চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বরগুনায় রিফাত হত্যার মূলে নারী নাকি মাদক?

রিফাত হত্যা মামলায় মিন্নির মা-বাবাকে আইনের আওতায় এনে বিচারের দাবি জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছেন নিহত রিফাতের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ। রোববার (২১ জুলাই) দুপুর দেড়টার দিকে বরগুনা প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানান তিনি। এর আগে তিনি তারই প্রধান সাক্ষী মানা পুত্রবধূ মিন্নিকে গ্রেপ্তারের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন৷

মিন্নি এখন রিমান্ড ভোগ করে জেলহাজতে রয়েছে৷রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির খুনীদের হাত থেকে স্বামীকে বাঁচানোর চেষ্টার ভিডিও প্রকাশ হলে আলোচনার ঝড় বয়ে যায় সর্বত্র৷ কিন্তু এখন স্বামীর হত্যাকাণ্ডে খুনী হয়ে নিজেই গ্রেপ্তার হয়ে আছেন। কেন এমনটি ঘটছে? সাক্ষী হিসাবে ডেকে নিয়ে তাকে আসামি করে দেয়া হল! আসামির কথায় সাক্ষী হওয়া বিষয়টা অভিনবই বটে৷ মিন্নির পক্ষে কোন আইনজীবী দাঁড়ালো না৷ সর্বশেষ ঢাকা হতে আইনজীবী আসার ঘোষণা হল৷ বরগুনা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মিন্নির আইনজীবী হল৷ এর পরপরই তাকে এমপি ধীরেন্দ্র নাথ শম্ভু তাকে অফিসে ডেকে নিয়ে গেল৷ মিন্নির আইনজীবীর সাথে রুদ্ধদ্বার বৈঠক হল৷ মিন্নির ব্যাপারে এমপি মহোদয়ের কেন এত এই অতি আগ্রহ?

বিজ্ঞাপন

মিন্নিকে নিয়ে সাব্বির আহমেদ নয়ন (নয়ন বন্ড) ও রিফাত শরীফের দ্বন্দ্ব কি নারী নিয়ে না মাদক নিয়ে? ‘০০৭’ নামের এই গ্রুপটিতে কি নিহত শরীফও ছিল?

খবর বেরোচ্ছে, রিফাত শরীফ হত্যার প্রধান আসামি নয়ন বন্ডের নামে ৮টি ও রিফাত ফরাজীর নামে ৪টি ও নিহত রিফাত শরীফের নামে বরগুনা থানায় ২টি মামলা রয়েছে। রিফাত শরীফ ও রিফাত ফরাজী দুজনেই একই মামলার আসামি এমন ঘটনাও নাকি রয়েছে৷ এগুলোর সত্যতা অসত্যতা নিরুপণ প্রয়োজন নয় কি? ১১ মে রাতে ১০০টি ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হয়ে ১৯ দিন হাজত খেটে বেরিয়ে এসেছিলেন রিফাত শরীফ। এমন কথাও শোনা যাচ্ছে নয়ন বন্ডের লোকেরা তাকে ইয়াবা দিয়ে ফাঁসিয়েছিল। খুন হওয়ার অল্প কিছুদিন আগেই রিফাত শরীফ তার সঙ্গীদের নিয়ে রিফাত ফরাজীকে পিটিয়েছিল৷ রিফাত ফরাজীকে এই পেটানোর ঘটনার দুই মাস আগেই ঘটেছিল রিফাত শরীফ গ্রেপ্তারের ঘটনা।এই  গ্রেপ্তারের পেছনেও নয়ন ও রিফাত ফরাজীর হাত ছিল বলে মনে করল রিফাত শরীফ৷ আর তাই জুন মাসের শুরুতে কারাগার হতে বেরিয়েই রিফাত শরীফ তার সহযোগীদের নিয়ে রিফাত ফরাজীকে হাতুড়ি পেটা করেছিল। এই ঘটনার কয়েক সপ্তাহ যেতে না যেতেই খুন হল রিফাত শরীফ৷ বিষয়টা অনুসন্ধান করার মতো নয় কি?

হামলার ভিডিওতেও দেখা যায়, নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজীকে রিফাত শরীফকে কোপাতে, সেখানে রিশান ফরাজীসহ আরও কয়েকজন তরুণও ছিলো৷ ভিডিওতে দেখা গেছে মিন্নি খুনীদের থামাতে চেষ্টা করছে৷ এখন কেউ কেউ বলছে মিন্নির এই থামানোটা নাটক ছিল৷ নইলে খুনীরা কেন তাকে কোপালো না? খুনীরা কেন কোপালোনা এই জবাবও কি মিন্নি দেবে? তবে কি তারা রিফাতের মত মিন্নিকেও কুপিয়ে খুন করে ফেললে খুশি হতো? মিন্নি যদি দায়িই হত রিফাতের বাবা মামলায় কেন তাকে আসামি না করে প্রধান সাক্ষী করল সেদিন? এখন সব দায়ের দায়ি হয়ে গেল মিন্নি৷ কেউ কেউ তার চরিত্র নিয়ে কথা বলছেন৷ পরকিয়া নিয়ে কথা বলছেন৷ কিন্তু বিচারটা কি চরিত্রহীনতার না খুনের? পুলিশ কেন মিন্নিকে দায়ি বানাতে উঠেপড়ে লেগেছে? রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশ তাকে যেভাবে বলতে বলেছে সেভাবেই বলেছে, আদালতে এমন কথাই বলল আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি। না বললে নাকি আরও ১০ দিনের রিমান্ডে নেয়া হবে বলে হুমকি দেয়া হয়েছে তাকে। মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর কারাগারে মেয়ের সঙ্গে দেখা করে এসে এমন তথ্যই দিলেন সাংবাদিকদের৷ তিনি বলেন, ‘স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে কী বলেছে, তা মেয়ের কাছে জানতে চেয়েছি। জবাবে সে বলেছে, পুলিশ যেভাবে বলতে বলেছে, জবানবন্দীতে সেভাবেই বলেছি।

বিজ্ঞাপন

তবে কি মিন্নিকে আরেক জজ মিয়া বানানো হচ্ছে? জজ মিয়াকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তুমি কি গ্রেনেড হামলা করেছো? জজ মিয়া বলেছিলো, হ্যাঁ করেছি৷ আমার চৌদ্দগোষ্ঠী এ হামলায় জড়িত৷ ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগ আয়োজিত সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল সেদিন৷ তিনি প্রাণে বেঁচে গেলেও সে হামলায় ২৪ জন নিহত ও কয়েক শ’ মানুষ আহত হয়েছিল৷ মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে না ফেরার দেশে চলে গিয়েছিলেন মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভি রহমান। তখন এ হামলার মূল দায়িদের বাঁচাতে শুরু হয় এসব পার্থ নাটক ও জজ মিয়া নাটক৷ এই হত্যাযজ্ঞের দু-একদিন পর রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের একটি কম্পিউটারের দোকান থেকে গ্রেপ্তার করা হয় চাকরির খোঁজে গ্রাম থেকে আসা স্নাতক ডিগ্রিধারী যুবক পার্থ সাহাকে। তার অপরাধ, সে নাকি গ্রেনেড হামলার সঙ্গে জড়িত এ এমন তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাকে কয়েকদিন অজ্ঞাতস্থানে রেখে অকথ্য নির্যাতন চালায় মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায় করতে। তবে এই কথিত স্বীকারোক্তি তখন মিডিয়াকে জানানো হয়নি। বলা হয়েছিল তদন্তের স্বার্থে তা গোপন রাখা হচ্ছে।

প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করতে তৎকালীন পুলিশ সরকারের ফরমায়েশ মতো কাজ করছিল সেদিন৷ দীর্ঘদিন কারাভোগের পর উচ্চ আদালতের নির্দেশে জামিনে মুক্ত হয় অসহায় পার্থ সাহা। প্রথমদিকে পার্থ বা তাঁর পরিবারের পাশে কেউ দাঁড়ায়নি৷ মূলকথা দাঁড়াতে দেয়া হয়নি৷ একপর্যায়ে তার পাশে দাঁড়ালেন ড. কামাল হোসেন। পাশে দাঁড়ালো মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)। এর প্রেক্ষিতেই মুক্তি পায় পার্থ সাহা৷ পার্থ নাটকে ব্যর্থ হয়ে পরে সাজানো হল ‘জজ মিয়া নাটক’৷ নোয়াখালীর প্রত্যন্ত পল্লী হতে ‘জজ মিয়া’ নামের এক দরিদ্র বেকার যুবককে ধরে এনে নির্যাতন করে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করে তারা৷ কিন্তু এতেও কি শেষ রক্ষা হয়েছে? পরবর্তীতে কি সঠিক তথ্য বেরোয়নি তখন? উন্মোচিত হয়নি কি প্রকৃত খুনীদের মুখোশ?

মোজাম্মেল হক কিশোরকে উদ্ধৃত করে প্রায় সকল জাতীয় দৈনিকে খবর বেরিয়েছে, মিন্নিকে প্রচণ্ড মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছে। মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হক কিশোরের ভাষ্য মতে, গতকাল ২০ জুলাই কারাগারে দেখা করতে গেলে মিন্নি তার বাবা-মা ও অন্য স্বজনদের বলেছেন, রিমান্ডে তাকে ভয় দেখানো হয়েছে যে, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী না দিলে এরপর ১০ দিনের রিমান্ডে আনা হবে। এ কারণে নির্যাতনের হাত থেকে রেহাই পেতেই সে এমন জবানবন্দী দিয়েছে।

মোজাম্মেল হোসেন কিশোর সাংবাদিকদের বলেন: নির্যাতনে মিন্নি এতোটাই অসুস্থ হয়েছে যে, সে হাঁটতে পারছে না। কারাগারে দেখা করতে গেলে দুই নারী কারারক্ষী মিন্নিকে ধরে নিয়ে তাদের কাছে এনেছে। তিনি আরো বলেন, বরগুনার পুলিশের প্রতি তার আস্থা নেই।

সাংসদ শম্ভু ও তার পুত্রকে সরাসরি দায়ি করে মোজাম্মেল হোসেন কিশোর বলেন, সবই শম্ভুবাবুর খেলা। রিফাত হত্যার প্রকৃত আসামীদের ও নিজপুত্র সুনামকে সকল অপকর্ম থেকে রক্ষার জন্য তিনি এসব করছেন। কিশোর দাবি করেন, তার মেয়ে নির্দোষ। মিন্নি সহ তার গোটা পরিবার ষড়যন্ত্রের শিকার। এ ঘটনার বিচারবিভাগীয় তদন্ত চান তিনি৷ তার এসব কথার প্রেক্ষিতে এখন তাকেও গ্রেপ্তারের দাবি উঠছে৷ তবে কি মিন্নির বাবাও গ্রেপ্তার হচ্ছে? ইস্যুটা হচ্ছে রিফাত হত্যা৷ এক্ষেত্রে তার ব্যাপারে কি অভিযোগ আনা হবে তখন? বলা হবে মেয়েকে হত্যায় প্ররোচনা দিয়েছে?আসামি পক্ষের উকিলকে বাদী পক্ষের উপস্থিতিতে এমপি অফিসে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে কি আলোচনা হয়েছে? কোন পথে যাচ্ছে রিফাত হত্যা ইস্যুটি৷ মিন্নি কি তবে আরেক পার্থ সাহা ও জজমিয়ার ভূমিকায়?রিফাত হত্যার মূলে কারা? এ হত্যা কি নারী নিয়ে না মাদক নিয়ে? রিফাতও কি ০০৭ গ্রুপে ছিল? পরে বেরিয়ে গেছে? রিফাত কি সত্যিই মাদক ব্যবসায় জড়িত ছিল? ০০৭ গ্রুপ ছেড়ে সে কি মাদক ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছিল না নিজে আলাদাভাবে শুরু করেছিল? মিন্নি কি রাজনৈতিক কর্তৃত্ববাদের বলি? রিফাত হত্যা ও মিন্নির সাক্ষী হতে আসামি হওয়া, আইনজীবীদের আইনী সহায়তা না দেয়া, পরবর্তীতে ঢাকা হতে আইনজীবী যাওয়া ও মিন্নির কয়েকজন আইনজীবীর সাথে রুদ্ধদ্বার বৈঠক এসবের রহস্য উদঘাটন হবে কি? ধীরেন্দ্রনাথ শম্ভুর ছেলে জেলা আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী নেতা ও আইনজীবী৷ তার প্রভাবেই মিন্নির পক্ষে কোন আইনজীবী দাঁড়ায়নি৷ পরবর্তীতে মিন্নির আইনজীবী হতে চাওয়া উকিলদের সাথে বৈঠক করে কী বলেছেন তাদের? নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা আওয়ামী লীগের একজন সিনিয়র নেতা সংবাদপত্রে বলেন, দলের ভেতরে কিছুটা কোণঠাসা হয়ে যাবার পর আধিপত্য ধরে রাখতে অপরাধী চক্র গড়ে তোলেন শম্ভুর ছেলে। সেজন্য এই সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের কর্মকাণ্ড আড়াল করতেই রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডকে নারীঘটিত বিষয় হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নিজের নাম প্রকাশ করে বক্তব্য দিতে খুব কম মানুষই আগ্রহী বরগুনা শহরে। এমনই ভীতি এমপি শম্ভু ও তার ছেলের প্রতি৷ তার বিরুদ্ধে নাম প্রকাশ করে কথা বলার সাহসও নেই কারও৷ নুসরাত হত্যা নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, আমি হস্তক্ষেপ না করলে মেয়েটাকে চরিত্রহীন বানিয়ে দিত৷ কিন্তু কারা ও কোন ক্ষমতার বলে বলীয়ান এই চরিত্রহীনতার কারিগরেরা৷ মিন্নি কি এই কারিগরদেরই অসহায় শিকার নয়? এক্ষেত্রে কারিগরদের স্বার্থ কী? জাতির প্রত্যাশা তা উন্মোচিত হোক৷

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View