চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সাহরি ও ইফতার: পূর্ণাঙ্গ আলোচনা

সাহরি ও ইফতার পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। সাহরির মাধ্যমে রোজার প্রস্তুতি এবং ইফতারের মাধ্যমে সমাপ্তি। শুরু এবং শেষের এ দুটি পর্যায়ের রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব ও ফজিলত। আলোচনা হবে সে সব বিষয়কে সামনে রেখে।

সাহরি
আরবি ‘সাহরি’ শব্দের অর্থ ‘ভোর রাতের খাবার’। রোজা রাখার উদ্দেশে রাতের শেষাংশে আহার করার নামই সাহরি।

বিজ্ঞাপন

সাহরির রীতি
ইসলামের প্রাথমিক যুগে সাহরির রীতি ছিল ভিন্ন। কেউ রাতে ঘুমিয়ে পড়লে উঠে আবার খাবার অনুমতি ছিল না। খেতে হতো ঘুমানোর পূর্বে। ঘুমিয়ে পড়লেই রোজা শুরু। আর খাওয়ার অনুমতি নেই।

বিজ্ঞাপন

কীভাবে এলো অনুমতি
হজরত সারমাহ ইবনে কায়েস রা.। প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একজন সাহাবি। একদা রোজা রাখা অবস্থায় সারাদিন কাজ করেছেন। সন্ধ্যাকালে ঘরে এসে খাবার চায়লেন। তাঁর স্ত্রী সালামা রা. খাবাব প্রস্তুতিতে মনোযোগ দিলেন। ক্লান্ত শরীরে সাহাবি শুয়ে পড়লেন। খাবার প্রস্তুত হতে হতে এসে গেল ঘুম। ব্যস, খাওয়া বন্ধ। ঐ অবস্থায় রোজা রেখে দিলেন পরদিন। দিনের অর্ধেক যেতে না-যেতেই ক্ষুধায় বেহুশ। দয়াময় আল্লাহর দয়ার সাগরে ঢেউ ওঠলো। নবিজির উপর আয়াত নাজিল হলো—
“তোমরা খাও এবং পান করো, যতক্ষণ না কালো রেখা(রাতের অন্ধকার) থেকে সকালের সাদা রেখা(সুবহে সাদিক) প্রকাশ পায়। আর রোজা পূর্ণ করো রাত না-আসা পর্যন্ত।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৭)।

ইফতার
আরবি ‘ইফতার’ শব্দের অর্থ ‘ভঙ্গ করা, নিষ্কৃতি লাভ করা’। সূর্যাস্তের পরপর কোনোকিছু খেয়ে রোজা ভঙ্গ করাকে বলা হয় ইফতার। সুতরাং কেউ যদি সূর্যাস্তের পূর্বে খেয়ে ফেলে, তবে তার রোজা সম্পূর্ণ হবে না।

সাহরি ও ইফতার কখন খাবেন?
জায়েদ বিন সাবিত রা. হতে বর্ণনা পাওয়া যায়। তিনি বলেন, আমরা রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সাহরি খেয়েছি। অতঃপর নামাজে দাঁড়িয়েছি। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হল, ‘দুয়ের (নামাজ ও সাহরি) মাঝে ব্যবধান কতক্ষণ ছিল?’ তিনি বললেন, ‘প্রায় পঞ্চাশ আয়াত পড়ার মত সময় পরিমাণ।’ সহিহ বুখারি: ৫৭৫।

বিজ্ঞাপন

আবু আতিয়্যা রা. একদিন মা আয়িশা রা.—কে বলছিলেন, আমাদের মধ্যে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এমন দুজন সাহাবি আছেন, যাঁদের একজন ইফতার তাড়াতাড়ি করেন, সাহারি দেরিতে খান। অন্যজন ইফতার দেরিতে করেন, সাহরি তাড়াতাড়ি খান। মা আয়েশা রা. জিজ্ঞেস করলেন, কে ইফতার তাড়াতাড়ি করেন এবং সাহরি বিলম্বে খান? আমি বললাম, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.। তখন মা আয়েশা রা. বললেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনটিই করতেন। সুনানে আন-নাসায়ি, হাদিস: ২১৫৯। সুতরাং রাতের শেষভাগে সাহরি খাওয়া সুন্নাত। তবে তা যেন সুবহে সাদিকের একেবারে কাছাকাছি হয়ে না-যায়। আর সূর্যাস্তের সাথে সাথে ইফতার করা সুন্নাত, দেরি যেন না-হয়।

সাহরি ও ইফতারের ফজিলত
সাহরি সম্পর্কে নাজিলকৃত উপরের কুরআনের আয়াত আমরা জেনেছি। তাতে ফজিলতও স্পষ্ট। এবার দেখা যাক নবিজি এ ব্যাপারে কী বলেছেন?

আনাস বিন মালিক রা. হতে বর্ণনা। নবিজি ইরশাদ করেছেন, “তোমরা সাহরি খাও, কেননা সাহরিতে বরকত আছে।” সহিহ বুখারি, হাদিস:১৯২৩। অপর হাদিসের ভাষ্য এমন: আল্লাহ তাঁদের প্রতি করুণা বর্ষণ করেন, যাঁরা সাহরি খায়। আর ফেরেশতারাও তাদের জন্য দোয়া করে থাকেন। হাদিসটি ইবনে উমর রা. হতে বর্ণিত। ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৩৬৬৭। সুনানে আবু দাউদের ২৩৪৪ নং হাদিসে দেখা যায়, সাহরির সময় হলে নবিজি তাঁর সাহাবির ডেকে ডেকে বলতেন: এসো, বরকতের খাবার খেয়ে যাও।

হজরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত হাদিসে কুদসিতে আছে যে, রোজা পালনকারীর জন্য দুটি আনন্দময় মূহুর্ত আছে। এক: ইফতারের সময়, দুই: আল্লাহ তায়ালার সাথে সাক্ষাতের সময়(কিয়ামতের দিন)। আর রোজা পালনকারীর মুখের গন্ধ আল্লাহ তায়ালার নিকট কস্তুরির সুগন্ধ অপেক্ষা অধিক পছন্দনীয়। সুনানে আন-নাসায়ী, হাদিস: ২২১৪। আবু হুরায়রাহ রা. থেকে বর্ণিত অপর এক হাদিসে এসেছে, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তিন লোকের দোয়া ফিরিয়ে দেয়া হয় না। ১. রোজাদারের, যখন সে ইফতার করে। ২.ন্যায়পরায়ণ শাসকের। ৩. মজলুম বা অত্যাচারিতের। তিরমিজি, হাদিস:৩৫৯৮।

সাহরি ও ইফতারের মেন্যু
সব ধরনের হালাল খাবার দ্বারা সাহরি ও ইফতার করা যায়। এতে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে যে-সব খাবার শক্তিদায়ক, সেগুলো রাখা-ই যুক্তিযুক্ত। তাই, যথাসম্ভব শক্তিদায়ক খাবার দিয়ে সাহরি ও ইফতার করা উত্তম। সালমান বিন আমর থেকে বর্ণিত হাদিসে পাওয়া যায়, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের কেউ যখন ইফতার করবে, সে যেন খেজুর দিয়ে শুরু করে। কারণ খেজুর বরকতময়। যদি খেজুর না পায়, তাহলে যেন পানি দিয়ে ইফতার তরে। কেননা পানি পবিত্র জিনিস।” তিরমিজি, হাদিস: ৬৫৪।

অন্যকে সাহরি ও ইফতার করানো
চলছে করোনা-কাল। বহু মানুষ ভুগছেন অসহায়ত্বে। রোজার দিনে এমতাবস্থায় তাদের পাশে দাঁড়ানো মানুষ হিসাবে মানুষের একান্ত কর্তব্য। যায়েদ ইবনে খালেদ রা. থেকে বর্ণনা এসেছে, নবিজি ইরশাদ করেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, সে রোজাদারের সমান সাওয়াব পাবে। তাতে রোজাদারের সাওয়াব একটুও কমবে না।” ইবনু মাজাহ, হাদিস: ১৪৪৬। হাদিসে যদিও বা ইফতারের বর্ণনা এসেছে, একই কাজ কেউ যদি সাহরির ক্ষেত্রেও করে, আল্লাহ তায়ালা চায়লে একই ধরনের সাওয়াব দান করতে পারেন। কেননা আল্লাহ অতিশয় দয়ালু।

মহান আল্লাহর অশেষ কৃপায় আমরা রমজান পেয়েছি। রাখতে পারছি ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের একটি—রোজা। সৌভাগ্য হচ্ছে বরকতময় সাহরি ও ইফতার শরিক হওয়ার। এ-সকল নেয়ামতদানে ধন্য করার জন্য মহান আল্লাহর দরবারে কৃতজ্ঞতা জানানো একান্ত প্রয়োজন। কুরআনে এসেছে, “যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও, তোমাদের বাড়িয়ে দেয়া হবে।” কৃতজ্ঞ হওয়ার একটি অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে, দান করা (যাদের সামর্থ্য আছে)। আসুন, সাহরি ও ইফতারের মাধ্যমে রোজা রেখে নিজেরা ভালো থাকি, অন্যকে ভালো রাখি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের তাওফিক দিন, আমিন!