চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সামাজিক মাধ্যম কি জনসংযোগের ধরণ বদলে দিচ্ছে

মিশেল মেকি যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোভিত্তিক জনসংযোগ সংস্থা মেকি মিডিয়া রিলেশনসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী। প্রতিষ্ঠানটির সাইটে মেকি সম্পর্কে বলা হয়েছে, টিভি সাংবাদিক ও জনসংযোগ নির্বাহী হিসেবে তার ২০ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। শিকাগোয় ফক্স টিভির জ্যেষ্ঠ প্রযোজক ও সংবাদ লেখক হিসেবে ১০ বছর কর্মরত ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি থেকে সাংবাদিকতায়  স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। লিংকডইন নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে মেকি বলেছেন, ‘পিআর গুরু ও জাত গল্পকার: মানুষকে ও ব্র্যান্ডকে তাদের বাস্তব গল্প রচনায় ও প্রচারে সহায়তা করে থাকি।’

ফোবর্স সাময়িকীর অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত লেখাটির ভাষান্তর এখানে তুলে ধরা হলো।

বিজ্ঞাপন

সামাজিক মাধ্যম এখন বিপণন কৌশলের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। মক্কেলরা সম্ভাব্য যেসব প্রামাণ্য ব্যক্তি বা প্রভাবকের (ইনফ্লুয়েন্সার) সঙ্গে মিশতে পারে, মক্কেলদের অনলাইনে অডিয়েন্সরা (পাঠক, শ্রোতা, দর্শক) কতটা বুঁদ হয়ে থাকে, এবং আমরা কী ধরণের ডিজিটাল হিট পেতে চাই- এসব বিষয় আমরা মাথায় রাখি। বলাই বাহুল্য, যখন নিজদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রসঙ্গ আসে, সাংবাদিকদের কাছে কোনো আরজি জানানোর দরকার পড়ে এবং আমরা যখন এ শিল্প বিষয়ক গবেষণায় গভীরভাবে ডুব দেয়, তখন অভ্যন্তরীণ কৌশলগুলো নির্ধারণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমই আমাদের প্রথম ভরসা।

কিন্তু আমি যখন জনসংযোগের পেশায় প্রথম আসি, তখন চিত্রটা পুরো ভিন্ন ছিল। এই ইন্ডাস্ট্রিতে আমার পেশাজীবনের শুরুর সময় সামাজিক মাধ্যম বলেই কিছু ছিল না। আমি যখন সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশোনা করেছি, তখনও ফেসবুক সেভাবে বিস্তার লাভ করেনি। আমি যখন হাইস্কুলে পড়ি, তখন টাইপরাইটারে কীভাবে লিখতে হয়, তা শিখতাম। সুতরাং, আমি যখন বলি, সামাজিক মাধ্যম জনসংযোগের জগৎকে আমূলে বদলে ফেলেছে, তখন আমার কথায় বিশ্বাস রাখতে পারেন।

কীভাবে জনসংযোগকে বদলেছে সামাজিক মাধ্যম?

এক. এটা প্রত্যেকের জন্যই অপার সম্ভাবনার এক দিগন্ত উন্মোচন করেছে যেন। আপনি আর কোনোভাবেই প্রথাগত পিআরের বিধিনিষেধের বেড়াজালে বন্দি নন। সামাজিক মাধ্যম আপনাকে নিজের সুর তোলার সুযোগ করে দেয়।

দুই. যাকে ইচ্ছা কড়া নাড়তে পারেন, পৌঁছে যেতে পারেন যে কারো কাছে। আপনি কি টেলিভিশনে একটু সুযোগ পেতে চান? আগে যাদের কাছে পৌঁছানো যেত না, তাদের কাছে পৌঁছাতে আপনার কাছে এখন রয়েছে বাস্তবসম্মত উপায়। সম্ভবত ওই টিভি উপস্থাপকের টুইটার ঠিকানা আছে। টুইটারের মাধ্যমে তাকে কড়া নাড়ুন। আপনি যদি যথেষ্ঠ বিনয়ী হন (এবং অবিচল থাকেন), তাহলে নিশ্চয়ই তিনি সাড়া দেবেন।

তিন. এখন আপনার নিজেরই মিডিয়া চ্যানেল রয়েছে। গড়পরতা সব মানুষকেই নিজের একটা প্ল্যাটফর্ম তৈরির সুযোগ করে দিয়েছে সামাজিক মাধ্যম। প্রত্যেকেই নিজস্ব অডিয়েন্স জুটিয়ে নিচ্ছে, যে যার মতো। আগে এমনটা ভাবাই যেত না।

চার. সাফল্যের সংজ্ঞা আরও বিস্তৃত হয়েছে। সামাজিক মাধ্যম যাত্রা শুরুর আগে মক্কেলদের কাছে নিজেদের মান প্রমাণের একটাই পথ ছিল: প্রচলিত মাধ্যমে দুর্দান্ত জনসংযোগ সাধন করা। আর আজ? একজন প্রভাবকের সুবাদে সামাজিক মাধ্যমে বড়সড় সাড়া জাগাতে পারলে এর প্রভাব টিভির মাধ্যমে জনসংযোগের দারুণ সাফল্যের চেয়ে কম নয় মোটেও।

সাংবাদিকের কাছে পৌঁছানো

যদি সাংবাদিকের কাছে পৌঁছানোর দরকার পড়ে, আমি টুইটারে ঢুঁ মারার পরামর্শই দেব। যারা সামাজিক মাধ্যমে কাউকে খুঁজে পেতে কিছুটা অস্বস্তি বোধ করেন, তারা আসলে বাধাধরা গণ্ডির বাইরে যেতেই ভয় পান। আমি তা হলফ করে বলতে পারি। কিন্তু সাংবাদিকরা তো অনলাইনে সক্রিয় থাকেন যে মূল লক্ষ্যটা নিয়ে, তা হলো, জনগণের সঙ্গে সংযোগ ঘটাবার জন্য। তবে এ ক্ষেত্রে, মানে কেনো সাংবাদিককের কাছে পৌঁছানোর সময় কিছু বিষয় মাথায় রাখা দরকার।

প্রথমে বুঝতে হবে, সাংবাদিকরা কেন টুইটারকেই বেশি পছন্দ করেন। একটাই কারণ, সিদ্ধিসাধনের কার্যকারিতা। টুইটারে তথ্য প্রতিক্ষণ হালনাগাদ হতে থাকে। তারওপর কম শব্দে যথা কথা। ফলে সময়ের সঙ্গে চলতে টুইটারই সেরা পছন্দ সাংবাদিকদের। এর ফলে খবর তৈরির ক্ষেত্রে তাদের আর অসঙ্গত, অসংশ্লিষ্ট তথ্যপ্রবাহের প্যাঁচে ঘুরপাক খেতে খেতে সময় অপচয় করা লাগে না। তাই যখনই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন, এই বিষয়টা অবশ্যই মনে রাখবেন। যখনই তাদের কিছু লিখবেন, বার্তাটি নির্মমভাবে সম্পাদনা করবেন (বাড়তি কথা নয়, শুধু বার্তাটি দিন!)।

বিজ্ঞাপন

টুউটারকে একটা গবেষণা সরঞ্জাম হিসেবে ব্যবহার করুন। সাংবাদিককে কড়া নাড়ার আগে, এটা নিশ্চিত হন যে, আপনি আপনার পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ পরিশ্রমটা সেরেছেন। সাংবাদিকের আগের টুইটগুলো দেখুন। কোনটা রিটুইট করেছেন, প্রতিক্রিয়া হিসেবে কোন টুইটে লাইক দিয়েছেন, এসব ভালোভাবে লক্ষ্য করুন। তারা যে বিষয়ে আগ্রহী, যাদের সঙ্গে মিশতে পছন্দ করেন, তা ভালোভাবে জানুন। এবার বার্তা লেখার সময় এগুলো মাথায় রেখে লিখুন। তারা কার সঙ্গে মিশতে চান কিংবা কী নিয়ে ভাবতে পছন্দ করেন, এটা জানতে পারলে আপনি তাদেরই ভাষায় তাদের সঙ্গে আলাপ করতে পারবেন, এমন একটা বার্তা লিখতে পারবেন যা সত্যিই কাজের হবে।

সুবিধাজনক মাধ্যমের সন্ধানে

কোন মাধ্যম বেশি সুবিধাদায়ক, এই প্রশ্নে আমি টুইটার কিংবা ফেসবুকের কথাই বলব। এই দুটি আঙিনা কিন্তু ব্যাপক বিস্তৃত। ফলে একটা কৌশল নির্ধারণ করে বা নির্দিষ্ট একটা লক্ষ্য মাথায় রেখে এসব আঙিনায় পা বাড়াতে হবে। নইলে গোলেমালে খেই হারিয়ে ফেলার আশঙ্কা থাকে।

কোন সাংবাদিককে এবং কোন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে আপনি পছন্দ করেন, সব আগে সেটা নির্ধারণ করেন। এরপর সামাজিক মাধ্যমে তাদের খুঁজুন। পাশাপাশি কোন ধরনের মানুষের মধ্যে আপনি বার্তাটি ছড়াতে চান, এবং কাদের আপনি মতমোড়ল মানবেন, এসব ভাবুন। এবার সে অনুযায়ী ফেসবুকে সমমনা গ্রুপগুলো খুঁজে বের করুন এবং সেসবে যোগ দিন। যদি ব্র্যান্ড বা কোম্পানির চেয়ে আপনি জনগণের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে চান, তখন ফেসবুকই সবচেয়ে কার্যকর। সুতরাং, সেই সংযোগগুলো গড়ে তুলুন। এবং দীর্ঘমেয়াদে লেগে থাকুন।

প্রভাবকের সন্ধানে

আপনি যদি প্রভাবক খুঁজতে চান, তাহলে বলব ইন্সটাগ্রাম। এটা প্রভাবক বিপণনের সেরা প্রাসঙ্গিক মাধ্যম বটে। বাস্তবিক সংলাপ-সংযোগের একটা অংশ প্রভাবকরা। তারা জনগণকে দেখিয়ে দেন, যেতে হবে কোথায়, কোনদিকে।

আমরা এখন আমাদের আয়োজনগুলোয় নিয়মিতই প্রভাবকদের আমন্ত্রণ জানাই। কারণ তারা ততটাই যে দরকারি। তাদের সন্ধান করার সেরা উপায় ইন্সটাগ্রামে ঢুঁ মারা। এখানে তাদের খুঁজে পাওয়া এত সহজ, হয়তো আপনি তা ভাবতে পারছেন না। ‘ডিসকাভার’ পাতায় যান, যেসব আধেয় (কনটেন্ট) সামনে আসছে, পুরোটায় চোখ বুলান। যেসব পোস্ট আপনার প্রয়োজনের সঙ্গে মিলে যায়, সেসব পোস্টের অ্যাকাউন্ট ‘ফলো’ (অনুসরণ) করুন। আপনি কী পছন্দ করছেন, ইন্সটাগ্রাম তা মনে রাখবে। আর সে মোতাবেক পরবর্তীতে আপনার সামনে আপনার পছন্দসই আধেয়গুলো তুলে ধরবে। আপনার পছন্দের অ্যাকাউন্টগুলো কী কী হ্যাশট্যাগ (#) ব্যবহার করে, সেদিকে খেয়াল রাখুন। সেসব হ্যাশট্যাগ দিয়ে অন্য পোস্ট খুুঁজুন এবং আপনিও সেসব হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করুন।অবিশ্বাস্য

এভাবে ধীরে ধীরে আপনার ফিড অধিক সংযুক্ত হয়ে উঠবে। তখন যেসব অ্যাকাউন্ট আপনি পছন্দ করেন, সেসবে মন্তব্য করতে কিংবা সরাসরি বার্তা (ডাইরেক্ট ম্যাসাজ বা ডিএম) লিখতে সংশয় করবেন না। ইন্সটাগ্রাম অবিশ্বাস্য সামাজিক। এটা অন্যদের সঙ্গে আপনার সত্যিকারের, দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক তৈরির সম্ভাবনা সৃষ্টি করে।

কেউ যদি প্রচার পেতে চায়, তাহলে উদ্দেশ্যসাধনের জন্য তার সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করা লাগবে। ধরুন, জাতীয় পর্যায়ের গণমাধ্যমে একটা প্রচারসুযোগ পাওয়ার কাক্সক্ষা আপনার, তাহলে আপনাকে ইন্সটাগ্রাম, লিংকডইন, টুইটার এবং/কিংবা ফেসবুকে আপনাকে সক্রিয় থাকতে হবে। কারণ, জাতীয় পর্যায়ের গণমাধ্যম অপরিচিত কাউকে সুযোগ দেয় না।

আপনি যে-ই প্ল্যাটফর্মই ব্যবহার করেন না কেন, এটা নিশ্চিত করুন যে, আপনার বার্তাটি ওই চ্যানেলের সঙ্গে সুসঙ্গত। এটাও খেয়াল রাখুন বার্তাটি আপনার দক্ষতার ক্ষেত্রের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। এরপরও আপনাকে একটা মাথায় রাখতে হবে: দৌড়ানোর আগে আপনাকে হাঁটতে হবে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত একখানা ইন্সটাগ্রাম অ্যাকাউন্ট আছে বলেই এটা ধরে নেবেন না যে, আগামীকালই আপনি দ্য নিউইয়র্ক টাইমসে প্রচারসুযোগ পেয়ে যাচ্ছেন। এমনকি, আমি তো নিশ্চিত, আপনি সহসা এমন সুযোগ পাবেন না। এমন সাফল্য পেতে হলে নিজেকে আরও সময় দেন। এবং সাফল্য বলতে আসলে আপনি কী মনে করেন, সেই ক্ষেত্রটাও প্রথমে বড় করুন।

পুনশ্চ : এটা ভাববেন না যে, মন চাইলে কিছু লিখবেন বলে কিংবা নিতান্ত একটা থাকা দরকার বলে কোনো সামাজিক মাধ্যম আপনি ব্যবহার করছেন। বরং এভাবে ভাবুন, আপনি যদি সত্যিই সুর তুলতে চান, সাড়া ফেলতে চান, তাহলে আপনার কৌশলের অংশ হিসেবেই সামাজিক মাধ্যম অ্যাকাউন্ট থাকতে হবে। জনসংযোগ জগৎটা এরই মধ্যে নবধারায় চলা শুরু করেছে, তো আপনি আর দেরি না করেন।

মূল লেখার সূত্র:

http://www.forbes.com/sites/forbesagencycouncil/2019/02/21/how-social-media-is-changing-the-face-of-pr