চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মাওলানা ফারুকী হত্যাকাণ্ড: পাঁচ বছরেও তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেনি পুলিশ

হত্যার পাঁচ বছর পরও চ্যানেল আইয়ের ইসলামিক অনুষ্ঠান ‘কাফেলা’ ও ‘শান্তির পথ’র উপস্থাপক মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকী হত্যাকাণ্ডের তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে পেশ করতে পারেননি পুলিশের একাধিক তদন্ত সংস্থা।

তদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়ায় বারবার সময় দিয়েও আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের বিচারকাজ শুরু করতে পারেনি বিচারিক আদালত। প্রতিবেদন পেতে আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর নতুন করে দিন ধার্য করেছেন আদালত।

বিজ্ঞাপন

তদন্তের অগ্রগতি হিসেবে পাঁচ বছরে মাওলানা ফারুকীর চাঞ্চল্যকর হত্যায় স্বীকারোক্তি দিয়েছেন আসামি হদিসুর রহমান সাগর।  এছাড়াও মামলাটির তৃতীয় তদন্ত সংস্থা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি ধারণা নুরুল ইসলাম ফারুকী হত্যাকাণ্ডে জড়িত জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের-জেএমবি স্লিপার সেল।

পাঁচ বছর আগে ২০১৪ সালের ২৭ আগস্ট রাতে রাজধানীর ১৭৪, পূর্ব রাজাবাজারের নিজ বাসায় মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকীকে গলাকেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

ওই সময় বাসার দোতালায় তার স্ত্রী ও স্বজনদের আটকে রেখে হত্যার পর পালিয়ে যায় অজ্ঞাত কয়েকজন খুনি।  হত্যাকাণ্ডের পরদিন ফারুকীর ছোট ছেলে ফয়সাল ফারুকী বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আট-নয়জনকে আসামি করে শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা ও ডাকাতির অভিযোগে মামলা করেন।

হত্যাকাণ্ডের পর মামলাটির তদন্ত শুরু করে শেরে বাংলা নগর থানা। এরপর তাদের কাছ থেকে মামলাটি স্থানান্তরিত হয় পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ-ডিবির কাছে। সবশেষ তদন্ত কাজ করছে সিআইডি।

ফারুকীর পরিবারের সঙ্গে পুলিশের যোগাযোগ নেই
তদন্তের স্বার্থে পুলিশ এখন আর মাওলানা ফারুকীর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করে না।  মাওলানা ফারুকীর বড় ছেলে আহমেদ রেজা ফারুকী চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, বাবার হত্যাকাণ্ডের দায়িত্ব সিআইডি পাবার পর দেড় বছর আগে একবার আমার সঙ্গে কথা হয়েছিল, কিন্তু কারো সঙ্গে দেখা হয়নি।

তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ে আমরা বেশ কয়েকবার স্মারকলিপি দিয়েছি কিন্তু কোন কাজ হয় নি।

‘‘আমাদের পরিবার খুব একটা স্বচ্ছল না, মোটামুটিভাবে আমাদের পরিবার চলছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে এখন আমাদের চাওয়া মাওলানা ফারুকীর হত্যাকারীদের যদি সম্ভব হয় তাহলে বিচারের আওতায় নিয়ে আসুক।’’

হত্যা মামলার প্রতিবেদন ২৩ সেপ্টেম্বর
মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকী হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার দিন আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর ধার্য করেছেন আদালত।  গত ২৮ জুলাই মামলার প্রতিবেদন দেয়ার দিন ধার্য ছিল, পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল না করায় ঢাকা মহানগর আদালতের বিচারক দেবব্রত বিশ্বাস নতুন এদিন ধার্য করেন।

এ হত্যা মামলায় বিভিন্ন সময় সন্দেহভাজন হিসেবে জেএমবি, আনসারুল্লাহ ও হুজির ১৩ সদস্যসহ ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ১২ জন এখনও কারাগারে আছেন।

বিজ্ঞাপন

আল্লাহ ও রাসূলের ভুল ব্যাখ্যায় ফারুকীকে হত্যা
২০১৮ সালের ৩০ মে আসামি হাদিসুর রহমান সাগরের হত্যাকাণ্ডের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। সেখানে তিনি জানান, আল্লাহ ও তার রসুলের ভুল ব্যাখ্যা করার জন্যই মাওলানা ফারুকীকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

মাওলানা ফারুকী হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত হদিসুর রহমান সাগর

হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনার বৈঠক হয় আশুলিয়া
ফারুকীকে হত্যার আগে বেশ কয়েকবার ঢাকার আশুলিয়া এলাকায় বৈঠক করা হয়।  হত্যাকাণ্ডের সময় ৯ জন অংশ নেয়।  তারা হলেন, জঙ্গি শীর্ষ নেতা হদিসুর রহমান সাগর, জঙ্গি শীর্ষ নেতা সারোয়ার জাহান মানিক, তাসনিম, আনোয়ার হোসেন ওরফে জামাই ফারুক, রজব, ইমন, রফিক, নাইম ও আশফাক।

এদের মধ্যকার জামাই ফারুক নামে একজন ২০১৭ সালে ভারতে গ্রেপ্তার হয়।

তদন্তের অগ্রগতি কতোদূর?
প্রথমে থানা পুলিশ ও পরে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশকে। মামলাটি ডিবিতে স্থানান্তরের এক বছরের মাথায় ২০১৫ সালের শেষের দিকে মামলাটি ডিবি থেকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) হস্তান্তর করা হয়। তখন মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব সিআইডি’র পরিদর্শক আরশেদ আলী মণ্ডলকে দেওয়া হয়।
সম্প্রতি তদন্ত কর্মকর্তা বদল হয়েছেন। বর্তমানে মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সিআইডি’র অর্গানাইজড ক্রাইম টিম।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাওলানা ফারুকী হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নতুন অনেক তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এখনই এসব বলতে রাজি নন তারা।

মাওলানা ফারুকী হত্যাকাণ্ডের তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে সিআইডি’র অর্গানাইজড ক্রাইম বিভাগ জানায় মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম বিভাগের প্রধান বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্যা নজরুল ইসলাম পদোন্নতি পেয়ে অন্যত্র বদলী হওয়ায় তার জায়গায় কেউ না আসলে এ বিষয়ে কোনো কিছু বলা যাবে না।

পুলিশের অপরাধ ও তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রধান অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম চ্যানেল আই অনলাইনের কাছে এ হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে এই মুহূর্তে কিছু বলতে রাজি হননি।

নুরুল ইসলাম ফারুকী ১৯৫৯ সালের ২৪শে নভেম্বর পঞ্চগড় জেলার নাউতারী নবাবগঞ্জ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মাওলানা জামশেদ আলী। তিনি নীলফামারী জেলার ডোমার থানার অন্তর্গত চিলাহাটি জামিউল উলুম সিনিয়র মাদ্রাসা থেকে ১৯৭৫ সালে দাখিল ও পরে আলিম পাস করেন।

নিহত ফারুকী ১৯৮১ সালে পুরান ঢাকার রায়সাহেব বাজার জামে মসজিদের খতিব হিসেবে যোগ দেন। ঢাকাসহ বিভিন্ন মসজিদে ৩৩ বছর ইমাম ও খতিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন আলিয়া মাদরাসায় ১৫ বছর শিক্ষকতা, রেডিও, টেলিভিশনে ২৫ বছর ওয়াজ-নসিয়তের অনুষ্ঠানও করেছেন।

তিনি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ও সুপ্রিম কোর্ট জামে মসজিদের খতিবের দায়িত্বও পালন করতেন।

Bellow Post-Green View