চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও আজকের বাংলাদেশ

স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বলতে আমরা ১০ জানুয়ারি, ১৯৭২ সালে পাকিস্তানের বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে প্রত্যাবর্তন করাকে বুঝি। মুক্ত মাতৃভূমিতে ফিরে আসার ঘটনাটি ছিলো বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসের পরিপূর্ণতা।

১৯৮১ সালের ১৭ মে নিজ ভূমে শেরে বাংলা নগরের বিশাল সমাবেশে বঙ্গবন্ধুকন্যার ভাষণের দুটি লাইন দিয়েই তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ইতিহাস তুলে ধরতে চাই: ‘সব হারিয়ে আজ আমি আপনাদের মাঝে এসেছি। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে তার আদর্শ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে জাতির জনকের হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণে আমি জীবন উৎসর্গ করতে চাই।’

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৭৫ এর ১৫ আগস্ট মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তির গভীর ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় দেশীয় দোসরদের দ্বারা সংগঠিত হত্যাকাণ্ডে প্রাণ হারান বঙ্গবন্ধু সহ উপস্থিত পরিবারের সকল সদস্য। স্বামী পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার সাথে বিদেশ থাকায় প্রাণে বেঁচে যান শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। দুই বোনের আর্থিক সম্বল বলতে ছিল কেবল ২৫ ডলার। স্বামীর জার্মান ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় ১৯৭৫ সালের ২৪ আগস্ট ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে ভারতীয় দূতাবাসের এক কর্মকর্তার মাধ্যমে ২৫ আগস্ট স্বামী, বোন ও দুই সন্তানসহ দিল্লিতে পৌছান শেখ হাসিনা। ভারতে তখন জরুরি অবস্থা, দুই সপ্তাহ দিল্লির ডিফেন্স কলোনিতে থাকার পর ইন্দিরা গান্ধীর স্বাক্ষাৎ পান তারা। তখন বিস্তারিত ঘটনা জানতে পেরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। ইন্দিরা গান্ধীর আদেশে দু’জন নিরাপত্তাকর্মীসহ থাকার নতুন ঠিকানা হয় ইন্ডিয়া গেট সংলগ্ন পান্ডারা পার্ক,সি-ব্লক ফ্ল্যাটে।

১ অক্টোবর ৭৫ সালে এম এ ওয়াজেদ মিয়াকে পরমাণু শক্তি বিভাগে স্বল্প বেতনে ফেলোশীপ দেয় ভারত সরকার। ১৯৭৬ সালের ২৪ জুলাই শেখ রেহানা লন্ডন প্রবাসী শফিক সিদ্দিক এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে লন্ডন চলে যান। ১৯৭৯-৮০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে শেখ হাসিনার সাথে স্বাক্ষাৎ ও বৈঠক এর উদ্দেশ্যে দিল্লিতে যান শীর্ষনেতা জিল্লুর রহমান, আব্দুস সামাদ আজাদ, সাজেদা চৌধুরী, আমির হোসেন আমু। আফগানিস্তানের কাবুল থেকে দেশে ফেরার পথে দিল্লিতে বঙ্গবন্ধুকন্যার সাথে বৈঠক করেন আওয়ামী েলীগ নেতা আব্দুর রাজ্জাক। ৮০ সালের ৪ এপ্রিল এসব বৈঠকের বিষয়ে আলোচনা করতে একমাত্র বোনের সাথে দেখা করতে লন্ডন যান শেখ হাসিনা।

বিজ্ঞাপন

পরবর্তীতে ১৯৮১ সালের ১৪,১৫ ও ১৬ ফেব্রুয়ারীতে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিলে শেখ হাসিনাকে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়, তখন সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আব্দুল মালেক উকিল-সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী। লন্ডন থেকে ফেরার পর দিল্লিতে বসে নিজের সভাপতি নির্বাচিত হবার খবর পান শেখ হাসিনা। ২৪ ফেব্রুয়ারী শীর্ষনেতা আব্দুল মালেক উকিল, ড. কামাল হোসেন, জিল্লুর রহমান, আব্দুল মান্নান, আব্দুস সামাদ আজাদ, এম কোরবান আলী, জোহরা তাজউদ্দীন, স্বামী গোলাম আলী চৌধুরীসহ সাজেদা চৌধুরী, আমু, রাজ্জাক, তোফায়েল ও আইভি রহমান তারা দিল্লি যান শেখ হাসিনার সাথে বৈঠক করতে। সাজেদা চৌধুরী ও ড.কামাল হোসেন রয়ে যান দেশে ফেরার তারিখ চূড়ান্ত করতে। মার্চে ২/৩ টা তারিখ করেও জিয়া সরকারের নিষেধাজ্ঞা এবং সে কারনে স্বামী মত না দেয়ায় তখন দেশে ফেরা হয়নি।

অবশেষে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, ১৬ মে পুতুলকে নিয়ে রওনা হয়ে কলকাতা হয়ে ১৭ মে সফরসঙ্গী আব্দুস ছামাদ আজাদ ও এম কোরবান আলী কে নিয়ে নিজ মাতৃভূমির কুর্মিটোলা বিমান বন্দরে অবতরণ করেন, ইন্ডিয়া বোয়িং এয়ারলাইন্সে, সময় বিকাল সাড়ে ৪টা। আবহাওয়ার পূর্বাভাসে সেদিন বাতাসের গতিবেগ ছিলো ৬৫ মাইল/ঘণ্টা। প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে প্রায় ১৫ লক্ষ মানুষ সমবেত হয়েছিল শেরে বাংলা নগর হয়ে মানিক মিয়া এভিনিউ পর্যন্ত। গগনবিদারী স্লোগানে প্রকম্পিত হচ্ছিলো রাজপথ।

শেরে বাংলা নগরের বিশাল জনসমাবেশে তিনি সেদিন বলেন: ‘আমি আওয়ামী লীগের নেত্রী হিসেবে জনগণের সামনে আসিনি। আমি আপনাদের বোন, মেয়ে হিসেবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে আপনাদের পাশে থাকতে চাই।’

শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিলো যে বিরুদ্ধ শক্তিরা এখন পর্যন্ত ১৯ বার তাকে হত্যা চেষ্টা চালায়। মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে বাংলার মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা-আত্মত্যাগের বিনিময়ে আজও তিনি আমাদের মাঝে আছেন। আজও তিনি তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করে চলেছেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারসহ মানুষের ভাত ও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে “রুপকল্প-২০২১” এর মধ্যম আয়ের দেশকে “রুপকল্প ২০৪১” বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি উন্নত, আধুনিক, সমৃদ্ধ, অসাম্প্রদায়িক, কল্যাণকামী রাষ্ট্র গঠনে বিনিদ্র, বিরামহীন কাজ করে চলেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা। জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)