চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ভুতুড়ে বিল: ব্যর্থতার বোঝা ও মানুষের দুর্গতি আর কত?

করোনা মানুষের জীবনকে হুমকিতেও ফেলেছে আবার কারও কারও বেলাতে আর্শীবাদও হয়ে উঠেছে৷ তাই কাউকে দেখা যাচ্ছে ভুয়া রোগী সেজে প্রণোদনার টাকা হাতিয়ে নেয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত হতে৷ কাউকে দেখা যাচ্ছে ভুয়া টেস্টের বাণিজ্যে মেতে উঠতে৷ কাউকে দেখা যাচ্ছে দামি হোটেলের অস্বাভাবিক বিল ভাউচার উপস্থাপন করতে৷ কাউকে দেখা যাচ্ছে ছুটি নিয়ে দায়িত্ব পালন না করে ঘরে বসে জনগণের টাকায় বেতন নিয়ে চলতে৷ কাউকে দেখা যাচ্ছে হতদরিদ্র মানুষের জন্য দেয়া বরাদ্দের টাকা ও ত্রাণসামগ্রী চুরিতে লিপ্ত হতে৷ কাউকে দেখা যাচ্ছে বিদ্যুৎ ও চিকিৎসার ভুতুড়ে বিল উপস্থাপনের দুই নম্বরিতে লিপ্ত হতে৷ বিদ্যুতের ভুতুড়ে বিলের থাবা পড়েছে খোদ বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদসহ বিদ্যুৎ বিভাগেরই বড় বড় কর্মকর্তার বাসা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও। অতিরিক্ত বিল এসেছে বন্ধ থাকা প্রতিষ্ঠানেও। তবে সারাদেশে এমন কত সংখ্যক গ্রাহক ভুতুড়ে বিলের খপ্পরে পড়েছে সেটাই প্রশ্ন৷ তবে কি বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় পারছেনা ভুতুড়ে বিলকারীদের সাথে? তবে তাদের এত ক্ষমতার উৎস কোথায়?

ভুতুড়ে বিল কি শুধু বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর বাসাবাড়িতেই? না তা নয়, বিদ্যুৎ বিভাগের প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসেন, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মইন উদ্দিন, বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্ম সচিব পর্যায়ের চারজন কর্মকর্তাসহ সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বাসাবাড়িতেও ভুতুড়ে বিল এসেছে। বিল এসেছে বন্ধ থাকা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অফিসেও৷ এসব বিল মানুষ ভূতেরা কী উদ্দেশ্যে দিলো? এই ভুতুড়ে বিলের দায় কি বিদ্যুৎ মন্ত্রী তথা বিদ্যুৎ বিভাগের নয়? তাহলে কি ভূতেরাই অশরীরী হয়ে এসব বিল ঘরে ঘরে পৌঁছে দিল? আসলে করোনার অভিশাপে দুর্বৃত্তায়ন দিয়ে আর্শীবাদ গড়তে কতই না ব্যস্ত হয়ে উঠছে কিছু মানুষ? এখন আবার দেশে ফিরে কোয়ারেন্টিনে থাকাবস্থায় সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণের চেষ্টা করার অভিযোগও উঠছে কুয়েত, কাতার ও বাহরাইন ফেরৎ প্রবাসীদের৷ ২১৯ জনকে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণের অভিযোগে কারাগারেও পাঠিয়েছে৷ তারা নিজেদের কোন ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে এমন দেশের ভাবমূর্তি নষ্টের অপতৎপরতায় লিপ্ত হল? এর জবাব দেবে কি প্রবাসী কল্যান মন্ত্রণালয়?মন্ত্রণালয় পারবে কি ২১৯ জনের বক্তব্য নিয়ে দেশবাসীকে জানাতে?

বিজ্ঞাপন

দুর্নীতি,প্রতারণা,ভুয়া করোনা টেস্ট,ভাবমূর্তি নষ্ট, ত্রাণচুরি,করোনার বরাদ্দ লুটপাট কত কি দেখছে মানুষ৷ দেখছে বিদ্যুতে ভুতুড়ে বিল৷ হাসপাতালে ভুতুড়ে বিল৷

বিজ্ঞাপন

জুন মাসের শুরুর দিকে প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট নিয়ে চট্টগ্রামের ম্যাক্স হাসপাতালে ভর্তি হন ৪৫ বছর বয়সী নারী জান্নাতুল ফেরদৌস। তাকে ১০ দিন অক্সিজেন দিতে হয়েছিল। সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে যাওয়ার সময় তার পরিবারের হাতে ছয় লাখ টাকারও বেশি অঙ্কের ভুতুড়ে বিল ধরিয়ে দেওয়া হয়। এর মধ্যে শুধুমাত্র অক্সিজেনের বিলই ছিল তিন লাখ পাঁচ হাজার টাকা।করোনাকালে এত ভূত কেন এলো ও কী উদ্দেশ্যে এলো? অক্সিজেন ব্যবসায়ীরাও মেতে উঠলো ধান্ধাবাজীতে৷ মেতে উঠলো হ্যান্ডস্যানিটাইজার ও মাস্ক ব্যবসায়ীরা৷ নকল হ্যান্ডস্যানিটাইজার ও মাস্ক সরবরাহ করে সামান্য কটা লাভের জন্য মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে৷ এব্যাপারে কি বলবে স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়?

করোনাভাইরাসকরোনা টেস্টের সিরিয়াল বাণিজ্যেও মেতে উঠছে একশ্রেণির দালাল চক্র৷ আরও চলছে করোনা পজিটিভের সার্টিফিকেট বাণিজ্য৷ কতিপয় সরকারী কর্মচারী করোনার প্রণোদনা হাতিয়ে নিতে এসব অপকর্মে লিপ্ত রয়েছে৷ সংবাদপত্রে এসেছে ডাক্তার, নার্সরা ২০ কোটি টাকার একমাসের খাবার খেয়ে ফেলেছে৷ করোনাই তাদেরকে এই মহাসুযোগটা দিলো৷ সুযোগ দিল খাওয়ার৷ সুযোগ দিল লুটপাটের৷

বিজ্ঞাপন

সুযোগ দিলো গার্মেন্টস মালিকদের ৫০০০ কোটি টাকা প্রণোদনা পাওয়ার৷ সোনালী ব্যাংকও করোনা ইস্যুতে ১০ হাজার কোটি টাকা মূলধন চাচ্ছে৷ করোনার তিনমাসের স্থায়িত্বেই যদি এই অবস্থা হয়৷ কিছুদিন গেলে পরে আর কী হবে? সোনালী ব্যাংক করোনাকালে কয়েকমাস কিস্তি স্থগিত ছাড়া আর কী কাজটি করেছে? ব্যাংকে কৃষক শ্রমিকের কতটাকা ঋণ আর শিল্পপতিদের কত টাকা ঋণ?শিল্পপতিদের ঋণখেলাপীর দায় কি করোনাকালের? এ বিষয়ে কী বলবে অর্থ মন্ত্রনালয়?

এখন সোনালী ব্যাংক মূলধন চাচ্ছে৷ পরে হয়তো কৃষিব্যাংক,জনতা ব্যাংক, অগ্রনী ব্যাংক প্রভৃতিও চাইবে? সরকার কি পারবে সব চাহিদা মেটাতে? সরকারের কি স্পেশাল কোন ইনকাম সোর্স আছে?সরকারতো জনগণের অর্থের পাহাড়াদার মাত্র৷ জনগণের কী সার্মথ্য আছে সরকারের কোষাগারে এসব অর্থ জমা দেয়ার? ঋণখেলাপী গার্মেন্টস মালিকদের প্রণোদনা আছে৷ সরকারি কর্মচারীদের প্রণোদনা আছে৷ কিন্তু কৃষক,শ্রমিক,ক্ষুদ্রব্যবসায়ী ও ক্ষেতমজুরদের কি করোনা ঝুঁকি নেই? তাদের কেন প্রণোদনা নেই? করোনাকালের এই মহামারীতে মন্ত্রীদের ভূমিকা কী? তারা কি তাদের বেতন ভাতার অংশ হতে জনবান্ধব আপৎকালীন কোন তহবিল গড়েছে? ইচ্ছে করলে কি তারা তা পারতোনা? করোনা মোকাবেলায় কি দায়িত্ব পালন করেছে এমপিরা, আমলারা?

স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ,অর্থ, প্রবাসীকল্যান, ত্রাণ ও দুর্যোগ কোন মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতা নেই? ত্রাণ মন্ত্রী ত্রাণ চুরি ঠেকাতে পারেনি৷ ব্যর্থতা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়েরও তারা সঠিক পরিকল্পনা করতে পারেনি৷ ব্যর্থতা প্রবাসী কল্যান মন্ত্রণালয়ের তারা প্রবাসীদের সঠিক পথে থাকার ক্ষেত্র সৃষ্টি করতে পারেনি৷ আর স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতা একের পর এক চলছেই৷ রিজেন্ট হাসপাতালের বিরুদ্ধে উঠলো করোনার ভুয়া টেস্ট রিপোর্টের অভিযোগ৷ রাজধানীর এই হাসপাতালটিতে করোনা চিকিৎসায় অনিয়মের বিষয়ে উত্তরা ও মিরপুর শাখায় অভিযান চালাচ্ছে র‍্যাব। এতে আটকও করা হয়েছে অভিযুক্তদের৷ এই হাসপাতালের লাইসেন্সের মেয়াদ ফুরিয়েছে ৬ বছর আগে। তবু কাজ চলছিলো বহাল তবিয়তে। তার ওপর এই লাইসেন্সবিহীন হাসপাতালকেই বিশেষায়িত কোভিড হাসপাতালের স্বীকৃতি দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর৷ এমনটি কিভাবে হতে পারলো?

করোনা ভাইরাস শনাক্তকারী পরীক্ষা ভুলআটকদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি এ বিষয়ে স্বাস্থ্যঅধিদপ্তরের ব্যাখ্যা নেয়াও আবশ্যক নয় কি? কিন্তু এদেশে ব্যর্থতার দায় স্বীকারের কোন নজীর নেই৷ অথচ বিদেশে কী হয়? আইসোলেশন সেন্টারের নিরাপত্তায় গাফিলতি ও লকডাউনের নিয়ম না মানায় সমালোচনার মুখে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন নিউজিল্যান্ডের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডেভিড ক্লার্ক।বাংলাদেশ কি এ থেকে শিক্ষা নেবে? বাংলাদেশের কোন মন্ত্রণালয় বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে তাদের কোন ব্যর্থতা নেই? এত এত ব্যর্থতার বোঝা আর কতদিন বইবে তারা আর মানুষ সইবে দুর্গতি।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)