সাহরী আরবী শব্দ যা ‘সাহর’ শব্দ থেকে উদ্ভুত। এর অর্থ রাতের শেষাংশ, শেষ তৃতীয়াংশ বা ভোর রাত। পরিভাষায় রোজা পালনার্থে মুমিন বান্দা শেষ রাতে ফজরের পূর্বে যে খাবার গ্রহণ করে থাকেন, তাকে সাহরী বলা হয়। রোজা রাখার নিমিত্তে এ খাবার গ্রহণ করা সুন্নাত। রাসূলুল্লাহ সা. সদা-সর্বদা রোজার উদ্দেশ্যে সাহরী খেয়েছেন এবং তাঁর প্রিয় উম্মতকে তা গ্রহণ করতে উৎসাহিত করেছেন। হাদীস শরীফে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, ‘তোমরা সাহরী খাও। কেননা, সাহরীতে বরকত রয়েছে।’ (বুখারী: ১৭৮৯) অন্য হাদীসে রয়েছে, নবী পাক সা. বলেন, ‘আমাদের ও ইহুদী-নাসারাদের রোজার পার্থক্য হলো সাহরী খাওয়া।’ (মুসলিম: ২৬০৪) সাহরীর গুরুত্ব প্রদান করতে গিয়ে রাসূল সা. আরও বলেছেন, ‘এক ঢুক পানি দিয়ে হলেও সাহরী গ্রহণ করো।’ (ইবনে হিব্বান: ৩৪৭৬) সাহরী খাওয়ার ফজিলত সম্পর্কে রাসূল সা. আরও বলেন, ‘সাহরী খাওয়া বরকতময় কাজ। এটা ত্যাগ করো না, যদি এক ঢুক পানি দিয়েও হয় তা গ্রহণ করো। নিশ্চয় আল্লাহ এবং তাঁর ফেরেশতারা সাহরী গ্রহণকারীদের জন্য রহমত বর্ষণ করেন।’ (মুসনাদে আহমদ: ১১১০১)
সাহরীর এ বিধানটি আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে মুমিন বান্দার প্রতি তাঁর এক বিশেষ নিয়ামত। হাদীস শরীফ থেকে জানা যায়, ইসলামের প্রাথমিক যুগে নিয়ম ছিলো যদি কোনো মুসলমান ইশার পর ইচ্ছায়-অনিচ্ছায়, কিছু খেয়ে বা না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লেই রোজা শুরু হয়ে যেত। শেষ রাতে জাগ্রত হলেও আর খাওয়া-দাওয়া বা স্ত্রী সহবাসের কোনো সুযোগ ছিল না। উমর রা. একবার ইশার পর তাঁর স্ত্রীর সাথে মিলিত হলেন অন্যদিকে আরেক সাহাবী সিরমা ইবনে কায়েস রা. মাগরীবের পর পর কিছু না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন, রাসূল সা. ইশার নামাজ আদায় করে নিলেন কিন্তু তিনি জাগ্রত হতে পারলেন না। পরবর্তীতে জেগে খাওয়া-দাওয়া করলেন। ভোরে রাসূলুল্লাহ সা.–এর কাছে সমাধান জানতে চাইলে আল্লাহ পাক আয়াত নাযিল করলেন, ‘খাও, পান করো ফরজের কালো রেখা থেকে সাদা রেখা স্পষ্ট হওয়া পর্যন্ত।’ (সূরা বাকারা: ১৮৭, তাফসীরে ইবনে কাসীর: ১/৫১১) তাই সাহরী খাওয়ার এ সুযোগ আল্লাহর এ বিরাট নিয়ামত ও অনুগ্রহ। তখন থেকে মুমিন-মুসলমানরা শেষ রাতে জেগে সাহরী খেতেন। এতে সারা দিন না খেয়ে থাকার এক সঞ্জীবনী শক্তি পাওয়া যায়। এ প্রসঙ্গে নবী পাক সা. ইরশাদ করেন, ‘তোমরা সাহরী খাওয়ার মাধ্যমে দিনে রোজা রাখার শক্তি অর্জন করো আর দিনে হালকা ঘুমের মাধ্যমে রাত জেগে ইবাদত করার শক্তি অর্জন করো।’ (ইবনে মাজা: ১৬৯৩) তাইতো রাসূলে আকরাম সা. সাহাবীদেরকে ডেকে বলতেন, ‘তোমরা বরকতময় খাবারের দিকে এগিয়ে আসো।’ (আবূ দাউদ: ২৩৪৬)
সাহরী পেট পূরে খাওয়া জরুরি নয়; বরং যে কোনো খাবার দিয়ে সাহরী গ্রহণ করা যেতে পারে। হাদীস শরীফে রয়েছে, রাসূল সা. ইরশাদ করেছেন, ‘মুমিনের জন্য খেজুর কতই না উত্তম সাহরী।’ (আবূ দাউদ: ২৩৪৭) অর্থাৎ সাহরী খেতে গিয়ে খুব ভালো মতো না খেলে তা হবে না, এমনটা মনে করা যাবে না। আবার মনে রাখতে হবে এটা সুন্নাত। যদি কেউ সময় মতো জাগতে না পারেন এমনকি ফজরের ওয়াক্ত হয়ে যায়, তাহলে সাহরী গ্রহণ করতে না পারার অজুহাতে রোজা ছেড়ে দেয়াও যাবে না। ঘুম থেকে জেগে সাহরীর সময় শেষ হওয়ার পূর্বে যদি একটু পানিও পান করা যায়, তবে তাই করতে হবে এবং তাতে সুন্নাত আদায় হয়ে যাবে। ইনশা আল্লাহ। সাহরীর সময় একটু আগে আগে জাগ্রত হয়ে তাহাজ্জুদের অভ্যাসও করে নেওয়া যেতে পারে। এটা এক অপূর্ব সুযোগ, যা সাহরীকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়।
নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বে বিলম্ব করে সাহরী খাওয়া সুন্নাত। রাসূলে আকরাম নিজে বিলম্বে সাহরী গ্রহণ করতেন। যেমন তিনি বলেছেন, ‘আমরা নবীদের দল। আমরা সময়ের পূর্বে বিলম্বে সাহরী করার এবং সময় হওয়ার সাথে সাথে দ্রুত ইফতার করার ব্যাপারে আদিষ্ট হয়েছি।’ (দারা কুতনী: ১০৯৬) অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, ‘যত দিন এ উম্মত বিলম্বে সাহরী খাবে আর দ্রুত সময়ের সাথে সাথে ইফতার করবে, ততদিন তারা কল্যাণের মধ্যে থাকবে।’ (মুসনাদে আহমদ: ২১৫৪৬) তবে কোনো ভাবেই ফজর উদিত হওয়ার পর আর কিছু খাওয়া যাবে না। যদি কেউ ফজর হয়নি মনে করে এর পর কিছু খান, তবে তার সে রোজা হবে না; বরং তা কাযা করতে হবে। অর্থাৎ তদস্থলে আরেকটি রোজা রমজানের পর আদায় করতে হবে। তাই ফজর উদিত হওয়ার সন্দেহ হলে সাহরী গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে হবে। কেননা, রাসূল সা. বলেছেন, ‘যা তোমাকে সন্দীহান করে, তা ছেড়ে যা নিশ্চিত তার দিকে প্রত্যাবর্তন করো।” (তিরমিজী: ২৫১৮)
আরেকটি বিষয় না বললেই নয়। অনেকে সাহরীকে সেহরী বলে থাকেন, যা অনুচিত। কেননা, আরবীতে যবর, যের বা পেশের কারণে অর্থের পরিবর্তন হয়ে যায়। সাহরী (যা আরবীতে সীন অক্ষরে যবর দিয়ে উচ্চারণ করতে হয়) অর্থ শেষ রাতের খাবার। আর সেহরী (যা আরবীতে সীন অক্ষরে যের দিয়ে পড়া হয়) অর্থ হলো জাদু, তন্ত্র-মন্ত্র পাঠ ইত্যাদি। আল্লাহ পাক আমাদেরকে রমজানের সমস্ত সাওয়াবের আমল করার এবং এগুলো থেকে কল্যাণ অর্জনের তাওফীক দিন। আমীন।
লেখক : মাওলানা মোহাম্মদ বদরুজ্জামান রিয়াদ







