চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মি টু: নারীর না বলা কথা আর প্রতিবাদে মৌনতা নরকূলের!

সাম্প্রতিক সময়ে ঝড় তুলেছে ‘Me Too’। যা নিয়ে ভারত সহ বেশ কিছু দেশ মিডিয়া তোলপাড়। এর হালকা হাওয়া এসে লেগেছে বাংলাদেশে। যার প্রথম ধাক্কাটা লেগেছে গণমাধ্যমে। এ বিষয়ে ফেসবুকে সাংবাদিকদের অবস্থান নিয়ে চলছে তর্ক-বিতর্ক। অনেক মনে করে নারীদের ‘Me Too’ প্রতিবাদ বাংলাদেশে তেমনভাবে সাড়া পড়বে না। এর অন্তরালের কারণগুলো ব্যাখ্যা দেবার আগে যে বিষয়টা দেখা যায় তা হলো- সামাজিক অবস্থান গত কারণে প্রতিবাদের সাহস করে উঠা ব্যক্তির সংখ্যা কম। আবার যে নারীরা নিজের কথা বলে প্রতিবাদ করতে পারে সে নারীদের সাহসিকতার জন্য সকল নারী গর্বিত। কারণ যৌন হয়রানি বা নির্যাতন নারীর নিত্য জীবনে আশংকা হয়ে থাকে প্রতিনিয়ত।

একজন মেয়ে ঘরে যখন হয়রানি বা নির্যাতিত হয় তখন সেখানে চলে ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা। কারণ মেয়ের জীবনের দুঃসহ ঘটনার কথা বললে যে নিজেরাই হেয় হবে। আবার নারী যখন পরিণত বয়সে জীবনের তাগিদে বাইরের জগতে পা দেয় সেখানে প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হয় শারীরিক ও মানসিকভাবে। আর এ অবাঞ্ছিত ঘটনাগুলো হয়ত সারা জীবন নিজে বয়ে বেড়ায় নীরবে নিঃশব্দে।

কর্মক্ষেত্রে নারীরা যে সরাসরি বা আকার ইংগিতে যৌন হয়রানির শিকার হয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে এক্ষেত্রে যদি নারী পুরুষের উভয়ের সম্মতিতে কোন সম্পর্ক হয় তা নিয়ে কেউ কাউকে ব্ল্যাকমেইল করাটা ভুল।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি অনেক ক্ষেত্রে প্রজ্ঞা মেধা থাকা সত্ত্বেও নিজেকে বিকিয়ে দিয়ে যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হয় নারীকে। আর তাই জীবিকার প্রয়োজনে অফিসের কর্তাব্যক্তিদের খেয়াল খুশির কাছে হার মানে নারী। যা তার সারা জীবনের বোবা কান্না হয়।চাইলেও পারে না প্রতিবাদ করতে। কারণ পরিবার, সন্তান সমাজ আর সম্মান তাকে করে বাকরুদ্ধ।

সুন্দর চলন বলনের ভদ্রবেশী মুখোশের আড়ালের বিকৃত মানসিকতার পুরুষের সংখ্যা এ সমাজে কম নয়। এরা নানা সেক্টরে ক্ষমতাধর ব্যক্তি। এসব ব্যক্তিদের বর্জন করতে হলে সবার আগে নারীর আর্থিক নিরাপত্তা দরকার। কিন্তু নিজের পায়ের তলার মাটি শক্ত করবার মত অবস্থা সবার হয় না। যার ফলে নারীকে যাপিত জীবনে পুরুষের বিকৃত মানসিকতার ক্ষত একা বয়ে বেড়াতে হয় আজীবন মানসিকভাবে।

‘Me Too’ তে নিজের না বলা কথা বলার দুঃসাহসী সে নারীদের সাহসিকতা সাধুবাদ যোগ্য নিঃসন্দেহে। তবে এখানে লক্ষণীয় যে, মিডিয়াতে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের ঘটনাগুলি যত বেশি প্রকাশ পাচ্ছে অন্য সেক্টরের একেবারেই নির্বাক। বাস্তবতার নিরিখে দেখা যায়, মিডিয়া জগতের মত শত শত ঘটনা রয়েছে অন্যান্য সেক্টরে কর্মরত নারীদের।

আবার কর্মক্ষেত্রের বাইরে ভিন্ন চিত্র রয়েছে ঘরে। পরিবারের কন্যা শিশুটি বড় হবার সাথে তাকে নিয়ে বিব্রতকর ঘটনার শিকারের শঙ্কায় থাকে মা বাবা। আর মেয়েটি মা বাবার আড়ালে ঘটে যাও কোন স্পর্শ কাতর বিষয় বলতে পারে না কাউকে। কারণ ভয় লজ্জা তার ভেতর এক ধুম্রজাল তৈরি করে। সাথে সাথে মেয়েটির মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে বাধা হয় পুরুষের এ বিকৃত আচরণ। পুরুষ বিদ্বেষী মনোভাবের সূত্রপাত ঘটে। যা হয়ত বুঝতে পারে না মা বাবা।

Advertisement

এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, ‘Me Too’ কেবল যে নারীর প্রতিবাদের ভাষা তা নয়। একজন কন্যার বাবা হিসাবে নারীর প্রতি যৌন হয়রানির প্রতিবাদে পুরুষদের মৌনতা অবলম্বন কি ঠিক ?

শারীরিক কামনা বাসনা প্রকৃতিগত ভাবে নারী পুরুষ সবার আছে। যা মিটাতে সামাজিক আচার বিধি পাশাপাশি নিজের বিবেক বোধকে বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। বিকৃত যৌন রুচির পুরুষরা ভুলে যায় উচিত অনুচিত।

কিন্তু একজন পুরুষ যখন পিতা হয়ে বুঝতে বা জানতে পারে তার মেয়েটি যৌন হয়রানির শিকার তখন পুরুষ নয় বাবা হিসাবে বিবেকের কাছে অপরাধী হয়ে অসহায়ত্ব বোধ করে সে।

সুতরাং নিজের কু-রিপুকে সংযত না করে যে পুরুষ বিকৃত যৌন লালসার পরিতৃপ্তি পেতে চায় সে অমানুষ। তার বিচার মানুষের কাঠগড়ায় হলেও একজন নারী ভুলে যেতে পারে না সে দুঃসময়ের কথা। আর নারীকে নিয়ে বিতর্কও থেমে যায় না সমাজে।

অতএব নরকূল, নারীদের যৌন হয়রানি বা নির্যাতন করার সময় নিজের কন্যা স্ত্রী বোনকে মনে করুন। আর ভাবুন আপনি পুরুষ হিসাবে যা করছেন তা যদি এদের বেলায় ঘটে সেটা অন্যায় হলে আপনারটা কি করে ন্যায় হবে?

সুতরাং ‘Me Too’ কেবল নারীদের প্রতিবাদ নয়। ‘Me Too’ হোক কন্যা সন্তানের জন্য পুরুষদের ও প্রতিবাদ। তবেই সমাজে আমাদের কন্যারা পাবে নিরাপত্তা আর দূর হবে যৌন হয়রানির শঙ্কিত জীবন।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)