চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সর্বশেষ বাউল সাধিকার বিদায়

‘শেষে লগিটি হারিয়ে/ হাবুডুবু খেয়ে / মাঝ পাথারে মরবা/ ভেবেছো কি বিনা সাধনে/খেপির খেয়া নৌকায় চড়বা/বাস করো গুরুর দ্যাশে/ বিদ্যাশ কেনো ঘুরবা!’

বড়ো কাল বেলা! চরম সঙ্কট কাল! নিস্তব্ধ জনজীবন! একেবারে সেই সঙ্কট কালেই চলে গেলেন, পশ্চিমবাংলার সর্বশেষ বাউল সাধিকা, কিংবদন্তি বালিকা দাসী! শোকের ছায়া শিল্পী মহলে!

বিজ্ঞাপন

নির্জন অজয়ের কোলে, সমাহিত শান্ত বয়ে চলেছে জলরাশি! দূরে ওপাড়ে বর্ধমানের ইতিহাসের গড় কেল্লার ফাঁকা দুর্গ, আর এপাড়ের নদীর বিস্তীর্ণ চড়ে কদমখণ্ডীর শ্মশানের পাশে এক বাউল উলম্ব নৃত্য করছে আর এক সহচরী বাউলের সঙ্গে! পাশে বসে বাউল সাধিকা বালিকা দাসী। তিনি শম্ভু দাস বাউলের সাধনসঙ্গিনী।

বিজ্ঞাপন

জগৎ জোড়া খ্যাতির শীর্ষে তখন দুই বাউলই! এঁরাই বাউল তীর্থ ভূমি, সে দিনের কেন্দুলীর মেলায় হ্যাঁজাক লাইটের আলোয়, বিনা মাইকে হাজার হাজার মানুষকে বসিয়ে রাখতেন! একজন শম্ভু দাস বাউল, আর একজন গৌর খ্যাপা! দুজনেই বাংলার সে সময়ের আদি বাউলদের অন্যতম।

গলদঘর্ম হচ্ছেন শম্ভু দাস বাউল, উলম্ব নৃত্যের শেষে! জয়ধ্বনি শুনতে পাচ্ছি শুন্যের! দূরে আকাশের পাড়ে দুধ সাদা বলাকার দল, সোনালী ডানার শেষ রোদে শুকিয়ে ঘোরে ঠিকানার বাসায়! শেষ বাসায় ফিরছে পাখির দল! গান থেমে গেছে, মরা অজয়ের কোলে নামছে শান্ত অন্ধকার। মাধবের মন্দিরে আয়োজন শুরু হয়েছে সন্ধ্যে আরতির! ছবিটি হঠাৎ ভেসে এলো আমার সামনে!

আর তখনই একটা কান্নার স্রোত বইছে, অনুভব করলাম আমি! সামনে নেই গৌর খ্যাপা! ২০০৮ চলে গেছেন বাউল শম্ভু দাসও, মায়া লোকে ! তাহলে, এমন মনে হলো কেন! তখনই শ্যামের ফোনে পেলাম খবর! এই কালবেলার মেঘে, শুক্রবার সকালে বীরভূমের ইলামবাজারের শম্ভু দাস বাউলের নিজস্ব সাধন ক্ষেত্র ছেড়ে ৮৬ বছর বয়সে দীর্ঘ রোগ ভোগের পর চলে গেলেন, বাউল ঘরণী শম্ভু দাস বাউলের সাধিকা বালিকা দাসী! বহু দূরে বসে রয়েছেন এক দিনের পথচলার সঙ্গী বাউল সম্রাট পূর্ণ দাস, পবন দাস বাউল বিদেশে, বিশ্বনাথ, সাধন দাস, বনমালী দাসরা কেউ খবর পেয়েছেন, কেউ পাননি!

বহু বছর আগে শম্ভু দাস ও তাঁর স্ত্রী বালিকা জন্মগ্রাম পায়েড় থেকে এসে আশ্রম গড়ে ছিলেন ইলামবাজারে। আর মাত্র ১৩ বছর বয়সে বাউলঘর করতে, বালিকা তাঁর বাপের ভিটে বীরভূমের দেউলি থেকে আসেন পায়েড়ের শম্ভু দাসের কাছে! বর্তমানে ইলামবাজার বাড়িতে রয়েছেন তাঁদের তিন ছেলে, তিন মেয়ে। ইলামবাজারে শম্ভু দাসের আশ্রমে পাকাপাকি রয়েছেন তিন ছেলে বিশ্বনাথ, গৌর, নিতাইরা। শম্ভু দাস বাউলরা সে যুগের প্রাচীন বীরভূমের বাউল গানের চর্চাকে ধরে রেখেছিলেন। তাঁর পুত্র গৌর দাস বাউলও করেন চর্চা। তবে বালিকা দাসীর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সেই যুগের বাউল আখড়াধারীর চর্চার যুগের অবসান হল। শেষ আপ্তবাক্যের সাধনার তত্ত্ব অনুসারী বাউল সাধিকাও চলে গেলেন বীরভূম ছেড়ে!

সেদিনের জয়দেবের বাউলদের পরিচিত আশ্রম, শ্রী শ্রী হরিজন আশ্রম। যা বাউল সাধক হালাকাঁপা বাবা এই আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন ১৩৭০ বঙ্গাব্দে। বিল্লমঙ্গলের সে দিনের সাধু প্রেমদাসের কাছে তিন বছর কাটিয়ে, হালাকাঁপা বাবা জয়দেবে চলে আসেন। তাঁর আদি বাড়ি পুরুলিয়া জেলার লধুরকা গ্রামে। তিনি জয়দেবে এসে অন্তঃজ শ্রেণির মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিষ্য করেন, দেন বাউলের মন্ত্র। শোনাতেন গান। এই আশ্রমেই থাকতেন পায়েড়ের জনপ্রিয় শম্ভুদাস বাউল। এই বাউল আখড়ার চালিকা শক্তি ছিলেন শম্ভু দাস বাউল ও বাউল সাধিকা বালিকা দাসী, আসতেন নবনী দাস, তুলসী দাসী, ফুলমালা দাসী, বেণীমাধব দাস বৈরাগীরাও। হালাকাঁপা বাবা ১৪০৬ বঙ্গাব্দে দেহ রাখেন। আশ্রমেই তাঁর সমাধি রয়েছে।

সেই গানের আসরে জয়দেবে নিয়মিত আসতেন নবনী দাস বাউল। পূর্ণ দাস বাউল ১৯৭৫ সালে জয়দেব মেলায়, একটি আখড়া করেন, নবনীবালা ব্রজধাম আশ্রম নাম দিয়ে। তিনিও সে সময় থেকেই বালিকা দাসীর বাড়িতে আসতেন নিয়মিত। তাঁর মা ও বড়ো দিদি অন্নপূর্ণা দাসী, জয়দেবে বহুকাল ছিলেন শান্তি রজকের বাড়িতে। তাঁদের সঙ্গেও বন্ধুত্ব হয় শম্ভু, বালিকার।

কদমখণ্ডী তমালতলা আশ্রম, বাউলদের নিজস্ব বাড়ি। হালাকাঁপা বাবার আশ্রমে থাকতেন কেন্দুলীর প্রথম দিকের আরও এক বিখ্যাত বাউল সুধীর দাস। তিনি হালাকাঁপা বাবার শিষ্য। যদিও নবসনের কাঙ্গাল গোসাঁই তাঁর দীক্ষা গুরু। কেন্দুলীতে তিনিও আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন, তমালতলি আশ্রম বলে। সেখানেও গৌর খ্যাপা, পূর্ণ দাস, শম্ভু দাস, বালিকা দাসী, ফুলমালা দাসী, দাস রাধাময় গোস্বামীরা গাইতেন গান, শুনতেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্তোষ ঘোষ, অরুণ চক্রবর্তীরা! সে এক অন্য দিনের কথা!

ছেলেদের বড়ো আক্ষেপ, শেষ বেলায় মায়ের ইচ্ছে থাকলেও জয়দেবের বাউল পূর্ণ ভূমিতে পৌঁছানো গেলো না সাধিকা বালিকা দাসীর দেহ! এখন যে, শিহরে শাসাচ্ছে মৃত্যুর দূত! এই মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন, বিশিষ্ট সংগীত শিল্পী শুভেন্দু মাইতি। তিনি তাঁর শোক বার্তায় বলেন,‘বাউল পূর্ণ ভূমি বীরভূম সে যুগের এক আপ্ত সাধিকাকে হারালো! এক যুগের অবসান হল! শম্ভু দাস, তাঁর স্ত্রী বালিকা দাসী ও গৌর খ্যাপাকে বাংলা সংস্কৃতি প্রেমী মানুষের চিরকাল মনে থাকবে।’

লেখক: লোক গবেষক, বর্ধমান