চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

শুল্কমুক্ত চাল আমদানির প্রভাব নেই বাজারে, ১২ টাকা দাম বেড়ে কমেছে ৪ টাকা

ভিয়েতনাম থেকে শুল্কমুক্ত সুবিধায় দুইমাসে দেড় লাখ টন চাল আমদানি এবং ভারত, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার ও নতুন করে যুক্ত হওয়া কম্বোডিয়া থেকে লাখ লাখ টন চাল আমদানির চুক্তির কোনো প্রভাব পড়েনি বাজারে। তিন মাসের ব্যবধানে চালে দাম ১২ থেকে ১৩ টাকা বেড়ে সেই বাড়তি দাম থেকে কমেছে মাত্র ৪ টাকা।

তিন মাস আগে পাইকারি পর্যায়ে মোটা চাল বিক্রি হয়েছিল ৩২ থেকে ৩৪ টাকা। মাঝখানে লাফিয়ে লাফিয়ে ৪৮ থেকে ৪৯ টাকায় উঠে, এখন বিক্রি হচ্ছে ৪৪ থেকে ৪৫ টাকায়। আর খুচরা পর্যায়ে বিক্রি হচ্ছে ৪৭ থেকে ৪৯ টাকায়। এই হিসাবে পাইকারি পর্যায়ে চালের দাম কমেছে ৪ টাকা আর খুচরা পর্যায়ে কমেছে ৩ থেকে ৪ টাকা।

বাজারের এই চিত্র সহজেই বলে দিচ্ছে শুল্কমুক্ত চাল আমদানির সুযোগ হঠাৎ লাফিয়ে ওঠা চালের বাজারে খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারেনি। সরেজমিনে চালের বাজার ঘুরে আড়ৎদার ও মিল মালিকদের সঙ্গে আলাপ করে দামের এই চিত্র পাওয়া গেছে।

চালের দাম বাড়ার জন্য সম্পূর্ণ খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। চালের বাজারের দাম বাড়ার প্রকৃত কারণ না খুঁজে তারা সরকারকে ভুল বার্তা দিয়েছে। আর বর্তমানে যে পরিমাণ আমদানির হাঁকডাক শোনা যাচ্ছে, আসলে সেই পরিমাণ চাল আমদানি হচ্ছে না।

বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা মাহমুদ হাসান রাজু চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, দাম বৃদ্ধির জন্য সম্পূর্ণভাবে দায়ী খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা। দেশে যখন প্রচুর পরিমাণে হাইব্রিড ধান উৎপাদন হয়েছে, তখন তারা বলছেন, মানুষের রুচি পরিবর্তন হয়েছে। এই ধান আর উৎপাদন দরকার নাই। এখন থেকে চিকন চালের ধান উৎপাদন বাড়াতে হবে। এরপর কৃষকরা প্রতি একরে ৮০ থেকে ১০০ মন উৎপাদন হওয়া হাইব্রিড ধান চাষ থেকে সরে এসেছে। কিন্তু চিকুন চালের ধান প্রতি একরে উৎপাদন হয় মাত্র ৪০ থেকে ৫০ মণ। এ কারণে এই ঘাটতি দেখা দিয়েছে। কারণ শহরের তুলনায় গ্রাম পর্যায়ে মোটা চালের ব্যাপক চাহিদার খবর কর্মকর্তারা রাখেন না।

চালের আড়ৎ
চালের আড়ৎ

‘খাদ্য কর্মকর্তারা সরকারকে খাদ্যের সঠিক ধারণা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ভুল বার্তা দেয়ায় খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া দেশ এখন ঘাটতিতে পড়েছে’-যোগ করেন তিনি।

শুক্রবার রাজধানীর কারওয়ান বাজার, হাতিরপুল ও কাঁঠালবাগানসহ কয়েকটি মার্কেটে সরেজমিনে দেখা গেছে, সাধারণত নিম্নবিত্তরা যে চাল খেয়ে জীবন ধারণ করে সেই মোটা চাল পাইকারি প্রতিকেজি ৪৪ থেকে ৪৫ টাকা আর খুচরা পর্যায়ে বিক্রি হচ্ছে ৪৭ থেকে ৪৯ টাকায়। আর মিনিকেট পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ৫৩ থেকে ৫৪ টাকা; খুচরায় বিক্রি হচ্ছে ৫৮ থেকে ৬০ টাকা। আটাশ চাল (ইরি জাতীয় চাল) পাইকারি ৪৯ থেকে ৫১ টাকা আর খুচরায় বিক্রি হচ্ছে ৫৩ থেকে ৫৪ টাকা।

বিজ্ঞাপন

চালের আড়ৎদাররা বলছে, সরকারি উদ্যোগে চাল কল স্থাপন করলে সিন্ডিকেট থাকবে না। কেজি প্রতি ব্যবসায়ীরা নির্ধারিত একটা মুনাফা করে থাকে। সেটা দাম বাড়লেও হবে, কমলেও হবে। কিন্তু চাল নিয়ে আসলে কোথায় চালবাজি হচ্ছে তা খুঁজে বরে করতে হবে সরকারকে। ভেতরের সমস্যা বের না করে যতই আমদানি করুক খুব বেশি কাজে আসবে না। এছাড়া সরকারি উদ্যোগে চালের পাইকারি ও মিল পর্যায়ে দাম নির্ধারণ করে দেয়ার দাবিও জানান তারা।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারের চালের আড়ৎ
রাজধানীর কারওয়ান বাজারের চালের আড়ৎ

এবার বোরো মৌসুমে আগাম বন্যায় সরকারি হিসাবেই হাওরে ছয় লাখ টনের মতো ধান নষ্ট হওয়ায় এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে (১০ টাকা কেজি দরের চাল) সাড়ে সাত লাখ টন চাল বিতরণ করায় সরকারি মজুদ তলানিতে নেমে আসে।

সংকট দেখা দেয়ায় চালের দামের লাগাম টেনে ধরতে ২৮ শতাংশ আমদানি শুল্ক থেকে ১৮ শতাংশ কমিয়ে ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। এরপর বিনা জামানতে ও বাকিতে চাল কেনার সুযোগ দেয় সরকার। বিদেশ থেকে কয়েক লাখ টন চাল আনার চুক্তি করা হয়। এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার কম্বোডিয়া থেকে এক বছরে ১০ লাখ টন চাল আমদানির চুক্তিপত্র করা হয়।

আমদানির পরও চালের দাম কমছে না কেন জানতে চাইলে কারওয়ান বাজারের হাজি ইসমাইল অ্যান্ড সন্সের মাঈন উদ্দিন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, এই প্রশ্নের জবাব ব্যবসয়ীরাও খোঁজে। আমদানি হচ্ছে সবাই জানে। কিন্তু যে পরিমাণ আমদানি হওয়ার কথা, সত্যিকারে তা আসছে কি-না খতিয়ে দেখা উচিত। কারণ উল্লেখযোগ্য হারে চাল আমদানি হচ্ছে। এখানে শুভঙ্করের ফাঁকি দেয়া হচ্ছে বলে মনে হয়।

আমদানির চুক্তি বেশি কাজে আসবেনা উল্লেখ করে ঠাকুরগাঁয়ের ন্যাশনাল রাইস মিলের মালিক মাহমুদ হাসান রাজু বলেন, সরকার শুল্ক কমিয়েছে। কিন্তু রপ্তানিকারক দেশগুলো দাম বাড়িয়েছে। ফলে আগের চেয়ে বেশি দামে কিনতে হয়। যে কারণে উল্লেখযোগ্যভাবে দেশের বাজারে দাম কমছে না।

কৃষকের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করার জন্য চাল আমদানি নিরুৎসাহিত করতে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে শুল্কহার ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করে সরকার। এর সঙ্গে রেগুলেটরি ডিউটি তিন শতাংশ যোগ হওয়ায় ব্যবসায়ীদের ২৮ শতাংশ শুল্ক গুণতে হয়। ফলে গত দেড় বছর ধরে বেসরকারি পর্যায়েও চাল আমদানি প্রায় বন্ধ ছিল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন-জুলাই এই দুই মাসে চাল দুই হাজারেরও বেশি কোটি টাকার চাল আমদানির এলসি খোলা হয়। এলসি নিষ্পত্তির পর দুই মাসে দেশে প্রায় দেড় লাখ টন চাল এসেছে। আমদানি পর্যায়ে রয়েছে আরো অনেক চাল।

ছবি: জসিম উদ্দিন বাদল

বিজ্ঞাপন