চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

রাস্তার পাশের অসহায় মুখগুলো

.
অদৃশ্য আর ভয়ানক শক্তিশালী করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়ছে দেশ, লড়ছে জাতি। মরণপণ এই লড়াইয়ের শেষ কোথায়? জয়ে নাকি পরাজয়ে? নিশ্চিত ফলাফল কেউ তা জানে না। তবুও অনিশ্চিত এই  লড়াইয়ে সামিল আজ সবাই। সেখানে দৃশ্যমান কোনো ঐক্য বা নেতৃত্ব নেই। আসলে এই লড়াইয়ের মাঠে সবাই নেতা, সবাই যোদ্ধা। যার যার জায়গা থেকে, যার যার মতো করে লড়ছে প্রত্যেকে। অথচ ফেব্রুয়ারি পেরিয়ে মার্চের শুরুতেও আমরা ভাবতে পারিনি; এমন কঠিন এক লড়াইয়ের মুখোমুখী হতে হবে পুরো জাতিকে। তাও আবার অফিস-আদালত-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-কলকারাখানা-যানবাহন সবকিছুই বন্ধ করে দিয়ে। কিন্তু এতকিছুর পরও কি করোনাভাইরাসকে ঠেকানো যাচ্ছে?

২.
করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে চলা যুদ্ধে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা। অফিসিয়ালি এবং ব্যক্তিগতভাবে তা মেনে আজ হোম অফিসের এক মাস পূর্ণ করেছি। স্কুলশিক্ষক স্ত্রী আর স্কুলপড়ুয়া দুই সন্তানও তাই। তারাও নিজ নিজ কাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। সত্যি বলতে কি- কল্পনাতেও আমরা কখনো ভাবিনি এমন করে বাসায় থেকে এত বড় একটা সময় অফিস করতে হবে। এমনকি অবচেতন মনের স্বপ্নবিলাসেও এমন দুঃসাহস দেখাতে পারেনি-কর্মব্যস্ত এই ঢাকা শহরে তারচেয়েও বেশি ব্যস্ত মানুষগুলো সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে ঘরবন্দী থাকবে। অথচ একটানা ঘরে থাকাই এখন বড় বাস্তবতা। কারো কিছুই করার নেই। সময়ের কাছে, প্রকৃতির কাছে আজ আমরা বড় অসহায়।

বিজ্ঞাপন

৩.
এমন অসহায়ত্ব আর বন্দী জীবনকে কিছুটা ভুলে থাকতে অসংখ্যবার বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াই। সামনের বিশাল রেইনট্রির সবুজ-সতেজ পাতা, গোলাপী-সাদা ফুল, পাখির কলকাকলি আর সদ্য জন্ম নেওয়া কাকের ছানা নতুন স্বপ্ন দেখায়। কিন্তু পরক্ষণেই আবার সেই স্বপ্ন ফিকে হয়ে যায়; যখন দেখি সামনের রাস্তা ধারে অসহায় মুখগুলো এগিয়ে চলছে সামন্য একটু সাহায্যের আশায়। প্রথম দেখাতেই বুঝতে পারি, তাদের কেউ কেউ এর আগে কখনো মানুষের কাছে হাত পাতেনি। লাজ-লজ্জা ঝেড়ে হাতটা এগিয়ে দিলেও তার দীর্ঘ ঘোমটার আড়ালে আরও দীর্ঘ কষ্ট-যন্ত্রণাকে কিছুতেই আড়াল করতে পারে না। নির্বাক দৃষ্টি নিয়ে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে অদৃশ্য ভাগ্যবিধাতার দিকে।

৪.
অঘোষিত এই লকডাউনের সময়ে নিত্যপণ্য বলতে গেলে সবই বাসার সামনে পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে সবজি-মাছ-ফল ইত্যাদি। আগেও এসব পাওয়া যেত। তবে এখন সংখ্যাটা অনেক বেশি। কারণ বাজার-দোকান বন্ধ হওয়ায় অনেকেই এখন নিরুপায়। সবকিছু বন্ধ হলেও সংসারে খরচ তো বন্ধ নেই। তাই নিজের মর্যাদার সাথে না গেলেও নতুন ভ্যান কিনে বা ভাড়া করে তারা নেমেছে রাস্তায়। সামান্য সবজি, মাছ বা অন্য কিছু বিক্রি করে যা আয় হয়- তাই দিয়েই কোনো রকমে চলা। তাদেরই একজন বাসার সামনে এসে সবজি বিক্রি করছেন। একজন ক্রেতা মিতালী (ছদ্মনাম) দাম জিজ্ঞাসা করতে অসহায়ের মতো বলে দিলেন, ‘আপা একটু বেশিই চাইছি, খুব ঠেহায় পইড়া ভ্যান নিয়ে বাইর হইছি। দাম কইরেন না।’ সেই অসহায় মুখের দিকে আর তাকাতে পারেনি মিতালী। সবমিলিয়ে যা দাম হয়েছে, তারচেয়েও বেশি দিয়ে দ্রুত পায়ে বাসায় ঢুকে গেছে।

বিজ্ঞাপন

৫.
সময়ের কাছে অসহায় সবজি বিক্রেতার কাছ থেকে পালিয়ে এলেও নিজের কাছ থেকে পালাতে পারে না মিতালী। বারবার সেই মুখটিই যেন তার সামনে ভেসে উঠছিল। সকালে চিন্তা করে রেখেছিল, আজ দুপুরে বড় রুইমাছ রান্না করবে। পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে ডিপফ্রিজ থেকে সেই মাছ বের করে রেখেছিল জমে থাকা বরফ গলানোর জন্য। ওই মাছ আর কাটতে পারলো না। আবারও তা ফ্রিজেই রেখে দেয়। তার মনে এসে ভিড় করে অনিশ্চিত এক ভবিষ্যতের ভাবনা। এই পরিস্থিতিতে কারো জীবনই যে নিশ্চিত না, মিতালী উপলব্ধি করতে থাকে। মনে মনে প্রন্তুতি নেয় নতুন এক যুদ্ধের। যে যুদ্ধে এই সবজি বিক্রেতার সাথে তারও কোনো পার্থক্য নেই।

৬.
এলাকার খবরাখবর নিতে পাবনার এক মফস্বল শহরে ক্ষমতাসীন দলের নেতৃত্ব পর্যায়ে থাকা একজন বন্ধুকে ফোন করেছিলাম। করোনাভাইরাসের মধ্যে খুব সাবধানে থাকতে বললাম তাকে। ও জবাব দিলো, ‘বন্ধু, রাতের আঁধারে গোপনে সাহায্য নিয়ে বের হতে হয়। বহু মানুষ চাইতে পারে না। অথচ তাদের বাড়িতে খাবার নাই। তাদেরকে খাবার পৌঁছে দিয়ে আসি। তার আগে দিনের বেলায় লোক লাগিয়ে খবর নেই; কার বাড়ির কি অবস্থা। এরপর তালিকা করে কাজ করি।’ ওর জবাবে বুকটা গর্বে ভরে উঠে। এমন বন্ধুর জন্য সত্যিই গর্ববোধ করি।

৭.
এভাবেও যখন কেউ কেউ এই দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে। তখন ভিন্ন চিত্রও কম না। প্রতিদিনই গণমাধ্যমে উঠে আসছে গবীর আর অসহায় মানুষের জন্য দেয়া শত শত বস্তা চাল আত্মসাতের খবর। অনেক চেয়ারম্যান-মেম্বার আবার আটকও হচ্ছেন। অথচ তারা জনপ্রতিনিধি। জনগণের বিপদে পাশে দাঁড়ানোই ছিল তাদের বড় দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্ব ভুলে আজ তারা ব্যস্ত নিজেদের আখের গোছাতে।

জীবনযুদ্ধটা করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে হোক কিংবা খরা-দুযোর্গ-মহামারির বিরুদ্ধে; কোনো কিছুতেই জীবন থেমে থাকে না। জীবন এগিয়ে চলে তার নিজস্ব নিয়মে। তাতে জয় বা পরাজয় দুটোই আসতে পারে। তবুও আশা হারায় না মানুষ। কেননা জীবন মানেই যুদ্ধ ।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)