চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ভেসে যাচ্ছি হুজুগে!

পরিচিত পরিমণ্ডলে বেশিরভাগ শিশুকেই দেখি মোবাইল নিয়ে খেলা করতে। হ্যাঁ, এ যুগের বাবা-মায়েরা শিশুর কান্না সইতে পারেন না। তারা শিশুরা একটু ট্যাঁ-ফ্যাঁ করলেই দিগ্বিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়েন। শিশুকে শান্ত করতে এবং বশে আনতে হেন কোনো কাজ নেই যা করেন না। টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন চালানো, ইউটিউবে কার্টুন ছেড়ে দেওয়া, মোবাইল-ট্যাব হাতে তুলে দেওয়া-সব কিছুই করেন।

আজকালকার শিশুরাও একেকটা চিজ। যত ভালো এবং আধুনিক খেলনাই দেন না কেন, তাদের মন ভরবে না। কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করার পরই সেটি তার কাছে অনাকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। তাদের সমস্ত মনোযোগ মোবাইল ফোনের দিকে। মোবাইল আর টিভি ছাড়া তারা আর কিছু পেয়েই সন্তুষ্ট হয় না। এর কারণও আছে। শিশুরা তো অনুকরণপ্রিয়ও বটে। তারা অভিভাবক বা বড়দের সারাক্ষণ ওই দুইটি জিনিসেই তো মগ্ন থাকতে দেখে। কাজেই তারাও ওই দুটি জিনিসের প্রতিই আকর্ষণ বোধ করে।

বিজ্ঞাপন

কোনো কোনো বাবা-মা অভিযোগ করেন, কী করব বলুন, সারাক্ষণ যেভাবে জ্বালাতন করে, তাতে আর পেরে উঠি না! মোবাইল হাতে দিলে কিংবা টিভি চালিয়ে দিলে কিছুক্ষণ অন্তত শান্ত থাকে। সে সময়টায় আমি কিছু কাজ করি। কথা সত্যি, বর্তমানের পরমাণু পরিবারগুলোয় কোনো বাড়তি লোক নেই। কর্মজীবী মায়েদের বাচ্চারা মানুষ হয় কাজের লোকের কাছে।

বাচ্চাদের বায়না মেটাতে গিয়ে সবাই হিমশিম খায়। এক সময় বিরক্তও হয়। তখন মনে করে, ভবিষ্যতে কি হবে হোক, আপাতত একটু শান্ত থাকুক। জ্বালাতন না করুক! কাজেই অনেক বাবা-মা-ই এখন তাদের শিশুসন্তানদের মোবাইল-ট্যাব ইত্যাদি কিনে দেয়। এগুলোর ক্ষতিকর প্রভাব জানা-বোঝার পরও দেয়। বললেই বলে, আমি নিরুপায়!

আসলে পৃথিবী ক্রমেই ডিজিটাইজড হচ্ছে। ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হয়ে দুনিয়া ধরা দিয়েছে কয়েক ইঞ্চির স্ক্রিনে। চিঠির আদানপ্রদান থেকে অর্থনৈতিক লেনদেন বা নিখাদ মনোরঞ্জন— সব কিছুরই দায়িত্ব নিয়েছে স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, ট্যাবলেটরা। ক্রমে শৈশব গড়বার দায়িত্বটিও এসবের হাতেই অর্পণ করছে সমাজ। শিশুর চোখ ফুটবার পর থেকেই সে গ্যাজেট-আসক্ত।

এবিসিডি শিখবার জন্যই হোক বা ভাত খাবার ‘দুরূহ’ প্রক্রিয়াটি সহজ করবার জন্যই হোক— গ্যাজেট বিনে গতি নেই। নিঃসন্দেহে স্মার্টফোন জীবনকে অনেক স্বাচ্ছন্দময় করেছে। কিন্তু এটাই কি মঙ্গলের পথ? ক্রমাগত ডিজিটাল-নির্ভরতার পরিণাম কী? কোনও আশাব্যঞ্জক কথা শোনাচ্ছে না বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এক নতুন উপদেশমালায় এই সংস্থাটি বলেছে, দুই থেকে চার বছরের শিশুদের কখনই দিনে এক ঘণ্টার বেশি ডিজিটাল স্ক্রিনের সামনে রাখা চলবে না। এবং আরও কমবয়সি শিশুদের, স্ক্রিন আছে এমন কোনও ধরনের ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রের ধারেকাছে ঘেঁষতে দেওয়াই উচিত নয়।

বিজ্ঞাপন

গবেষণা বলছে, বিশ্বে শিশুদের এক বড় অংশের হাতে কোনও না কোনও ভাবে স্মার্টফোনের মতো গ্যাজেট পৌঁছে যাচ্ছে। এবং যে কোনও মানসিক সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে সে সমাধানের পথে হাঁটছে না, হাতের স্ক্রিনটিতে মনোনিবেশ করছে। ফলে, শৈশব থেকে আবেগ বিদায় নিচ্ছে। মানসিক বিকাশের এই পর্বটিতে যা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। তদুপরি, স্ক্রিনের সামনে এক ভাবে দীর্ঘ ক্ষণ বসে থাকবার প্রবণতায় ওজনবৃদ্ধি, অনিদ্রার মতো একাধিক রোগেরও জন্ম হচ্ছে।

এটা নিঃসন্দেহে গুরুতর সমস্যা। কিন্তু মানসিক বা শারীরিক সমস্যার ক্ষেত্রে স্মার্টফোনের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে তবু কিছু চর্চা হয়। যে প্রসঙ্গটি কালেভদ্রে আলোচনায় উঠে আসে, তা হলো সমাজবিচ্ছিন্নতায় স্মার্টফোনের অবদান। এমনিতেই আধুনিক পৃথিবীতে শিশুরা বড় বেশি একা। যৌথ পরিবার ভেঙে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হচ্ছে, মা-বাবা উভয়েই কর্মজীবনে ব্যস্ত। যে নিরাপদ পারিবারিক বেষ্টনীটি শিশুকে এত কাল ঘিরে রাখত, তা সরে যাচ্ছে। গ্যাজেটে মগ্ন শিশু আরও বেশি করে সমাজ থেকে সরে এসে নিঃসঙ্গ হচ্ছে। অর্থাৎ দুটি কারণ পাশাপাশি একটি অন্যটিকে পুষ্ট করছে। শিশু প্রয়োজনীয় সাহচর্য, চিত্তবিনোদন, শিক্ষা সব কিছুই স্ক্রিনে পেয়ে পারস্পরিক মেলামেশা ও আদানপ্রদানের তাগিদটি হারিয়ে ফেলছে।

অন্য দিকে, বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশও নিদারুণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্ক্রিনসর্বস্ব জীবনে সে নিজে কল্পনা করবার সুযোগ পায় না। স্ক্রিনটিই নানা রঙিন মোড়কে তার কল্পনাটিকে বাস্তবে এনে দেয়। ফলে, স্ক্রিনে দেখা গল্পকে, ভাবনাকেই সে নিজস্ব কল্পনা বলে ভাবতে থাকে। কয়েক বছর আগেও সাত ভাই চম্পা, পান্তা বুড়ির গল্প, বা হিংসুটে দৈত্যের গল্প শুনে সে নিজের মনে কতগুলো অবয়ব রচনা করত। কিন্তু ডিজিটাল মাধ্যমে সেই গল্পের ভিডিও প্রদর্শন তার নিজস্ব কল্পনার জগৎটি চুরি করে সেই জায়গায় শিল্পীর ভাবনাকে বসিয়ে দিচ্ছে।

ফলে, শিশুমন কল্পনা আর বাস্তবের মধ্যে পার্থক্য হারিয়ে যন্ত্রে পরিণত হচ্ছে। তার ভাবনার জগৎ বলে কিছু নেই। টেলিভিশন, মোবাইল ফোন তার সব কিছু ভেবে দিচ্ছে। সব সমস্যার সমাধান দিচ্ছে। আগামী প্রজন্মের এক বৃহত্তর অংশ আবেগহীন যন্ত্রে পরিণত হলে সমাজের পক্ষে কি তা স্বস্তির কারণ হবে? জানি না এসব বিষয়ে কারও কোনো ভাবনা আছে বলেও মনে হয় না।

বাস্তবতার দোহাই দিয়ে যন্ত্রে পরিণত করছি আমাদের প্রিয় শিশুদের, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে। এ ব্যাপারে কি সত্যিই আমাদের কিছু করার নেই? নাকি আমরা নিজেরা এর বিপদ সম্পর্কে এখনও ততটা সচেতন হইনি? তবে সচেতন হবার সময়টা কিন্তু দ্রুত পার হয়ে যাচ্ছে!

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View