চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সেই মুক্তিযোদ্ধাদের চিঠি দিয়ে দুঃখপ্রকাশ করুক মন্ত্রণালয়

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রকাশিত রাজাকারের তালিকায় গেজেটভুক্ত ও ভাতাপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাসহ একাধিক মুক্তিযোদ্ধার নাম এসেছে। ওই তালিকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের প্রসিকিউটর, বঙ্গবন্ধুর সহচর ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকেরা অন্তর্ভূক্ত হয়েছেন৷ এ নিয়ে দেশজুড়ে নিন্দার ঝড়৷ ইতোমধ্যে অবশ্য এই তালিকা স্থগিত করা হয়েছে। এছাড়া এমন অনাকাঙ্খিত ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী দুঃখপ্রকাশ করেছেন।

বরিশাল বিভাগে রাজাকারের তালিকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকের জনের নাম উঠে এসেছে। এদের মধ্যে কেউ ভাষা সৈনিক কেউ মুক্তিযোদ্ধা বলে জানা গেছে৷ এই তালিকার মধ্যে মিহির লাল দত্ত ভাষা সৈনিক ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, তপন কুমার চক্রবর্তী গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা৷ বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলায় ৩০ জনের মধ্যে আওয়ামী লীগের সাবেক এমপিসহ মুক্তিযোদ্ধাদের নাম রয়েছে।

রাজাকার হিসেবে তাদের নাম অন্তর্ভূক্ত হওয়ায় আদমদীঘিবাসীরা স্বাভাবিকভাবেই হতবাক হয়েছেন। এই তালিকার বিরুদ্ধে কথা বলছে বামদলসহ খোদ আওয়ামী লীগের নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডাররাও৷ বিজয় দিবস উপলক্ষে আয়োজিত মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা সভায় আদমদীঘিতে অনেকে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন৷ বিজয় দিবসের আলোচনায় তারা অবিলম্বে ওই তালিকা থেকে তাদের নাম বাদ দেয়ার দাবি জানান।

তারা বলেন , উদ্দেশ্য প্রনোদিতভাবে এই রাজাকারের তালিকা করা হয়েছে। তাদের প্রশ্ন, যারা আওয়ামী লীগের সংগঠক এবং যুদ্ধকালীন কমান্ডার তাদের নাম কীভাবে রাজাকারের তালিকায় আসে? এখন আমাদেরও প্রশ্ন একথা সত্য হলে কী সে উদ্দেশ্য? এই উদ্দেশ্যবাজ কারা? আর এদের উদ্দেশ্যটা কী? মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ সৃষ্টি করতে এই বিতর্কিত তালিকা প্রকাশের দায় কার? মিথ্যাচারে ঠাসা অবান্তর ও হাস্যকর তালিকার সমালোচনায় এখন অবশ্য আওয়ামী লীগ, বিএনপি, বাম ও সুশীল সমাজ সকলেই৷

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হতে মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাজশাহী সফরে এসে উঠেছিলেন অ্যাডভোকেট আবদুস সালামের বাড়িতে। এ বাড়িতে বসেই তিনি নানা দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। এই আব্দুস সালামের নামও রাজাকারের তালিকায়৷বাসদ নেত্রী ডা. মনীষা চক্রবর্ত্তী তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেন: ‘মানুষের জন্য নিঃস্বার্থ কাজ করার পুরস্কার পেলাম আজ। ধন্যবাদ আওয়ামী লীগকে। সদ্য প্রকাশিত রাজাকারদের গেজেটে আমার বাবা এবং ঠাকুমার নাম প্রকাশিত হয়েছে।আমার বাবা অ্যাডভোকেট তপন কুমার চক্রবর্ত্তী একজন গেজেটেড মুক্তিযোদ্ধা। ক্রমিক নম্বর ১১২, পৃষ্ঠা ৪১১৩। তিনি নিয়মিত মুক্তিযোদ্ধা ভাতাও পেয়ে থাকেন! আজ রাজাকারের তালিকায় তিনি ৬৩ নম্বর রাজাকার।আমার ঠাকুরদা অ্যাডভোকেট সুধির কুমার চক্রবর্ত্তীকে পাকিস্তানি মিলিটারি বাহিনী বাসা থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে। তিনিও ভাতাপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃত। তার সহধর্মিণী আমার ঠাকুমা উষা রানী চক্রবর্ত্তীকে রাজাকারের তালিকায় ৪৫ নম্বরে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।’

কারা করলো এই তালিকা? মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত কথিত রাজাকারের তালিকায় রাষ্ট্র স্বীকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের নাম থাকা নিয়ে বিতর্কের মধ্যে আরও জানা গেলো ওই তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মো. মজিবুল হকের (নয়া ভাই) নাম। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যাকে হক চাচা বলে সম্বোধন করতেন। মজিবুল হক ১৯৮৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে (পাথরঘাটা-বামনা) সংসদীয় আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনেও অংশ নিয়েছিলেন৷ জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তির পক্ষে কাজ করে গেছেন। ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত তিনি পাথরঘাটা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন৷ আসলে কী ঘটতে চলছে দেশে? প্রখ্যাত সাংবাদিক-কলামিস্ট আব্দুল গাফফার চৌধুরী বলেছেন, আওয়ামী লীগের মধ্যে জামায়াতের অনুপ্রবেশকারী রয়েছে। তারা সরকারের বড় বড় পদে রয়েছেন, তাদের কথা বললে হয়তো আমাকে আর দেশে আসতে দেওয়া হবে না। রাজাকারের তালিকা প্রকাশ করার আগে এসব অনুপ্রবেশকারীর তালিকা প্রকাশের প্রয়োজন ছিল। জানি না কোনো রাজাকারের হাত দিয়েই ‘রাজাকারের তালিকা’ হচ্ছে কি-না।

বিজ্ঞাপন

আব্দুল গাফফার চৌধুরীর বক্তব্যের যথার্থতা তুলে ধরেছে এই তালিকা। এই অনুপ্রবেশকারীদের দলে এবং প্রশাসনে এতই শক্তি যে তাদের বিরুদ্ধে কথা বললে গাফফার চৌধুরীর মত ব্যক্তি দেশে আসতে পারবে না৷ সরকারের বড় বড় পদে বসে তারা সরকারকেই সমালোচনার মুখে ফেলে দিচ্ছে! এত শক্তি কিভাবে অর্জন করলো তারা?

রাজাকারের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধার নাম থাকার বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, ‘আমরা নিজেরা কোনো তালিকা প্রস্তুত করিনি। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিরা যে তালিকা করেছে, আমরা শুধু তা প্রকাশ করেছি। সেখানে কার নাম আছে, আর কার নাম নেই সেটা আমরা বলতে পারব না।’ পরবর্তিতে রাজাকারের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধার নাম আসায় তিনি ক্ষমা চেয়েছেন। তিনি এও বলেছেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে যা পেয়েছি তাই প্রকাশ করা হয়েছে৷ আবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘রাজাকারদের তালিকার বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে নোট দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা তা সংশোধন করেনি। তাদের আরো যাচাই-বাছাই করা উচিত ছিল৷’

এখন মানুষ কোন মন্ত্রীর কথা বিশ্বাস করবে? আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বলছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যুদ্ধাপরাধের তালিকা চাইলেও তারা তা দেয়নি৷

আর তালিকা করতে পাকিস্তানকে অনুসরণ করার বিষয়টা কোন ধরনের যুক্তি হল? এখন আবার বলা হচ্ছে ভুল সংশোধনের আবেদন করতে৷ এ কথা বলতে যে আমি রাজাকার নই৷ মুক্তিযোদ্ধারা নিজেরা মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার জন্য আবেদন করেছে৷ কিন্তু রাজাকারের বেলায় কি তা সম্ভব? কেউ কি আবেদন জমা দেবে তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হওয়ার জন্য? ভুল করেছে মন্ত্রণালয় দায় নেবে কেন ভূক্তভোগীরা?মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ হতে কি উল্টো তাদেরকেই দুঃখ প্রকাশ করে চিঠি দেয়া উচিত নয়?মন্ত্রণালয় কি এমন একটি চিঠি লেখার দায়িত্বও পালন করতে পারে না? মুক্তিযোদ্ধাদের ভুয়া তালিকা হয়েছে অর্থের বিনিময়ে৷ টাকা দিয়ে অনেক অমুক্তিযোদ্ধার মুক্তিযোদ্ধা হয়ে ওঠার অভিযোগ দৃশ্যমান হয়েছে৷

সেই সমালোচনা চালু থাকা অবস্থাতেই এবার করা হল রাজাকারের ক্রুটিপূর্ণ তালিকা৷ কেন বারবার মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে? যেখানে প্রধানমন্ত্রী নিজে ওই তালিকায় নাম আসা মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে দুঃখপ্রকাশ করেছেন, সেখানে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী কি পারেন না চিঠি দিয়ে দুঃখপ্রকাশ করে তাদের ক্ষত কিছুটা কমাতে? সরকারের উচিত, এমনটি কেন ঘটল তার যথার্থ কারণ অনুসন্ধান ও প্রতিকার৷ এ ঘটনায় আবারও সামনে এসেছে জামাতী চক্রের সক্রিয় থাকার বিষয়৷ কিন্তু তারা প্রশ্রয় পাচ্ছে কীভাবে? বিষয়টা হেলাফেলার নয়, অতি গুরুত্বের৷

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

শেয়ার করুন: