চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

শপথের পথ বেয়ে কোন গন্তব্যে বিএনপি

বিএনপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমান বৃহস্পতিবার শপথ নিলেন। তার শপথ নেয়ার মাধ্যমে ঐক্যফ্রন্টের ৮ জনের মধ্যে তিনজনের শপথ নেয়া শেষ হলো। বাকি রইলো ৫ জন। শপথ নেয়ার স্বাভাবিক সাংবিধানিক সময়সীমা শেষ হবে মাস শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। স্বাভাবিক কারণেই এই ৫ জনের দিকে সবার দৃষ্টি। কে শপথ নিচ্ছেন তার পর? কিংবা আর কেউ কি শপথ নেবেন?

ঐক্যফ্রন্ট থেকে নির্বাচিত সুলতান মোহাম্মদ মনসুর ৭ মার্চ শপথ নেয়ার পর তুমুল ঝড় শুরু হয় ঐক্যফ্রন্টভুক্ত দলগুলোর মধ্যে। বিএনপি থেকেও দাবি করা হয় তাকে বহিস্কারের। গণফোরাম সুলতান মনসুরকে বহিস্কারও করে। কিন্তু তারপরই যখন মোকাব্বির খানও শপথ নিলেন তখন কিছুটা থমকে যায় তারা। তিরস্কারের মাত্রাটাও কেমন ঝিমিয়ে পড়ে। শিগগিরই তার বিরুদ্ধে দলীয় ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণা কার্যকর হওয়া থাক দূরের কথা, শুক্রবার তাকে দেখা গেলো গণফোরামের বিশেষ কাউন্সিল অধিবেশনে মঞ্চে আসীন। আর যিনি হুংকার দিয়েছিলেন সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবেন বলে, সেই সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসীন মন্টুই পদচ্যুত হচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

এরমধ্যে বিএনপি থেকে নির্বাচিত এমপিগণ শপথ নেবেন কি নেবেন না এ নিয়ে নরম-গরম মন্তব্য বিএনপি থেকেই করা হতে থাকে। সর্বশেষ জাহিদুর রহমান শপথ নেয়ার পর মনে হলো কঠোর ভাষায় শপথের বিরোধিতাকারী বিএনপি নেতাদের মুখে ছাই দিয়ে নরমদেরই বিজয়ী করলেন তিনি। কিন্তু বিএনপি নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায় তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতে গিয়ে বললেন, যারা দলের সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করে শপথ নিয়েছে কিংবা নেবে তারা গণদুশমন। একবার মন্তব্য করা হলো, জাহিদুর রহমান কিংবা অন্য কেউ শপথ নেবেন এমন তথ্য তাদের জানা ছিল না। কিন্তু আমরা দেখেছি, ২০ এপ্রিলই গণমাধ্যমে ৬ এমপি সম্পর্কে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। যেখানে আভাসে ইঙ্গিতে তাদের শপথ নেয়ার পক্ষেই মন্তব্য করতে দেখা গেছে। অথচ মাত্র ক’দিন আগেও তাদের মুখ থেকেই বেরিয়েছে বিএনপির কেউ শপথ নেবেন না। কারণ দলের প্রতি তাদের আনুগত্য আছে এবং তারা ‘শহিদ’ জিয়ার সৈনিক।ঐক্যফ্রন্ট

জিয়ার সৈনিকদের একজন শপথ নিয়ে গণদুশমন হয়ে গেলেন। বাকি ৫জন কি থাকবেন জিয়ার সৈনিক হিসেবে? নানা হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে জবাব খুঁজতে গিয়ে। জাহিদুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী মির্জা ফখরুল ছাড়া বাকি ৪ জনই শপথ নিতে যাচ্ছেন। এমন আরেকটা প্রশ্নও এতে করে হাজির হচ্ছে।

জাহিদুর রহমান বলেছেন, ভোটারের চাপ আছে শপথ নেয়ার জন্য। বলেছেন, তিনি ৩৪ বছর ধরে বিএনপির রাজনীতি করেন। ১৯৯১ সাল থেকে ৪ বার নির্বাচন করেও নির্বাচিত হতে পারেননি। আর তার আসন থেকে এই প্রথম বিএনপির একজন প্রার্থী বিজয়ী হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে তিনি ভোটারদের চাপে পড়ে শপথ নিতে বাধ্য হয়েছেন। বাকি ৪ জনও কিন্তু প্রকারান্তরে ভোটারের চাপের কথা প্রকাশ করেছেন। আবার সরাসরি দলীয় সিদ্ধান্তকে অমান্যও করছেন না। যদি জিয়ার সৈনিকের তকমাটা ছিটকে পড়ে সেই আশঙ্কায়। দলীয় সিদ্ধান্তকে অস্বীকার না করেও তাদের দৃষ্টি যে পার্লামেন্টের দিকেই ধাবিত হচ্ছে সেটাও স্পষ্ট।

এক্ষেত্রে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ থেকে নির্বাচিত এমপি আমিনুল ইসলামের মন্তব্য মনে করিয়ে দেয় তিনি শপথ নিতে যাচ্ছেন। আবার তিনি দলীয় পরিচয়টাও ছাড়তে চান না। যে কারণে শপথ না নিলে তার কী পরিণতি হবে সেই কথাটি সবার সামনে তুলে ধরেছেন। ডয়চে ভেলেকে দেওয়া বক্তব্যটি এখানে উদ্ধৃত করা যায়। তিনি বলেছেন, ‘শপথ না নিলে তারা (এলাকাবাসী) আমাকে মারবে। শপথ না নিলে তারা আমাকে এলাকায় যেতে নিষেধ করেছে।’

একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে জনগণের কাছে তিনি দায়বদ্ধ। রাজনৈতিক দল হিসেবে জনগণের ইচ্ছাকে সম্মান জানাতে হয়। দুটো দিকই তিনি স্পষ্ট করে দিলেন। একদিকে তিনি জানিয়ে দিতে চাইছেন, তাকে এলাকায় থাকার প্রয়োজনে শপথ নিতে হবে। অন্যদিকে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন হিসেবে শপথ নিতে হবে, সেই সত্যটিও যেন দল বিবেচনা করে তাও পরোক্ষভাবে বুঝিয়ে দিলেন।

বিজ্ঞাপন

নবনির্বাচিত এই সংসদ সদস্য দলের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের অপেক্ষা করছেন। আবার এও বলছেন, যদি দল শপথ নেয়ার পক্ষে না থাকে, অর্থাৎ বর্তমান সিদ্ধান্তকেই অটুট রাখে তাহলে তাদের অবস্থান কী হবে। তিনি এটা বলেননি, সিদ্ধান্ত বহাল থাকলে তিনিও শপথ নেবেন না। বরং বললেন, সিদ্ধান্ত অপরিবর্তিত থাকলে তিনি কী করবেন এখনো সিদ্ধান্ত নেননি। তার এই বক্তব্য প্রমাণ করে, দল সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না করলে তিনি পরিবর্তন করতে যাচ্ছেন। অর্থাৎ তার শপথ নেয়াটা সময়ের ব্যাপার মাত্র।

বিএনপি থেকে নির্বাচিতদের মধ্যে দলের মহাসচিবের পর সিনিয়র নেতা হিসেবে হারুণ অর রশিদের নাম আসে। তিনিও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম-মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনরত হারুণ অর রশিদের পদক্ষেপ অবশ্যই জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বসহ বিবেচ্য। তার বক্তব্যও তো নড়বড়ে।

কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম-মহাসচিবও বলেন, ‘আমাদের চিঠি দিয়ে কিছু বলা হয়নি। তাই আমরা শপথ নেইনি। আর যদি দলের এই সিদ্ধান্তই বহাল থাকে তাহলে ব্যক্তিগতভাবে আমি শপথ নেবো কিনা সে ব্যাপারেও এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।’ এতে কি প্রমাণ হয় না, দলের সিদ্ধান্তকে তিনি সন্তোষজনক মনে করছেন না। আর এখনো তিনি অপেক্ষা করছেন দল থেকে নিশ্চয়ই শপথ নেয়ার সিদ্ধান্তই হবে। আর কতটা আশাবাদী তিনি তার আরেকটি বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়। তিনি বলেছেন, ৩০ তারিখও যদি দল সিদ্ধান্ত নেয় তাহলেও শপথ নিতে সমস্যা হবে না।

এখানে কিছু বক্তব্য বিশ্লেষণের দাবি রাখে বলে মনে করি। বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম-মহাসচিব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ। সেই পদে থাকা নেতা যখন বলেন, কেন্দ্র থেকে তাদের কোনো চিঠি দেওয়া হয়নি তখনই প্রশ্ন আসে, কেন্দ্রও কি শপথ নেয়ার প্রশ্নে ইতিবাচক। হয়তো তখন প্রশ্ন আসতে পারে- স্থায়ী কমিটিতে তো সিদ্ধান্ত হয়েছে। আবার এমন প্রশ্নও তো আসতে পারে, স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত যাদের উপলক্ষ্য করে সেই এমপিগণকেই আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হলো না এর পেছনে কারণ কী? এক্ষেত্রে দুই ধরনের ব্যাখ্যা হতে পারে। প্রথমতঃ আসলে স্থায়ী কমিটিও প্রকারান্তরে শপথ নেয়ারই পক্ষে। কিন্তু তারা যেহেতু আগেই বলে দিয়েছে কথিত ভোটারবিহীন নির্বাচনকে বৈধতা তারা দিতে পারেন না, তাই তাদের কেউ শপথ নেবেন না। এখন দলীয়ভাবে শপথের পক্ষে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না নৈতিকভাবেই। তাই বিষয়টিকে ব্যক্তি পর্যায়ে ফেলে দিয়েছেন।

আরেকটি বিশ্লেষণ আছে বিশেষজ্ঞদের। তারা মনে করছেন, শপথ না নেয়ার বিষয়টি স্থায়ী কমিটিতে সিদ্ধান্ত আকারে এসেছে মূলত লন্ডনের পরামর্শে। আর এটা করা হয়েছে মূলত দলের মহাসচিবকে ধীরগতিসম্পন্ন করার উদ্দেশে। তাদের মতে- যদি মির্জা ফখরুল ইসলাম সংসদে যান, তাহলে অঘোষিতভাবে তিনিই হবেন বিরোধী দলীয় নেতা। রাজনৈতিক সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে তিনি হয়ে যাবেন বিএনপির প্রধান নেতা। যা হয়তো কোনো কোনো নেতার মনপুত নয়। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচিতদের তলে তলে উস্কে দেওয়া হয়েছে শপথ নেয়ার জন্য। অন্যদিকে স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত দলের মহাসচিব হয়ে অমান্য করতে পারবেন না তাই তিনি শপথও নিতে পারবেন না।

এই পরিস্থিতিতে মির্জা ফখরুলকে বলি হতে হবে। এতে করে বিএনপির অংশগ্রহণ যেমন থাকবে, তেমনি নতুন শীর্ষ নেতৃত্ব বদল হওয়ার ক্ষীণ সম্ভাবনাটা আরো ক্ষীণতর হবে। এই পরিস্থিতিতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে কোন পথে যায় বিএনপি।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View