চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সচেতন নারীদের জন্য আন্তর্জাতিক মরণ ফাঁদ!

করোনা ভাইরাসের কারণে গৃহবন্দী সবাই। ঘর-বারান্দা কিংবা ছাদের বাইরেও মুঠোফোনে বন্দী জীবন। তাই সকল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানুষের বিচরণ এখন চোখে পড়ার মতো। আগ্রহেরও কমতি নেই। মানুষের এই আগ্রহকে পুঁজি করে অন্তর্জালে ছড়িয়ে পড়েছে হাজারো প্রতারক। তাদের প্রতারণার ধরণও পাল্টেছে।

আজ বিশেষ ধরণের প্রতারণা নিয়ে লিখতে বসা। নারীদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা হচ্ছে প্রতারণার নতুন ফাঁদ। বিশেষ করে নি:সঙ্গ, বিধবা, তালাকপ্রাপ্তা নারীদের জন্যেই বিশেষভাবে এইসব ফাঁদ তৈরি করা হয়েছে। খেয়াল করে দেখবেন সবচেয়ে জনপ্রিয় যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ইদানিং বেড়েছে বিভিন্ন বিবাহ বিষয়ক সাইটের প্রচারণা। যারা একটু আধুনিক, অগ্রসর চিন্তার নারী তাদেরকে টার্গেট করা হচ্ছে এসব সাইটে।

বিজ্ঞাপন

অনেকটা একাকিত্ব কাটাতে, কিংবা সত্যিকার প্রিয়জনের খোঁজে নারীরা অলস এ সময়টাকে ব্যবহার করতে চাইছেন। আর প্রতারকরা চাইছেন তাদের আখের গোছাতে। তাই সাবধানতা জরুরী। প্রতারকরা বেশ কয়েকটি ধাপে নারীদের টার্গেট করে ফেললে প্রতারণার জাল।

বিজ্ঞাপন

কেস স্টাডি (১)
অ্যালেক্স (ছদ্ম নাম) প্রথমে অনুরোধ পাঠায় সাথী (ছদ্ম নাম) নামের এক নারীর ফেসবুক পেইজে। সাথী প্রোফাইল ঘেঁটে দেখে দুই মেয়েসহ লণ্ডনে বাস করা এক পুরুষের প্রোফাইল। অনুরোধ গ্রহণ করে সাথী। অ্যালেক্স ম্যাসেঞ্জারে সাথীর হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার চেয়ে বসে। সাথী ডিভোর্সড নারী, একা বাসায় থাকে, সময় কাটাতে রাজী হয়ে যায়। অ্যালেক্সকে হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার দিয়ে দেয়। কথা শুরু হয় হোয়াটসঅ্যাপে। শুরুতেই সাথীকে ভালো লেগেছে জানায় অ্যালেক্স। এরপর সাতদিনের মধ্যেই গভীর প্রেম হয়ে যায় তাদের। সকাল-দুপুর-সন্ধা হোয়াটসঅ্যাপেই কথা হয় অ্যালেক্স আর সাথীর। ১৫ দিনের মাথায় অ্যালেক্স সাথীকে জানায়, এখন আর সে দেরি করতে চায় না। সাথীকে এনগেইজড করতে চায়। সারাদিন সাথীর জন্য বাজার করে ফিরে উপহার সামগ্রীর ছবি পাঠায়। আর সাথীর কাছে ঠিকানা চায়। সাথীও ঠিকানা দিয়ে দেয়। এর মধ্যে শুরু হয় লকডাউন। উপহার পাঠানোর এক মাসের মাথায় অ্যালেক্স জানায় যে সাথীকে কুরিয়ার সার্ভিসের লোকজন ফোন করতে পারে। পরদিন সত্যিই ফোন করে ঢাকা কুরিয়ার সার্ভিস থেকে, রুমা নামের এক মেয়ে জানায়, লন্ডন থেকে সাথীর নামে একটি কুরিয়ার এসেছে। এটি বাসা পর্যন্ত নিতে চাইলে তাকে ৫০ হাজার টাকা একটি ব্যাংক একাউন্টে পাঠাতে হবে। ঘোরে থাকা সাথীর টনক নড়ে। সে পরিচিত কয়েকজনের সাথে এটা নিয়ে কথা বলে, তারা এটিকে প্রতারণা বলে জানায় আর সাথীকে টাকা না দিতে অনুরোধ করে। সাথীও সাবধান হয়ে যায় আর অ্যালেক্স সাথীকে ব্লক করে দেয়।

কেস স্টাডি (২)
কামাল (ছদ্মনাম)-এর সাথে পরী (ছদ্মনাম)-র পরিচয় ম্যাট্রিমনিয়াল সাইট মুসলিমা.কমে। পরী উচ্চ শিক্ষিত কিন্তু বিধবা নারী। এক সন্তান রেখে স্বামী মারা গেছেন। কিছুদিন ধরেই ফেসবুকে মুসলিমা.কমের একটা স্পন্সরড ফ্রি রেজিস্ট্রেশন বার বার চোখে পড়ছে। তাই লকডাউনের শুরুর দিকে সে এই সাইটে রেজিস্ট্রেশন করে। একদিন পড়েই মুসলিমা.কমের ম্যাসেঞ্জারে কামাল পরিচিত হয়। জানায় সে ইটালীতে কাজ করে, ইঞ্জিনিয়ার, আসল বাড়ী মালয়েশিয়া। কামাল ডিভোর্সী, তার কোন সন্তান নেই। পরীকে বিয়ে করতে তার কোন আপত্তি নেই। কিছুদিন কথাবার্তা চলে। প্রেমময় সম্পর্ক গড়ে উঠে। মেয়েকে নিয়ে পরীর চলতে কষ্ট হচ্ছে-যাতে কষ্ট কম হয় সেজন্য কিছু টাকা পাঠাতে চায় কামাল। ৫০ হাজার ডলার পাঠাবে আপাতত। তারপর প্লেন চলাচল স্বাভাবিক হলেই বাংলাদেশে আসবে এবং পরীকে বিয়ে করবে। পরী রাজী হয়। টাকা এসেছে জানিয়ে ফোনও আসে। কিন্তু এই টাকা পরীর একাউন্টে পৌঁছানোর জন্য ১৫ হাজার টাকা চেয়ে ফোন করে চট্টগ্রামের এক হুণ্ডি ব্যবসায়ী। পরী টাকাও পাঠাতে চেয়েছিলো। কিন্তু ওই নাম্বার আর খোলা পায়নি। কারণ এরি মধ্যে কামালের বিষয়টা পরী বেশ কয়েকজন পরিচিত পুলিশের কাছে দিয়ে দিয়েছিলো।

কেস স্টাডি (৩)
আহমেদ (ছদ্মনাম)-র সাথে কনা (ছদ্মনাম)-র পরিচয় এশিয়ান ডেটিং সাইটে। কনা শিক্ষিত, অনলাইনে ব্যবসা করে। নতুন ব্যবসার কারণে ঢাকায় এক রুমের ছোট একটা ফ্লাট নিয়ে একাই থাকে বাসায়। বাসায় বসে বসে ফেসবুকে অর্ডার নেয় আর ডেলিভারী দেয়। কনার এখনো বিয়ে হয়নি। বাবা-মা তার জন্য ছেলে খুঁজছে। তাই তারও নজর এড়ায়নি বিবাহ বিষয়ক আরেকটি সাইট ট্রুলিএশিয়ান.কমের প্রচারণা। এখানেও ফ্রি রেজিস্ট্রেশন। তাই কনা একটি একাউন্ট খুলেই বসে। হাজার হাজার পুরুষের ছবি তার সামনে আসে। এদের ভেতর আহমেদের প্রোফাইল তার ভালো লাগলো। ছেলে অস্ট্রেলিয়ার। অবিবাহিত। আহমেদসহ আরো কয়েকজনের ম্যাসেঞ্জার বক্সে নিজেই নক করে কনা। ফিরতি রিপ্লাই দেয় অনেকেই, কিন্তু আহমেদ তাদের মধ্যে ব্যতিক্রম। আহমেদের সাথে ঘনিষ্টতা বাড়ে কনার। ১৫ দিনের মাথায় আহমেদ জানায় বাংলাদেশেই সেটেল হতে চায় আহমেদ। সেটেল হওয়ার জন্য এখনি কনার কাছে কিছু ডলার জমা রাখতে চায়। ডলারের পরিমাণ এক লাখ। পরদিন ইন্টারন্যাশনাল মানিটরী ফান্ড, চট্টগ্রাম শাখা থেকে সালমা আখতার ফোন করে বলে এক লাখ ডলার এসেছে, এটার চার্জ জমা দিতে হবে ৪৫০০০ টাকা। কনা আর টাকা জমা দেয় না। ওদিকে টাকা জমা না দেয়ার কারণে সম্পর্কে সিরিয়াস না অভিযোগ এনে কনাকে ব্লক করে দেয় আহমেদ।

কেস স্টাডি (৪)
ডায়াস (ছদ্মনাম) এর সাথে মনি (ছদ্মনাম)-র পরিচয় এশিয়ান ডেটিং সাইটে। মনি দুই সন্তানের জননী, বেসরকারী চাকরীজীবী। ডিভোর্সী। সেও একটু ব্যতিক্রম অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য দেশীয় বিবাহ বিষয়ক সাইটের বাইরে এশিয়ান ডেটিং সাইটে নিজের নাম অন্তর্ভূক্ত করেন। সেখানেই পরিচয় সুদর্শন ডায়াসের সাথে। ডায়াস লন্ডনে কাজ করছে, কানাডার স্থায়ী বাসিন্দা। তারও এক সন্তান, স্ত্রী মারা গেছেন। এসব জেনে একে অপরের কাছে আসেন তারা। সব অনলাইনেই। ডায়াসও বাংলাদেশে সেটেল হওয়ার জন্য মনিকে টাকা পাঠাতে চায়। বলে এর আগে সে ইন্দোনেশিয়াতে কাজ করতো, সেখানকার পেমেন্টার পুরো অংশই সে মনিকে বাংলাদেশে পাঠাবে। এজন্য তার ইমেইল এড্রেস জানতে চায়। পরদিন মেইল আসে তার নামে টাকা পাঠাতে বলেছেন ডায়াস, তিনি তা নিতে চান কিনা। ফিরতি মেইলে মনির পারপোর্ট নাম্বার, ভোটার আইডি, ব্যাংক একাউন্ট ডিটেইলস চেয়ে পাঠায় রেমিটেন্স ফান্ড ট্রান্সফার ডিপার্টমেন্ট থেকে জন ব্রাউন। সব ঠিক ঠাক দিয়ে দেয় মনি। পরদিন ফিরতি মেইল আসে মনির কাছে যে আপনার আর ডায়াসের বিবাহের কোন কাগজ নেই, ডায়াসের অর্জিত ২ লাখ ডলার আপনাকে নিতে হলে প্রোপার কাগজ তৈরি করতে হবে। এজন্য আমাদের খরচ হবে ৫০০ ডলার। একটি ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের নাম্বার দিয়ে জন ব্রাউন জানান, যে টাকা পাওয়ার তিন দিনের মধ্যে মনির ব্যাংক একাউন্টে ২ লাখ ডলার জমা হবে। মনি ডায়াসকে জানায়। ডায়াস ধার করে হলেও টাকাটা ম্যানেচ করে রেমিটেন্স ফান্ড ট্রান্সফার ডিপার্টমেন্টকে পাঠাতে বলে। মনি আর টাকাটা পাঠায়না। ফলে ডায়াসও আর তাকে ভালোবাসে না। ফলাফল ব্লক।

বিজ্ঞাপন

কেস স্টাডি (৫)
ফরিদ থাকেন আমেরিকাতে। বউ মারা যাওয়ার পর দুই সন্তান নিয়ে একাই থাকেন নিজের বাড়িতে। এসব জানার পর ফরিদের প্রতি প্রেমার আগ্রহ বাড়তে থাকে ফরিদের সাথে লিন্কইনে পরিচয়। প্রেমা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা। বয়সও হয়ে গেছে তাই সেও মনে মনে ফরিদকে আশা করতে থাকে। ফরিদ গিফট পাঠাতে চায়, পাঠায়ও। কুরিয়ার সার্ভিস থেকে ফোন আসে, ফরিদ নামে কেউ প্রেমার নামে গিফট বক্স পাঠিয়েছে। গহনা আছে তাই কাস্টমসে টাকা জমা দিতে হবে ৫০ হাজার। তারপর পাওয়া যাবে বক্স। প্রেমার কাছে টাকা বড় নয়, প্রেম বড়। তাই সে নিজের ব্যাংক একাউন্ট থেকে টাকা তুলে কাস্টমস বর্ণিত ব্যাংক একাউন্টে টাকা জমা দিয়ে অপেক্ষা করছে গিফট বক্সের। তার সে অপেক্ষা আর ফুরোয়নি।

কেস স্টাডি (৬)
এশিয়ান ডেটিং সাইটে ড্যান মিশ্রার সাথে পরিচয় তমালিকার। তমালিকা বেসরকারী চাকুরীজীবী, ডিভোর্সী কিন্তু কোন সন্তান নেই। বাংলাদেশে একাই থাকেন ছোট ফ্লাটে। ড্যানের সাথে পরিচয়ের পর থেকেই তমালিকার খুশি আর ধরে না। কারণ ড্যান অস্ট্রেলিয়ায় থাকে, ডাক্তার। সেও ডিভোর্সী, কোন সন্তান নেই। সব জেনে যেনো জীবনের যা চাওয়ার তার সব একসাথে পেয়ে গেছে তমালিকা। একদিন হঠাৎ তার ফেসবুক পেজে সাজেশন হিসেবে সামনে আসে একটি নাম বিধু মহাদেবন। ছবি দেখে তমালিকার চোখ ছানাবড়া। প্রোফাইলে গিয়ে দেখে, তার দুই কন্যা সন্তান আছে এবং স্ত্রীসহই সে অস্ট্রেলিয়ায় বাস করে। স্থায়ী বাসিন্দা ভারতের ভুবনেশ্বরে। সাথে সাথে ফোন, মাফ চেয়ে বসে ড্যান ওরফে বিধু। তমালিকা প্রচন্ড মানসিক চাপ সামলাতে না পেরে আত্মহত্যার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে চায়। কিন্তু বন্ধুদের সাহায্যে এ যাত্রায় বেঁচে যায় তমালিকা।

একজন তমালিকা বাঁচলে কী হবে, এমন অন্তত আরও দশটা কেস স্টাডি আমার জানা আছে যাদের প্রত্যেকেই টাকা খুইয়েছেন। গিফট বক্স আনার জন্য নিজের সঞ্চিত অর্থ নির্দেশিত একাউন্টে জমা দিয়ে উপহারের জন্য অপেক্ষায় থেকেছেন, কিন্তু সে উপহার আর আসেনি। ব্যবসায়ে টাকা যোগ হবে আশায় লাখ লাখ টাকা চার্জ হিসেবে দিয়েছেন কখনো হুন্ডিতে, কখনো ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নে কখনোবা মানিটারী ফান্ডে।

ইন্টারনেটের এই চক্র আন্তর্জাতিক। তাদের প্রতারণার ধরণও প্রায় এক ও অভিন্ন। প্রথমে লাভ চ্যাট, তারপর উপহার বা টাকা পাঠানোর প্রস্তাব, জোর করে টাকা বা উপহার পাঠানো (আপনি না চাইলেও), বাংলাদেশ থেকে কল, ডেলিভারী চার্জ চাওয়া, পাওয়ার পর মূল ব্যক্তি উধাও। আরো একটি বিষয় হলো টাকা বা গিফট বিষয়টি নিয়ে কারো সাথে যেন আলাপ না করা হয়, সে ব্যাপারে বারবার নিষেধ করা হয়। পুরো প্রক্রিয়াটিই ইন্টারনেটভিত্তিক। এটা আন্তর্জাতিক সাইবার ক্রাইম। করোনাকালীন সময়ে এই প্রতারণা বেড়েছে বহুগুণ।

আর এই সাইবার ক্রাইমের সরল টার্গেট এখন স্বাবলম্বী নারীরা। সচেতন হওয়া স্বত্ত্বেও নারীরা এসব ফাঁদে পা দিয়ে স্বর্বস্ব হারানোর নজির ভূঁড়িভূঁড়ি।

সুতরাং সাধু সাবধান। নিজের সামান্য ভুলের কারণে লুট হয়ে যেতে পারেন ঘরে বসেই। এনালগ যুগে চুরি-ডাকাতি হয়ে গেলেও নমুনা থেকে যেতো, প্রমাণ থাকতো, আপনি ডুকরে কাঁদতে পারতেন, সমব্যাথীও পেয়ে যেতেন। কিন্তু অন্তর্জালের এই প্রতারণা আপনাকে ভেতর থেকে শূন্য করে দেবে। এই শূন্যতা কোনো কিছুতেই পুরণ হবার নয়। তাই সাবধানতার বিকল্প নেই। সবাই ভালো থাকুন, সাবধানে থাকুন।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)