চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সরকারি ব্যাংকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এখনই বন্ধ করতে হবে: ইসরাফিল আলম 

ফার্স্ট ফাইন্যান্স লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্প্রতি দায়িত্বভার গ্রহণ করেন নওগাঁ-৬ (আত্রাই-রাণীনগর) আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ইসরাফিল আলম। গত ২৯ জুন ফার্স্ট ফাইন্যান্স লিমিটেড এর ৩০৭তম পরিচালনা পর্ষদ সভায় সর্বসম্মতিক্রমে তাকে চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। বাংলাদেশ জাতীয় পল্লী উন্নয়ন সমবায় ফেডারেশন’ এর পরপর তিনবার চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন করে আসছেন মোহাম্মদ ইসরাফিল আলম এমপি। বাংলাদেশে টেলিভিশন টকশো’র অতি পরিচিত মুখ ও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ভক্ত এই সাংসদ রবীন্দ্র জার্নালের সম্পাদক এবং অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

ইসরাফিল আলমের পৈতৃক বাড়ী নওগাঁ জেলার রাণীনগর উপজেলার ঝিনা গ্রামে। তিনি এমবিএ এবং এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত আছেন। তৃতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। বিভিন্ন কাজের অবদান হিসেবে ১১টি পুরস্কার ও ১৩টি সম্মাননা স্মারক অর্জন করেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে ২ কন্যা ও ১ পুত্র সন্তানের পিতা। তার স্ত্রী ব্যাংকার হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সমাজ সেবক হিসেবেও বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে সম্পৃক্ত থেকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন। সম্প্রতি দেশের আর্থিক সেক্টর নিয়ে একান্ত সাক্ষাতকারে কথা বলেন মোহাম্মদ ইসরাফিল আলম এমপি।

বিজ্ঞাপন

প্রশ্ন: আপনি সংসদ সদস্য হিসেবে ভূমিকা রাখছেন দেশের উন্নয়নে। একই সাথে আপনার প্রতিষ্ঠান ফার্স্ট ফাইন্যান্স লিমিটেডও ভূমিকা রাখছে অর্থনৈতিক উন্নয়নে। বাংলাদেশের এখনকার অর্থনৈতিক ভলিউম অনুযায়ী ব্যাংক ও নন ব্যাংক ইন্সটিটিউশনের ভূমিকার বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
ইসরাফিল আলম এমপি: আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা উন্নত হচ্ছে এবং সামাজিক উন্নয়ন প্রতিদিন এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই গতিতে আমাদের আর্থিক খাতে উন্নয়ন হচ্ছে না। এসডিজিতে আছে ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন ৭০ শতাংশ করতে হবে অর্থাৎ ব্যাংকিং সেবার আওতায় এই পরিমাণ মানুষকে নিয়ে আসতে হবে। কিন্তু অধিকাংশ আর্থিক প্রতিষ্ঠানই শহরমুখী সেবা দিচ্ছে। তাই দেশের শিক্ষিত এবং সম্পদশালী মানুষই শুধুমাত্র আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান এবং ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশনের সাথে জড়িত। বিশাল জনগোষ্ঠী গ্রামে আছে যারা গরীব এবং কর্মজীবী তারা এখানে ইনক্লুটেড হচ্ছে না। এছাড়া আরেকটি জরুরি বিষয় হলো যে, দেশের আর্থিক সেক্টরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে দুর্বলতা আছে। সরকারি ব্যাংকে ঋণ খেলাপী সংস্কৃতি-ব্যাংকের টাকা ঋণ নিয়ে ফেরত না দেওয়া বা যে উদ্দেশ্যে ঋণ নেয়া হয় সেই কাজে বিনিয়োগ না করে অন্যভাবে ব্যবহার করা এবং দেশের বাইরে পাচার করা- এই কালচার খুবই খারাপ। এই কালচারের কারণে ব্যাংকিং সেক্টরের বিশ্বাস যোগ্যতা এর স্ট্যাবিলিটি এবং এর বিকাশকে বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। সরকারি মোট আমানত তার ২৮/৩০ শতাংশ সরকারি ৬টি ব্যাংকে জমা আছে। আর ৭০/৭২ শতাংশ বাকী সবগুলো ব্যাংকে আমানত রাখা আছে। এই টাকা প্রাইভেট ব্যাংক এবং অন্য সবকিছু মিলিয়ে। 

প্রশ্ন: ভারতে তাদের ইকোনমির ভলিউম অনুযায়ী ব্যাংকের সংখ্যা বিচার করে মার্জার বা অ্যাকুইজিশন শুরু করেছে। আমাদের ১০০টি স্পেশাল ইকোনমিক জোন হতে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে আমাদের অর্থনীতি এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অনুযায়ী ব্যাংকের মার্জার বা অ্যাকুইজিশন দরকার কী?
ইসরাফিল আলম এমপি: আমি মূল জায়গাতে ফোকাস করি। আমার আলোচনা শেষ করতে পারিনি। প্রাইভেট ব্যাংক আর পাবলিক ব্যাংক। পাবলিক ব্যাংকগুলো অনেক সেবা দেয়। ধরেন, একটা প্রাইভেট ব্যাংক মাত্র ২০ লাখ গ্রাহক ডিল করেন। আমাদের ১৮ কোটি মানুষ। গ্রামে তাদের কয়টা ব্র্যাঞ্চ আছে?তার ক্রেডিট কার্ড কোথায় ব্যবহার হবে? কারণ আমাদের ডিজিটাল আইসিটি ইনফ্রাসট্রাকচার গ্রামে এবং সব উপজেলায় এখনো যায়নি। ৫০০ উপজেলার মধ্যে কয়টা উপজেলায় গেছে? ওই ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করবে কোথায়? আরেকটা কথা- হু ইইল ইউজ দিস কার্ড? তার লেখাপড়া জানতে হবে তো? তার টেকনিক্যাল নো হাউ জানতে হবে তো?

বিজ্ঞাপন

একটি প্রাইভেট ব্যাংকের এমডি বলেছেন, তারা পাওয়ার সেক্টরে ২০ শতাংশ ইনভেস্ট করেছেন। ৬০টার মধ্যে ২০ শতাংশ হলে ১২টা হয়। ১২ টা পাওয়ার সেক্টরে তিনি কতো টাকা দিয়েছেন? সেই টাকা আর গ্রামের ছোট ছোট কৃষক বা মিডিয়াম লেভেলের এন্টারপ্রেনার তাদের সাথে ডিল করা এক কথা নয়? তারা তো বড় লোক মানুষ। যাদের টাকা আছে তাদের মাথায় উনারা তেল দেন। কিন্তু যারা গরীব মানুষ প্রাইভেট ব্যাংক তো তাদের টাকা দেয় না। তাই প্রাইভেট ব্যাংকের স্মার্ট সার্ভিসের সাথে সরকারি ব্যাংকের তুলনা করা যাবে না। মাস পিপলদের নিয়ে ডিল করলে প্রাইভেট ব্যাংকের কম্প্ল্যায়েন্সগুলো অ্যাপ্লাই করা সম্ভব হয় না। যেমন, সোনালী ব্যাংক, কৃষি ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক এদের একটি উপজেলায় ৪/৫টা ব্র্যাঞ্চও আছে। কিন্তু প্রাইভেট ব্যাংকের ব্র্রাঞ্চ নাই। কেন নাই? উপজেলা মানে তো গরীব। ২/৫ কোটি টাকার বেশি লোন তারা নেবে না। 

আর শহরের লোক উনারা নেবেন একাই ১ হাজার, বারো শত বা তেরো শত কোটি টাকার লোন। তাই সরকারি আর বেসরকারি ব্যাংকে এক করে দেখা যাবে না। আরেকটা বড় সমস্যা যেটা- আমাদের দক্ষতার সংকট শুধু আর্থিক খাতে নয়; সর্বত্র। বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ, প্রশাসন, গণমাধ্যম, বিচারবিভাগ, আর্থিক খাত সর্বত্রই দক্ষতার সংকট আছে। এই দক্ষতার সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। একটা প্রাইভেট ব্যাংক- কয় জনকে ট্রেনিং দেয়? কতো লোক আনট্রেন্ড থাকছে। ৪২ লাখ এখন গ্রাজুয়েট বেকার। সবাইকে তারা কি ট্রেনিং দিতে পারছে? তাই ট্রেনিংও দিতে হবে এবং তাদেরকে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারি ব্যাংকগুলোর জবাবদিহিতার শূন্যতা আছে কিন্তু প্রাইভেট ব্যাংকে জবাবদিহিতা স্ট্রং। এর কারণে নিজেদের টাকা দিয়ে তারা ব্যাংক করে ব্যক্তিগত টাকায়। আর সরকারি ব্যাংকের টাকা তো ব্যক্তিগত টাকা না। সরকারি মাল দরিয়ামে ঢাল। প্রাইভেট ব্যাংকের হ্যাচিং গ্রাউন্ড কোনটা? সরকারি ব্যাংকের টাকা। সরকারি ব্যাংক থেকে টাকা নিয়েই তো প্রাইভেট ব্যাংক হয়েছে। উনারা দিয়েছে ৪/৫ শত কোটি টাকা মূলধন। জামানত কতো হয়েছে? অনেক টাকা জামানত। সরকারি ব্যাংক থেকে নিয়েছে। সরকারি প্রজেক্টের টাকা নিয়েছে। সরকারের বিভিন্ন ফান্ডের টাকা নিয়েছে।এই টাকা নিয়ে তারা বড় বড় ব্যাংক করেছে। তারপরে তারা স্মার্ট ব্যাংক এর কথা বলছেন। কিন্তু প্রাইভেট ব্যাংকের কাছে আমার প্রশ্ন হলো- আপনারা ইন্টারেস্ট রেট কতো কমিয়েছেন? সরকারি ব্যাংক যেভাবে সুদ মওকুফ করে, রি-শিডিউলড স্ট্যাকচারিং করে কিন্তু প্রাইভেট ব্যাংক তো এভাবে সুদ মওকুফ করে না। কাদের টাকা তারা সুদ মওকুফ করে? ডাইরেক্টর সাহেবরা যে লোনগুলো নিয়েছেন- তার সুদ তারা মওকুফ করে। সাধারণ মানুষের ঋণ প্রাইভেট ব্যাংক কয়টা মওকুফ করেছেন? এই সব কিন্তু দেখতে হবে- দেখার পরে বিচার করতে হবে। আর্থিক সেক্টরে স্বচ্ছতা এবং জবাবদহিতা এখন ক্রিয়েট করা খুবই দরকার। কারণ আমাদের ইকোনমি এখন এতো বড় হয়ে যাচ্ছে- সেই হিসেবে যদি বলেন ব্যাংকের সংখ্যা খুব বেশি হয়ে যাচ্ছে। নো, সমস্যা হচ্ছে ব্যাংকের গুড গর্ভনেন্স।

আমার কথা হলো- যারা ঋণ নিচ্ছেন এই ক্রেডিটগুলোকে এনালাইসিস করা। যারা ক্রেডিট নিচ্ছেন তাদের কোয়ালিটি দেখা এবং যারা জামানত দিচ্ছে তাদের এই জামানতের যোগ্যতা দেখা। আমি যে টাকা দিচ্ছি- এই টাকার জন্যে এই কোলাটেরল এনাফ কি না? কারণ আমি দিচ্ছি ৫০০ কোটি টাকা। আর কোলাটেরলের মূল্য হলো ১০০ কোটি টাকা। কিন্তু বানিয়ে দিলাম আমি ৬০০ কোটি টাকা। এই ব্যাড প্রাকটিসগুলো- এই অনিয়মের জায়গাগুলো বন্ধ করতে হবে।

আরেকটি বড় ব্যাপার হলো- পলিটিক্যাল প্রেসার। সরকারি ব্যাংকগুলোতে টাকা কারা পায়? যাদের টাকা বেশি আছে এবং যারা পলিটিক্যালি খুবই প্রভাবশালী। সরকারি ব্যাংকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এখনই বন্ধ করতে হবে। এই সরকার যেভাবে ডিজিটাল এবং ইন্টারনেট সেবা দিচ্ছে সেইভাবে ব্যাংকগুলো এই সেবা বাড়াতে পারছে না। সরকারি ব্যাংকে আইডল ম্যান অনেক পড়ে আছে। যেখানে যতো লোক দরকার তার চেয়ে বেশি লোক পড়ে আছে। আবার হিসাব করে দেখবেন- মানুষের সংকট। কিন্তু যে মানুষটা আছে- দে আর নট স্কিলড। যারা আছে তাদেরকে স্মার্ট ও অ্যাকটিভ করতে হবে। এরা যেন ভুল ঋণ না দেন। খারাপ লোককে ঋণ না দেন তা নিশ্চিত করতে হবে। মার্জার এর কথা বললেন- মার্জার ইজ নট সলুউশন। শূন্য যোগ শুন্য যোগ শুন্য- রিজাল্ট তো শূন্য হবে, তাই না? আপনি অনেকগুলো খারাপ ব্যাংককে একত্রিত করলেন, লাভ কী? তার সাথে খারাপ ঋণও একত্রিত হয়ে গেলো। ডিএল, সিএল যেগুলো আছে- নন পারফর্মিং লোন। সেইগুলো এক হয়ে গেলো। বোঝা আরও অনেক বড় হয়ে গেলো। 

প্রশ্ন: নন ব্যাংক ফাইন্যান্সিয়াল প্রতিষ্ঠানগুলোর ইন্টারেস্ট রেট এবং নতুন উদ্যোক্তাদের বিষয়টি সাংঘর্ষিক কি না?
ইসরাফিল আলম এমপি: আমরা ডিজিটাল ডিজিটাল বলছি, ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের কথা বলছি। কিন্তু ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে আমাদের সার্ভিস চার্জ এটাও কিন্তু বিবেচনায় নিতে হবে। বিকাশের কথা আমরা সবাই বলি। ১ হাজার টাকা পাঠাতে গেলে বিকাশ কতো টাকা নেয়? তাছাড়া বিকাশ তো গর্ভনিং উইথ দ্য ব্যাংক এবং অধিকাংশ সরকারি ব্যাংক। সোনালি ব্যাংক, জনতা ব্যাংক- একটা ব্যাংক যদি আশেপাশে না থাকে বিকাশ তো চলবে না? ওই ব্যাংকের সাথে তার রিলেশনশীপের প্রয়োজন আছে। তারা কিন্তু সরকারের সব ইনফ্রাসট্রাকচার ব্যবহার করছে। সরকারের সব ধরণের সাপ্লাই চেইন ব্যবহার করছে। কিন্তু বেসরকারিখাতের মধ্যস্বত্ত্বভোগী কিছু মানুষ এখানে দাঁড়িয়ে প্ল্যাটফর্ম তৈরী করে তারা টাকা বানিয়ে দেশের ভেতরে এবং বাইরে নিয়ে যাচ্ছে। বিকাশ প্রতিদিন কতো টাকা লাভ করে? সরকারকে কতো টাকা ট্যাক্স দেয়? আর বাইরে কতো টাকা নিয়ে যায়? ক্যালকুলেট করে দেখেন, মাথা ঘুরবে। এই জন্যে বলছি- গভর্নমেন্ট হ্যাজ টু বি এফিসিয়েন্ট টু কন্ট্রোল টু রান স্যাটেসফাইডলি। সম্পদ তো মূল্যবান নয়। একজন মানুষ, মানব সম্পদ তো বড়। একজন বেকার ট্রেনড লাইসেন্সধারী ড্রাইভারকে যদি কার লোন দেই-সেই লোন কিন্তু মিস হবে না। একজন দক্ষ কৃষককে লোন দিলে সেই লোন ফেরত আসবেই। এই জায়গায় আরও কাজ করতে হবে।

Bellow Post-Green View