চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ব্রিটিশ ভারত-পাকিস্তানিদের কাছে দুদেশের দ্বৈরথটা যেমন…

বিবিসি অবলম্বনে

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার ক্রিকেট ম্যাচ। খেলাধুলার জগতে সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত ম্যাচগুলোর একটি। বিশ্বব্যাপী একশো কোটিরও বেশি মানুষের জন্য যা এক ভীষণ আবেগের।

আজকাল বৈশ্বিক টুর্নামেন্টগুলো ছাড়া ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ একদমই মাঠে গড়ায় না। কারণটা অবশ্যই রাজনৈতিক। তাই রোববার ওল্ড ট্রাফোর্ডের ম্যাচটা যারা দেখতে পাবেন, তারা ভীষণ সৌভাগ্যবানই মনে করবেন নিজেদের।

বিজ্ঞাপন

ব্রিটিশ ভারত-পাকিস্তানিদের জন্য ম্যাচটা কত আবেগের? একবার শেষ হয়ে গেলে ভার‍ত-পাকিস্তানের মাঠের লড়াইয়ের ফলাফল কী তাদের মাথায় থাকে আদৌ!

বিবিসি এশীয় নেটওয়ার্কের অঙ্কুর দেশাই, কমেডিয়ান আতিফ নওয়াজ এবং বিবিসি গেট ইনসপায়ারের উপস্থাপক কাল সাজাদ কথা বলেছেন দুই ব্রিটিশ ভারত-পাকিস্তানিদের সম্পর্ক নিয়ে। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ তাদের কাছে কতটা আবেগের সেটাই জানিয়েছেন তারা।

অঙ্কুর দেশাই-ভারতীয় সমর্থক

যুক্তরাজ্যে বড় হয়ে উঠা, একজন বাবা সাধারণত তার ছেলের হাতে ফুটবল ধরিয়ে দেন। কিন্তু আমার বাবা ভারতীয় ঐতিহ্যই ধরে রেখেছিলেন, আমাকে দিলেন একটি ক্রিকেট ব্যাট।

ভারতীয়রা ফুটবলে দুর্দান্ত না। তার ওপর আবার আমার চেহারা ছিল অনেকটা শচীন টেন্ডুলকারের মত। এজন্য অবশ্য আমার বেশ গর্ব হতো।

১৯৯৯ ইংল্যান্ড বিশ্বকাপের সময় আমি ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়তাম । সেবারও ওল্ড ট্রাফোর্ডে ভারত- পাকিস্তান ম্যাচ হয়েছিল।

আমার বন্ধু এবং আমি ভাবলাম আমরা বড় হয়ে গেছি। তাই এখন বেশ সাহসী। তাই আমরা ভারতের জার্সি পড়ে কলেজে গেলাম এবং সেই কলেজে আবার অনেক পাকিস্তানি ছাত্রও ছিল।

ব্যবসায়ী শিক্ষার শিক্ষক আমাদের বলেছিলেন,‘প্রার্থনা করি, যেন মার না খেয়ে ফিরে আসতে পারো।’ এটা কিন্তু প্রকৃত সত্য নয়। আসল সত্যটা হল, ব্রিটেনে ভারত-পাকিস্তানিদের মাঝে দারুণ বন্ধুত্বপূর্ণ একটা সম্পর্ক ছিল। এমনকি কলেজে আমরা লুটন ইন্ডিয়ানস এবং লুটন ক্যারিবীয়দের মতো আমি লুটন পাকিস্তানের হয়ে একটা দলেও খেলেছি।

মাঠে ভীষণরকম প্রতিদ্বন্দ্বীতা হতো। কিন্তু ম্যাচ শেষে আমরা সব ভুলে গিয়ে একসঙ্গে খেতে যেতাম। ঘুরে বেড়াতাম।

রোববারের ম্যাচটার জন্য বুভুক্ষের মতো অপেক্ষায় আছি। যখনই সূচি বের হয় তাড়াতাড়ি দেখি ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ আছে কিনা। সমস্ত শক্তি এবং ভাবনা বরাদ্দ করে রেখেছি সপ্তাহের শেষ দিনটার জন্য।

আমি উইম্বলডন, এফএ কাপ, চ্যাম্পিয়ন্স লিগে মাঠে থেকে কাজ করেছি। তাই জানি ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার কাছে এগুলো কিছুই নয়। এর এমনই এক পরিবেশ থাকে যে, দেখে মনে হয় একসঙ্গে অনেক ব্রিটিশ এশিয়ান কেবল এক ভাবনায় এক মনে ধ্যান করছে।

দিনকে দিন ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের উত্তেজনা বাড়ছেই। ভারত বিশ্বকাপ জিতুক বা না জিতুক, পাকিস্তানকে হারানো চাইই। এই জয়ের কাছে ইংল্যান্ড কিংবা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ জয় কিছুই না।

আমি যত বড় হয়েছি, ততই দেখছি ম্যাচের সংজ্ঞাটাই যেন পাল্টে যাচ্ছে। দুই দলের এখন কম ম্যাচ হয়। তাই এখন আগ্রহটাও বেশি।

আমি পাকিস্তানকেও খুব পছন্দ করি। তারা হল সত্যিকারের সাহসী এবং তাদের খেলা দেখতে পারাটাও দারুণ। আজকাল, পাকিস্তানকে হারানোর চেয়ে টুর্নামেন্ট জেতার দিকে মন দিয়েছে ভারত। কারণ তাতে জার্সিতে একটা তারকা যোগ হয়।

ইংল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমে অনেক পাকিস্তানি আছে। সাধারণত ভারতীয়রাই বেশি টিকিট কিনে নেয়, তারপরও রোববার দুই দলের সমান সমান দর্শক আশা করছি।

আলতাফ নেওয়াজ-পাকিস্তানি সমর্থক

প্রতিবার পাকিস্তান-ভারত হলে আমি যেন ১৫ বছর বয়সে ফিরে যাই- যখন আমি স্কুলে পড়তাম এবং বন্ধুদের সঙ্গে খেলতাম।

বিজ্ঞাপন

কে বেশি ম্যাচ জিতবে, কার র‍্যাঙ্কিং বেশি, কারা যাবে সেমিফাইনালে-এসব জিজ্ঞাসা পাকিস্তান-ভারত লড়াইয়ের কাছে কিছুই না। বিষয়টা হল পরদিন মাঠে নেমে আপনি কতটুকু মুখের কটুকথা সহ্য করতে পারবেন তারই পরীক্ষা। এ এক অন্য স্তরের লড়াই। এ লড়াই ভীষণ ভয়ঙ্কর!

১৯৯৯ বিশ্বকাপে সেই ম্যাচটির অর্ধেকটা আমরা ক্লাসরুমের টিভিতে দেখেছি । দ্বিতীয় ইনিংসর দেখার জন্য দৌড়ে বাসায় গিয়ে দেখলাম আমরা হেরে গেছি।

মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাত বছরে দুই দলের একটি ম্যাচও আমি বাদ দেইনি। একটা সময় আমি এই ম্যাচের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেলাম। কারণ এটি অপ্রতিরোধ্য। ছোট ছোট বাচ্চারাও এখন বেশ নিষ্ঠুর।

 

এখন আমি বড় হয়ে গেছি। এখন সেই ক্রোধ কিংবা মুখে গালিগালাজ নেই, নেই সেই আক্রমণাত্মক ভাবটাও। এমনকি ভারতীয়রাও এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। মজাও করে না।

বলা হয়, ভারতের কাছে হারাটা খুব কষ্টের। ম্যাচের আগে- আরে এটা শুধুই একটা খেলা। কে হারে-জিতে সেটা কোনো ব্যাপারই না, আমরা হলাম দুই সীমান্তের দুই জার্সি পরা ভাই। আমাদের একই রং, একই সম্প্রীতি।

কিন্তু ম্যাচ হারলে পাকিস্তানিদের মনে হয় সব শেষ। মনে হয় পৃথিবীর কাছে চাওয়ার কিছু নেই। আপনার স্ত্রী আপনাকে ছেড়ে চলে গেছে, বন্ধকী সম্পত্তি ছাড়িয়ে নেয়ার জন্য আপনার কাছে একটা ক্রেডিট কার্ডও নেই। চাকরি চলে গেছে, আপনি সবার কাছে ঘৃণার পাত্র!

কিন্তু আসল সত্যটা হল ম্যাচের পরপরই আমরা এক হয়ে যাই। তৈরি হয় আসল বন্ধুত্বের। খেলোয়াড়রা তাদের ভালোবাসা এবং তাদের সংস্কৃতি আদান-প্রদান করে অভিন্ন এক সম্প্রীতি গড়ে তোলে।

হ্যাঁ, রাজনীতি বলে একটা জিনিস এখনো আছে। কিন্তু ব্রিটেনের পাকিস্তানি কিংবা ভারতীয়রা একে পাত্তাই দেয় না। আমরা শুধু খেলাটাকেই ভালোবাসি।

কাল সাজাদ( পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ইংল্যান্ড ভক্ত)

আমার মনে পড়ে যেদিন বাবাকে বলেছিলাম যে আমি ইংল্যান্ডের ভক্ত। তাদের দেখে মনে হল তারা চিরদিনের জন্য আমাকে হারিয়ে বসেছেন!

আমার বাবা-মা উভয়ই পাকিস্তানি। আমার জন্ম যুক্তরাজ্যে। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে আমি সবচেয়ে ছোট। আমি বাদে ভাই-বোনেরা সবাই পাকিস্তানকে সমর্থন করে।

সবচেয়ে ছোট ছেলে হিসেবে ক্রিকেটের সঙ্গে আমার পরিচিতি ঘটে ১৯৯২ বিশ্বকাপে। এক সকালে আমি টিভিতে ইংল্যান্ড-পাকিস্তানের ফাইনালটা দেখেছিলাম। ইংল্যান্ডকে সেই ফাইনালে হারিয়ে দেয় পাকিস্তান।

অল্প বয়সে আমি পাকিস্তানি সমর্থক ছিলাম । কিন্তু যখন বড় হতে লাগলাম, তখন আমার প্রভাবিত হওয়ার ভাবনাটা পরিবর্তন হতে লাগল। এশিয়ান সংস্কৃতিতে ডুবে থাকা সত্ত্বেও আমি ইংল্যান্ডের সঙ্গে আরও বেশি পরিচিত হতে লাগলাম।

১৯৯৯ বিশ্বকাপে আমি বুঝলাম ক্রিকেট কী জিনিস। ভারত-পাকিস্তান লড়াইয়ের কী গুরুত্ব আমার পরিবারের কাছে।

প্রথম ইনিংসে টেন্ডুলকার তখন পর্যন্ত উইকেটে। ভারত ব্যাট করছে ১ উইকেট ৯৫ রানে।

আমি এরপর টয়লেটে গেলাম। আমি লিভিং রুম থেকে ভীষণ এক চিৎকার শুনলাম। টেন্ডুলকার আউট হয়ে গেছে! আজহার মাহমুদের বলটা কী দুর্দান্ত বাকই না নিল? সাকলায়েন মুশতাক কী দারুণ এক ক্যাচই না নিলেন? টেন্ডুলকারের একটু মনোযোগ হারানোটাই না কি বিপদ ঢেকে আনল!

আমার বাবা বিশ্বাস করা শুরু করলেন যে, আমি আসলে অপয়া। যতক্ষণ আমি খেলা দেখি পাকিস্তান উইকেট পায় না। কুসংস্কারে আচ্ছন্ন হয়ে তিনি আমাকে আদেশ করলেন যে, আমি যেন পাকিস্তান বল করার সময় পর্যন্ত টয়লেটে থাকি। উইকেটের দরকার পড়লেই তিনি আমাকে টয়লেটে পাঠিয়ে দিতেন। ঠিক এইভাবে আমি পাকিস্তানের পুরো বোলিংটা মিস করলাম!

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ফাইনালে বাবা টিভিই বন্ধ করে দিলেন। যখন ১০ মিনিট পর টিভি খুললেন দেখলাম পাকিস্তান কোনোরকমে ১০০ পার করেছে!

যখন অস্ট্রেলিয়া প্রায় শিরোপা জয়ের পথে, তখন আমার বাপ-ভাই কাছের শপিং মলে চলে গেলেন। দেখে মনে হচ্ছিল, তারা আর চাপ নিতে পারছেন না।

আমি যা দেখেছি, আমার মনে হয়েছে বাবা আর নিতে পারছেন না। পাকিস্তানের এভাবে ধসে পড়াটা তার চোখে ছিল অমার্জনীয়। এই হতাশাটা তার চোখে লম্বা সময় ধরেই ছিল!

Bellow Post-Green View