চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সেই কামরুন্নাহারের ফৌজদারী বিচারিক ক্ষমতাও থাকলো না

সম্প্রতি বিচারিক দায়িত্ব থেকে সাময়িকভাবে প্রত্যাহার হয়ে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত মোছা. কামরুন্নাহারের ফৌজদারী বিচারিক ক্ষমতা কেড়ে (সিজ) নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত।

প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের ৫ বিচারপতির ভার্চুয়াল বেঞ্চে আজকের কার্যতালিকার ১ নম্বরে ‘রাষ্ট্র বনাম আসলাম সিকদার’ মামলাটি আদেশের জন্য আসে।

এই মামলাকে কেন্দ্র করেই আজ সোমবার সকাল সাড়ে নয়টার দিকে আপিল বিভাগে হাজির হন রেইনট্রি মামলার রায়ের পর তীব্র সমালোচনার মুখে বিচারিক দায়িত্ব থেকে সাময়িক প্রত্যাহার হওয়া বিচারক মোছা. কামরুন্নাহার। এক পর্যায়ে আজকের বিচারিক কার্যক্রম শুরুর আগে আদালত কক্ষ থেকে গণমাধ্যমকর্মী, আইনজীবী ও আদালতের কর্মকর্তাদের বাইরে বের করে দেওয়া হয়। এরপর রুদ্ধদ্বার আদালত থেকে বেলা ১১টার দিকে বের হন বিচারক কামরুন্নাহার।

পরে বেলা সাড়ে তিনটায় সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন থেকে দেয়া প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘‘আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগে বর্তমানে সংযুক্ত থাকা ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭ এর সাবেক বিচারক বেগম মোছা: কামরুন্নাহার আজ সকাল ৯:৩০ মিনিটে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে উপস্থিত হন। আপিল বিভাগ আজকের কার্যতালিকার ১ নম্বরে থাকা (‘রাষ্ট্র বনাম আসলাম সিকদার’) মামলার শুনানি করে তার ফৌজদারী বিচারিক ক্ষমতা সিজ (seize) করার আদেশ প্রদান করেন। এবিষয়ে পূর্ণাঙ্গ রায় পরবর্তীতে প্রকাশ করা হবে।’’

এর আগে ধর্ষণের অভিযোগে করা মামলায় ২০১৯ সালের ১৮ জুন হাইকোর্ট থেকে জামিন পান বেসরকারি একটি টেলিভিশনের সাবেক অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপক আসলাম সিকদার। ওই জামিন আদেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে আবেদন করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে চেম্বার আদালত ওই বছরের ২৫ জুন জামিন স্থগিত করে বিষয়টি আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য পাঠান।

আবেদনটি আপিল বিভাগে বিচারাধীন থাকা অবস্থায় গত বছরের ২ মার্চ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭ ওই আসামিকে জামিন দেন। সর্বোচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের পরও আসামিকে জামিন দেওয়ার বিষয়টি আদালতের নজরে আনে রাষ্ট্রপক্ষ। এরপর আপিল বিভাগ এবিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে মোছা. কামরুন্নাহারকে তলব করেন।

বিজ্ঞাপন

ওই বছরের ২ এপ্রিল তাকে আপিল বিভাগে আদালতে হাজির হতে নির্দেশ দেন। সেই সঙ্গে আসলাম সিকদারকে দুই সপ্তাহের মধ্যে বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণ করতে নির্দেশ দেয়া হয়। এর আগে ২০১৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ধর্ষণের অভিযোগে আসলাম সিকদারের বিরুদ্ধে হাতিরঝিল থানায় মামলা হয়। সে মামলায় ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৫ এর দেয়া রায়ে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় আসলাম সিকদারকে খালাস দেয়া হয়। তবে খালাসের ওই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ।

এদিকে চার বছর আগে বনানীর রেইনট্রি হোটেলে দুই তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগে করা মামলায় ১১ নভেম্বর রায় দেন ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭-এর বিচারক মোছা. কামরুন্নাহার। ওই রায়ে পাঁচ আসামির সবাইকে খালাস দেওয়া হয়। খালাস পাওয়া পাঁচজন হলেন আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে সাফাত আহমেদ, তার বন্ধু সাদমান সাকিফ, নাঈম আশরাফ, সাফাতের দেহরক্ষী রহমত আলী ও গাড়িচালক বিল্লাল হোসেন।

আলোচিত এই রায়ের পর আইনজীবীদের বরাতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয় যে, ‘রায় ঘোষণার সময় বিচারক এই পর্যবেক্ষণে বলেছেন, ধর্ষণের অভিযোগের ক্ষেত্রে ঘটনার ৭২ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলে পুলিশ যেন মামলা না নেয়।’

এমন খবরের পর রায়ের ওই পর্যবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে। একপর্যায়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আমি উনার (বিচারকের) রায়ের বিষয়বস্তু নিয়ে এখন কথা বলতে চাই না। কিন্তু উনার যে (অবজারভেশন) পর্যবেক্ষণ ৭২ ঘণ্টা পরে পুলিশ যেন কোনো ধর্ষণ মামলার এজাহার না নেয়, এটি সম্পূর্ণ বেআইনি ও অসাংবিধানিক। এজন্য বিচারক হিসেবে তার দায়িত্ব পালন নিয়ে যেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেজন্য আগামীকাল (রোববার) প্রধান বিচারপতিকে একটি চিঠি লিখছি।’

পরদিন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ বিচারপতিদের সাথে আলোচনাক্রমে ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭ এর বিচারক বেগম মোছা: কামরুন্নাহারকে সকাল ৯টা ৩০ মিনিট থেকে আদালতে না বসার নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানায় সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। পরবর্তীতে এই বিচারককে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করে আইন মন্ত্রণালয়।

এরপর রেইনট্রি মামলার ৪৯ পৃষ্ঠার লিখিত রায়ে দেখা যায় ধর্ষণের অভিযোগের ক্ষেত্রে ঘটনার ৭২ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলে পুলিশ যেন মামলা না নেয়, সে–সংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা বা পর্যবেক্ষণ পাওয়া যায়নি।

তবে লিখিত রায়ে ৭২ ঘণ্টার প্রসঙ্গ এনেছেন মোছা. কামরুন্নাহার। যেখানে বিচারক লিখেছেন, ‘এই ট্রাইব্যুনাল বহু ধর্ষণ মামলা দেখেছেন। প্রাপ্তবয়স্ক ও যৌনজীবনে অভ্যস্ত নারী বিচারের জন্য আসেন, যেখানে কথিত অপরাধ সংঘটিত হওয়ার অনেক দিন পর তাদের মেডিকেল পরীক্ষা হয়েছে। অনেক দিন পর মামলা হলে যৌন সহিংসতার প্রমাণ পাওয়া যায় না। মামলা করার সময় যদি বিষয়টি দেখা হয়, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে যদি মেডিকেল পরীক্ষা করা হয় (যেমনটি বহু মামলায় চিকিৎসকেরা মতামত দিয়েছেন) এবং ফরেনসিক পরীক্ষায় যদি প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে ধর্ষণ মামলায় তা গুরুত্বপূর্ণ নথি বলে গণ্য হয়। তখন ধর্ষণ মামলার অভিযুক্ত ব্যক্তির বিচার নিশ্চিত করা যায়। এবং ন্যায়বিচার সর্বোত্তমভাবে করা সম্ভব হয়।’

বিজ্ঞাপন