবস্থান ভুল ছিল।

২০০৮ এর ১৪ জানুয়ারি নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন মারা গেলেন। ঠিক পরদিন সেলিম নামে আমার এক বন্ধু সহকর্মী মারা গেলেন। সেলিম আল দীন আর আমাদের সেলিম ভাইয়ের ইহকালীন ওজনের বিপুল তারতম্য ছিল। সেলিম আল দীন নাট্যসাহিত্য, সংস্কৃতি ও বাঙালি মননের এক দিকপাল ছিলেন। তার প্রতি সবসময় আমাদের প্রণতি। তার সঙ্গে আমার দুয়েক টুকরো স্মৃতি আছে। ২০০৫ সালের কথা। চ্যানেল আই’র হৃদয়ে মাটি ও মানুষ অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় বর্ষে পদার্পণ উপলক্ষে একটি বিশেষ প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করা হচ্ছে। তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, একটি ইন্টারভিউয়ের জন্য। অনেক কথা বলার সুযোগ হলো। অনুষ্ঠানের পাণ্ডুলিপি দেখে তিনি খুশী হলেন। আমাকে প্রাণভরে আশির্বাদও করলেন।

অন্য যে সেলিমের কথা বলছি, তিনি ছিলেন একজন প্রেসম্যান। কুষ্টিয়ার দৈনিক আন্দোলনের বাজার পত্রিকার পেস্টার। লেটারপ্রেস যুগের মানুষ। লেটার প্রেসের কম্পোজিটর ছিলেন। কুষ্টিয়ায় ‘সাপ্তাহিক ইস্পাত’ যুগের সংবাদকর্মী তিনি। সংবাদ বিষয়ক মনোজগত গড়েছিলেন ইস্পাত সম্পাদক, প্রখ্যাত সাংবাদিক-সম্পাদক ওয়ালিউল বারী চৌধুরির কাছ থেকে। সেলিমের সঙ্গে আমার পরিচয় কুষ্টিয়া কোর্টপাড়ার লাকী প্রেস থেকে ১৯৯০ সালে। লাকী প্রেসের স্বত্তাধিকারী ছিলেন আমার বন্ধু খাইরুলের বাবা। ওই প্রেসে গিয়েছিলাম ‘নিরিখ’ পত্রিকা প্রকাশের জন্য। ৮০’র দশকের গোড়ার দিক থেকে প্রকাশিত পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন আমার বড় ভাই মুনশী সাঈদ। ১৯৯০ সালে একটি সংখ্যা আমি সম্পাদনা করলাম। লেটার প্রেসে ছাপতে গিয়ে প্রেসের কয়েকজন মানুষের সঙ্গে নিবিড় সখ্য হলো। তার মধ্যে অন্যতম সেলিম ভাই।

তাকে সহকর্মী হিসেবে পেলাম ১৯৯৬ সালে আন্দোলনের বাজারে গিয়ে। লেটার প্রেসের যুগ বিদায় নিচ্ছে তখন। আন্দোলনের বাজার আগে ভাগে অফসেট প্রেসে চলে গেছে। নিজেদের অফসেট প্রেস। বগুড়ার রফিক প্রেসম্যান। সম্পাদক মনজুর এহসান চৌধুরী দিনের পর দিন তালিম দিয়ে অনেকজনকে তৈরি করেন। তাদের একজন সেলিম ভাই। আগে-পরে অনেকজন কাজ করতে করতে বিদায় নেন। সেলিম ভাই এক স্থায়ী কর্মী হয়ে ওঠেন। শত ঝড় ঝাপটা সামলান। খেয়ে না খেয়ে পত্রিকা করেন। মনে আনন্দ নিয়ে সংবাদপত্র অফিসকেই জীবনের শেষ ও একমাত্র স্টেশন ভাবেন। বাকি সবকিছুই তার কাছে গৌণ। ম্যাকেনটোশ কম্পিউটারের এমএস ওয়ার্ডে হেডলাইন তৈরি করেন। পেজ মেকাপ দেন। তারপর ট্রেসিং প্রিন্ট দিয়ে পেস্টিং করতে লেগে যান। অসাধারণ এক দক্ষ কর্মী হয়ে ওঠেন। পত্রিকার কারিগরী কাজ সবই একা সামলান। বিকেলে শুরু হয় তার কর্মঘণ্টা। সূর্য ডোবে তার মগ্নতা বাড়ে। রাত গভীর হয়, তার কাজের অস্থিরতা তৈরি হয়। ওই অস্থিরতাটাই উপভোগ করতে থাকেন। আমি আন্দোলনের বাজারে যুক্ত হয়ে সম্পাদক থেকে শুরু করে সব সহকর্মীর গভীর বন্ধুত্ব, স্নেহ ও ভালোবাসা পেতে থাকি। চোখের পলকেই পত্রিকাটির কর্মগভীরতায় নিবিড় এক সৈনিক হিসেবে তৈরি হওয়ার মতো উপযুক্ত পরিবেশ ছিল। অপরিসীম বিনোদন আর কর্ম স্বাধীনতা ছিল।

সেলিম ভাইয়ের বন্ধুত্ব ছিল নির্ভেজাল। স্বার্থ ও উদ্দেশ্যহীন। আমাকে বলতেন, ‘প্রাইভেট চাকরিতে যতটুকু ফাঁকি দেবেন, ততটুকুই লাভ।’ এই সূত্র জানতেন বটে, কিন্তু কোনোদিন তাকে ব্যবহার করতে দেখিনি। আমরা কখনো রাতে ঘুমাতাম না। বিকেল বা সন্ধ্যায় নিউজের কাজ শুরু করে পত্রিকা প্রকাশ হওয়ার পর সূর্যের মুখ দেখে ঘরে ফিরতাম। রাত জাগতে জাগতে রাতের নেশায় পেয়েছিল আমাদের। দিনে অপেক্ষায় থাকতাম, তখন সূর্য ডোবে।

বিজ্ঞাপন

প্রকৃতি প্রতিটি মানুষের তারুণ্যে কিছূ সঙ্গলাভ ঘটিয়ে দেয়। সেটি মানুষের জীবনবোধ গঠনে ভূমিকা রাখে। এই সেলিম ভাইয়ের সঙ্গে রাতের পর রাত কাজ, গল্প, আড্ডা আর পারস্পািরিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের অজশ্র স্মৃতি আজও আমার কাছে জীবনের পৃথক এক অনুরণন। বিশ্বাস জাগায়, প্রতিটি সময়ই জ্ঞান-লাভের সময়।

জীবনের কিছু কদর্য দিক আছে। সেটি হচ্ছে নতুন সময়ের ওপরের আস্তরণ কিছুটা আড়াল করে পুরোনো সময়কে। আমরা নতুনের আবাহন করি, পুরাতনকে জীর্ন গণ্য করে। আমি ঢাকা এসে নতুনতর রাতের গল্পের ভেতর ঢুকে যাই। সেখানে দৈনিক সূত্রপাত আর আন্দোলনের বাজার পত্রিকা আমার ভিত্তিমূল হয়ে শক্তি যোগাতে থাকে। সেলিম ভাইয়ের কর্মোদ্দীপনা ও জীবনকে উদযাপন করার কৌশলগুলো আমাকেও প্রাণিত করতে থাকে। কিন্তু হায়, সেলিম ভাই তার মতো ডুবে যেতে থাকেন কর্মগভীরে, আমি আমার মতো। এর মধ্য গড়ে উঠতে থাকে একটি বিচ্ছিন্নতার প্রাচীর। যখন কুষ্টিয়া যাই, তখন সেলিম ভাইয়ের সঙ্গে সন্ধ্যারাতে বাসে ওঠার আগে আগে আধাঘণ্টার আড্ডায় মেতে উঠি। আবার বাসে উঠে পেছনে ফেলে আসি প্রাণের কুষ্টিয়া।

তারও পরে পেরিয়েছে বহু পথ। ২০০৮ সালের জানুয়ারি মাসের ১০ তারিখের দিকে সেলিম ভাই ফোন করলেন। বললেন, ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হয়েছেন। বললাম, একদিন আসবো। আমার সঙ্গে দেখা না করে চলে যাবেন না কিন্তু ! ১৪ তারিখে ফোনে কথা হলো। আমি নরসিংদী থেকে শুটিং শেষে ফিরছিলাম। সেলিম আল দীনের মৃত্যু সংবাদ শুনলাম। বললাম, আজ একজন সেলিম মারা গেছেন। তিনি কিন্তু আপনি না। আপনার কিছু হবে না। সুস্থ হয়ে যাবেন। দুয়েকদিনের মধ্যে দেখা হবে। পরদিন সকালে সেলিম ভাই মারা গেলেন।

তার ছেলে ফোন করেছিল। ছেলের কণ্ঠ বাবার মতোই। হ্যালো বলে, সেলিম ভাইয়েরই সুস্থতাপূর্ণ কণ্ঠস্বরে এক পলকের জন্য চঞ্চল হয়ে উঠেছিলাম। কিন্তু পরের বাক্যেই অচেনা অন্ধকারে সেলিম ভাইয়ের মুখটা ভেসে উঠলো। শুধু মনে হলো আর দেখা হবে না। গতকাল থেকেই খুব মনে হচ্ছে সেলিম ভাইকে। কয়েকটি কর্মক্ষেত্রের কয়েকজন প্রিয় সহকর্মী বন্ধুকে হারিয়েছি। সবাই সবার মতো উজ্জ্বল। দ্রুত চলে যাওয়া মানুষগুলোর এই উজ্জ্বলতার সঙ্গে অন্য কোনো উজ্জ্বলতা মেলে না।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন