চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

শিল্পের জন্য শিল্পী

তাঁর জন্ম বাংলাদেশের একেবারে প্রান্তিক চাষি পরিবারে। ছয় ভাই, এক বোন নিয়ে পরিবার। ভাই-বোনদের সবার মধ্যে ছোটটি আমিনুল ইসলাম। শৈশবে মায়ের কাঁথা সেলাই দেখে তার মনে শিল্পের বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল। স্কুলে যাতায়াত শেষে কলেজের গন্ডি পার হয়েছেন। কিন্তু মনে তার সব সময় শিল্প আর সুন্দরের জন্য কিছু করার আকুতি! ঝিনাইদহের অমন এক অজ পাড়াগাঁয়ের বাসিন্দা হয়ে সে সুযোগ কোথায়! মেয়েদের সাজ-গোঁজ দেখেও আমিনুল ইসলাম অন্য মানুষের চেয়ে বেশী কিছু আবিষ্কার করতেন। বিশেষ করে হিন্দু পরিবারের আচার অনুষ্ঠানে যেসব আয়োজন তিনি সেখান থেকে তার ভালোলাগার উপাদান খুঁজে নিতেন।

কোন পত্রিকা পেলে সেখানে সুন্দর ছবি বা ডিজাইন দেখলে তা মনের আয়নায় গেঁথে নিতেন। গ্রামে বিয়ের সময় কনে সাজানোর জন্যও তার সুনাম ছিল। আলপনা আঁকতেন। যেখানে যা কিছু সুন্দর দেখতে পেতেন তা-ই তাঁকে আকর্ষণ করত। মায়ের কাঁথা সেলাই দেখে দেখে তিনিও হয়ে উঠেছিলান একজন সহজাত সূচি শিল্পী। গ্রামের মেয়েদের সাদামাটা সব নকশি কাঁথার ডিজাইনকে তিনি তার হাতের ছোঁয়া আর শিল্পী মন দিয়ে অন্য এক শৈল্পিক মাত্রা দিতে লাগলেন। যদিও বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে একজন পুরুষ মানুষের এসব কাজে আগ্রহকে তাচ্ছিল্যের চোখেই দেখা হয়। কিন্তু শিল্পের প্রতি অদম্য ক্ষুধা তাঁকে দিয়ে এসবই করিয়ে নেয়। মানুষের এসব মনোভাবকে তিনি পরোয়া করেননি।

বিজ্ঞাপন

গাছ বাড়ি

বিজ্ঞাপন

এক পর্যায়ে ১৯৯০ সালে তিনি আরও লাখো হতভাগ্য মানুষের মত ভাগ্যান্বেষণে ‘রাজধানীর বুকে’ আসেন। কঠিন জীবন সংগ্রাম। একদিন আড়ং এর শো রুম দেখে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন অনেকক্ষণ। আহা… যদি ওই অভিজাত শোরুমের পুতুলের পরনে তার ডিজাইন করা একটি পোশাক তিনি পরিয়ে দিতে পারতেন! তিনি জীবনকে সার্থক বলে মনে করতেন! একদিন সে সুযোগও এসে যায়। তিনি আড়ং এর অন্যতম খ্যাতিমান ও নির্ভরযোগ্য সাপ্লায়ার (প্রডিউসার) হয়ে ওঠেন। তার দক্ষতা, পরিশ্রম, সততা, মেধা আর অধ্যবসায় তাকে এই জায়গায় নিয়ে আসে।

আড়ং এর সাথে কাজ করার ফলেই তিনি তার শিল্পকে যোগ্য মর্যাদায় নিয়ে আসতে সক্ষম হন। বলাই বাহুল্য যে তার এই পথ মোটেই মসৃণ ছিল না। পদে পদে ঠকেছেন, প্রতারিত হয়েছেন, বিশ্বাসভঙ্গ হয়েছে। তবে শিল্প আর উন্নত রুচির প্রতি তার যে ভালবাসা আর আস্থা সেটা তাঁকে সব সময় ভেতর থেকে উৎসাহ আর সাহস জুগিয়ে গেছে।

আমিনুল ইসলামের সাথে লেখক

বিজ্ঞাপন

ঝিনাইদহের শৈলকোপা থানার লক্ষণদিয়ায় তাঁর গ্রামের বাড়ির সূচি শিল্পীদের তিনি সংগঠিত করে প্রশিক্ষণ দেন। এভাবে তিলে তিলে কাজ করে এক দক্ষ কর্মী বাহিনী তিনি তৈরি করেন। পৈতৃক সূত্রে বাড়িতে তিনি ১০ কাঠা জমি পেয়েছিলেন। আশেপাশে আরও কিছু জমি তিনি কিনে সেখানে একটি সুন্দর বাড়ি তৈরি করেন ২০১৪ সালে, উদ্দেশ্য ছিল এখানে গ্রামের মহিলারা এসে সেলাইয়ের কাজগুলো করবেন। তবে বাস্তবে দেখা গেল গ্রামের মহিলারা বাড়িতে বসেই কাজ করতে আগ্রহী। বাড়িটি খালিই পড়ে রইল। তখন বৃক্ষপ্রেমী আমিনুল ইসলাম এটাকে এক গাছের সংগ্রহশালা করে তোলার যুদ্ধে নামেন।

ইতিমধ্যে তার এই বাড়ির মোট জমির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫ বিঘা। তার এই বাড়িতে এখন পাঁচ হাজারের বেশি গাছ আছে। দেশ বিদেশের ৫০০’র বেশি প্রজাতির গাছ তার বাড়িকে এক সবুজের স্বর্গে পরিণত করেছে। গাছে গাছে পাখির বাসা। মানুষের মুখে মুখেই এই বাড়ির নাম গাছবাড়ি। নানা জায়গা থেকে প্রকৃতিপ্রেমীরা এই বাড়ি দেখতে আসেন। আমিনুল গাছের ভাষা বুঝতে পারেন। তাঁকে পেলে গাছেরাও হেসে ওঠে, তিনি বৃক্ষের সেই হাসি দেখতে প্রতি মাসেই অন্তত একবার ঢাকা থেকে বাড়িতে আসেন। গাছের যত্ন নিয়ে, নিজের জন্য প্রাণ শক্তি আহরণ করে ২/৩ দিন পরে ঢাকায় ফেরেন। তার ঢাকার বাড়িটিতেও গাছেদের রাজত্ব। ছাদে, বারান্দায়, জানালায় সর্বত্র গাছ আর গাছ!

নকশিকাঁথায় মুক্তিযুদ্ধ

আমিনুল স্বপ্ন দেখতেন তাঁর গ্রামকে তিনি এক ফুলের গ্রাম বানাবেন। সে উদ্দেশ্যে রাস্তার ধারে, স্কুল কলেজের চারিপাশে কৃষ্ণচূড়া, সোনালু, কেশিয়া, অশোক গাছের সারি লাগিয়েছিলেন। সাধারণ মানুষ এসবের গুরুত্ব না বুঝলে যা হবার তাই হয়েছে। বেশির ভাগ গাছই মরে গেছে, মানুষ ইচ্ছে করে অনেক নষ্ট করেছে। মানুষের এসব ক্ষুদ্রতায় তিনি মনে কষ্ট পেলেও তা নিজের মধ্যেই রাখেন। একান্ত আপন কাউকে পেলে শেয়ার করেন।

বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে এমন ২/১ জন আমিনুল ইসলাম থাকলে এদেশ সত্যিকার অর্থে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ হয়ে উঠত। এক পুত্র এক কন্যার জনক আমিনুল ইসলাম সংগীত অন্তপ্রাণ একজন কারু শিল্পী। তাই সংগীত শিল্পীর প্রতি তাঁর ভালবাসা অকৃত্রিম।

তিনি রাঁধেন অসাধারণ। তাঁর ঘর গোছানো দেখলে অনেক তাবড় তাবড় ডিগ্রীধারীও মাথা নত করবেন বলে আমার বিশ্বাস। সম্প্রতি তিনি তাঁর নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ‘বাংলা সেলাই’ এর শুভ সূচনা করেছেন। করোনার কারণে অনলাইন প্রচেষ্টা। মানুষ যত বেশি নিজের সংস্কৃতিকে জানবে তত নিজে সমৃদ্ধ হবে, দেশ এগিয়ে যাবে। বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।