চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ভারত-ইসরাইল কেনো এতো কাছাকাছি হচ্ছে

সম্প্রতি ইসরাইল সফর করেছেন ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। দীর্ঘ সময় পর দুই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সফর হলেও ইসরাইল কখনোই ভারতের পররাষ্ট্রনীতির রাডারের বাইরে ছিলো না। বহুবছর ধরেই ভারতের সামরিক বাহিনীর অস্ত্র, কৃষি ও প্রযুক্তি সরবরাহ করে আসছে ইসরাইল। তার পরও গত কয়েক বছর ধরে দুই দেশের সম্পর্কের পরিধি বাড়ছে।

স্বাধীনতার পর থেকে বহু বছর ইসরাইল বিরোধী নীতি অনুসরণ করেছে ভারত। এর পেছনে শুরুর দিকের যুক্তিগুলোও যৌক্তিক, যদিও তা ভারতীয় রাজনৈতিক ধারার বিরুদ্ধ ছিলো।

স্থানীয় মুসলিমদের কথা মাথায় রেখেই ইসরাইল বিরোধী নীতি অনুসরণের প্রথম কারণ ছিলো। এছাড়া আরব বিশ্বের সমর্থন পাওয়া এর পেছনে কাজ করেছে। এরা কেউই ইসরাইলের বসতি স্থাপনের নামে দখলদারিত্বকে মানে না।

ইসরাইল বিরোধী নীতি অনুসরণ করে ভারত পশ্চিম এশিয়ার দেশে তার কর্মীদের উপর যেমন কোনো রকম প্রভাব পড়তে দেয়নি। তেমনি মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল আমদানীও স্বাভাবিক রেখেছে। এর মধ্যদিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে ইসরাইলের বিরুদ্ধে ভোটও দিয়েছে ভারত।

ভারত-ইসরাইল সম্পর্কের বিখ্যাত গল্পের শুরু ১৯৭১ সালের যুদ্ধ (বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ)। পরে ফিল্ড মার্শাল মানেকশের এক লেখা থেকে জানা যায়, এই যুদ্ধে ইসরাইলের সামরিক শিল্পে তৈরি ১৩০মিমি বন্দুক ও গোলাবারুদ ব্যবহার করেছে ভারত। তবে এতে ইসরাইলের কোনো লেগো বা চিহ্ন ছিলো না।

যুদ্ধে পূর্বতন বন্ধু সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের চাহিদা মোতাবেক গোলাবারুদ সরবরাহে অক্ষমতা ব্যক্ত করেছিল। এরপর ইসরায়েলের আত্মরক্ষারমূলক সামরিক শিল্পের এক প্রতিনিধির মাধ্যমে অস্ত্র ও গোলাবারুদ পায় ভারত। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে মিশরীয়দের ফেলে যাওয়া অস্ত্র থেকেই পরে সামরিক শিল্প গড়ে তোলে ইসরাইল। চার বছর পর সেই কারখানায় উৎপাদিত অস্ত্রই ভারত দেয় তারা।

যদিও সরকারিভাবে ইসরাইলের সঙ্গে এখনো সম্পর্ক গড়েনি ভারত। তবে দিন দিন তাদের সম্পর্ক শক্তিশালী হচ্ছে। ব্যবসা-বাণিজ্য বেড়েছে এবং সামরিক সরঞ্জাম একই সঙ্গে প্রায় ভাগাভাগি করছে। বর্তমানে সামরিক কাজে নিযুক্ত দ্রুতগামী সব যানবাহন (অস্ত্রবিহীন) ইসরায়েলি শিল্পজাত। অস্ত্র ক্রয়ে আরো উৎসাহিত করতে ইসরাইলি অস্ত্র কোম্পানি ‘হেরন’ ভারতকে ১০টি ক্ষেপণাস্ত্রবাহী ড্রোন উপহার দেওয়ার প্রস্তাব করেছে।

সীমান্তসহ প্রায় সব ধরনের নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ কাজে ভারতীয় বিমানবাহিনী এরই মধ্যে রাশিয়ার আইএল-৭৬-এর পরিবর্তে ইসরাইলের রাডার ব্যবহার করছে। দুদেশ একই সঙ্গে বারাক মিসাইল সিস্টেমের উন্নয়ন ঘটিয়েছে। সম্প্রতি কলকাতায় ভারতীয় নৌযান ‘আইএনএস’ থেকে বারাক মিসাইলের পরীক্ষাও চালানো হয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যেই এই মিসাইল দুই দেশের নৌবহরে যুক্ত হবে।

সামরিক বিষয়াদি নিয়ে নিয়মিতই দুই দেশের তথ্য আদান-প্রদান হয়। মাঝে মধ্যে উচ্চ পর্যাদের কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈঠকও অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আর গোয়েন্দা বিভাগে দুই দেশই একটি ইস্যুতে একমত, সেটা সন্ত্রাসবাদ ও সন্ত্রাস মোকাবেলা। ভৌগলিক অবস্থানের কারণে প্রতিবেশিদের দিক থেকে হুমকির মুখে থাকা ইসরাইল প্রতিনিয়ত তাদের অস্ত্র ভান্ডার মজবুত করেছে। গোয়েন্দা ক্ষেত্রে তারা ব্যবহার করছে অত্যাধুনিক নানা সরঞ্জাম। যার অনেক কিছুই এখন ভারত প্রয়োগ করছে এবং করতে চাচ্ছে।

দুদেশের প্রধানমন্ত্রীই এক রকম অঙ্গীকার বহন করেন। নিকট ভবিষ্যতে ইসরাইল সফরের আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

Advertisement

এর আগে প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ইসরাইল সফরের সময় ফিলিস্তিনিও সফর করেছেন। এর মাধ্যমে তার বোঝাতে চেয়েছেন, ভারত এখনো দুই দেশের মধ্যস্থতা করার ক্ষমতা রাখে। সেই সঙ্গে তারা ফিলিস্তিনিকে এটাও বোঝাতে চেয়েছেন যে, কারো শত্রুর সঙ্গে বন্ধুত্ব করলেও ভারত তার পুরনো বন্ধুকে ভুলে না।

ভারত ও ইসরাইল মনে করে ভৌগলিকভাবে তারা দুটি দেশই এমন জায়গায় অবস্থিত, যেখানের রাষ্ট্রীয়ভাবে সন্ত্রাস পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে তাদের ধ্বংস করতে চায়। আর এই সন্ত্রাস নামের সাধারণ সূত্রই তাদের এতো কাছাকাছি করছে।

২০০৮ সালের কুখ্যাত মুম্বাই হামলার সময় বিশেষভাবে হামলার টার্গেট হয়েছিল এক ইসরাইলি বসবাসকারীর বাড়ি ‘ন্যারিম্যান হাউজ’(নতুন নাম চাবাদ হাউজ)। ‘ন্যারিম্যান হাউজের’ ওই হামলায় ৬ জন নিহত হয়।

এর আগে ১৯৯১ সালে কাশ্মিরের বিদ্রেহীরা শ্রীনগরে হামলা চালিয়ে ইসরাইলি পর্যটকদের জিম্মি করে এবং একজনকে হত্যা করে। এতে আরো দুই ইসরাইলি গুরুতর আহত হয়। ভারত-ইসরাইল উভয়ই মনে করে ওই হামলা পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় মদদেই হয়েছিল। এরপর থেকেই দুদেশ সন্ত্রাস নজরদারি ও দমনের ক্ষেত্রে একসঙ্গে কাজ করাকে যৌক্তিক বলে মনে করে।

বসতি স্থাপন ইস্যুতে অর্থনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি ইসরাইল। এই ইস্যুতে ইউরোপের অনেক দেশই ইসরাইলি পণ্য প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। একটি উঠতি অর্থনীতির দেশ হিসেবে ভারত সেই বাজার ধরতে চাইছে।

ভারত-ইসরাইল বাণিজ্য সাম্প্রতিককালে চোখে পড়ার মতো উন্নয়ন ঘটেছে। ভারত ইসরাইল থেকে কৃষি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে ব্যাপক লাভবান হচ্ছে। আর প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা ক্ষেত্রে ভারতকে সহযোগিতা দিতে ইসরাইল তো কখনো কার্পন্য করেনি।

সর্বশেষ পাঠানকোট হামলার পর ইসরাইলে সাথে সম্পর্ক গড়ার কথা জোরেসোরে মূল্যায়ণ করা হচ্ছে। ওই হামলার গোমর বের করতে কিছু ক্ষেত্রে ইসরাইলের সহযোগিতা দরকার বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

প্রথম: প্রাকৃতিক কারণে (নদী-নালা) সন্ত্রাসী ও পাচারকারীদের প্রবেশপথ বন্ধ করা যাচ্ছে না। যার কারণে নজরদারি জন্য ইলেকট্রনিক সীমানাপ্রাচীর দেওয়া দরকার।  এটা মনে রাখতে হবে যে, ইসরাইল হলো বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক সীমানাপ্রাচীর ঘেরা দেশ। অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ভারতও অনুরুপ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে চায়।

দ্বিতীয়ত: প্রতিশোধের বিষয়। ইসরায়েলি পদ্ধতি নিযুক্ত করা অযৌক্তিক হলেও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারত সেই রকম সামরিক ব্যবস্থা নিতে চায়, যেমনটা ইসরাইল নিয়ে থাকে ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে। এ জন্য ভারত সীমান্তে মোতায়েনের জন্য দ্রুতই ইসরাইল থেকে ড্রোন আনতে যাচ্ছে। এর মধ্যে দিয়ে ভারত সৈন্যদের স্বশরীরে সীমান্তে না পাঠিয়ে এবং অহেতুক উত্তেজনা না বাড়িয়ে কার্য হাসিল করতে পারে।

সুতরাং দুই দেশই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরির জন্য প্রাকৃতিকভাবে আগ্রহী। আধুনিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও সীমান্ত প্রাচীর, স্বাস্থ্য ও কৃষি সকল ক্ষেত্রে বিভিন্ন সহযোগিতার প্রসার ঘটানোর সুযোগ রয়েছে। প্রেসিডেন্ট-পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অতীত এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভবিষ্যত সফর দুই দেশকে আরো কাছাকাছি নিতে পারে।

ভারতের দৈনিক ‘দ্য স্টেটম্যান’  এ প্রকাশিত হর্ষ কাকরের লেখা অবলম্বনে