চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বিসিএস ও বাংলাদেশের চাকুরি ব্যবস্থা

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, লেখক, গবেষক অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেছেন, দুর্নীতির ব্যাপকতাই বিসিএসের প্রতি শিক্ষার্থীদের মোহ তৈরি করেছে। তিনি জোরের সহিত উল্লেখ করেন; বিসিএস পরীক্ষা নিয়ে অধিক মাতামাতি সমাজের সার্বিক অধঃপতন। বিসিএসের ডামাডোলের কারণে শিক্ষার্থীরা এসএসসি পরীক্ষার পূর্বেই বিসিএস প্রস্তুতির সঙ্গে পরিচয় হচ্ছে যেটিকে তিনি অসুস্থ ধারার শিক্ষা ও সমাজ হিসেবে অভিহিত করেছেন। অনেক পূর্বের এক গবেষণায় এসেছে একজন মেডিকেল শিক্ষার্থীর পেছনে সরকারের ৮ লাখ টাকা খরচ হয় বর্তমানে সেটির পরিমাণ নিঃসন্দেহে বৃদ্ধি পেয়েছে। তদুপরি দেখা যায় বিসিএস প্রশাসনে, পররাষ্ট্রে মেডিকেলের শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তিতে উচ্ছ্বাস ও অভিনন্দনের জোয়ার সর্বত্র। বিসিএস পরীক্ষায় কেন এত মোহ সে প্রশ্নের উত্তর গণমাধ্যমের বের করা উচিত। তাহলেই দেখা যাবে বিসিএস এর মোহ থাকবে না। শিক্ষার্থীদের এবং ফলশ্রুতিতে গবেষক, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, ডাক্তার, শিক্ষক তৈরি হবে।

সম্প্রতি দৈনিক কালের কন্ঠের প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, ৩৮ তম বিসিএসে ২৪টি ক্যাডারে ২২০৪জনকে সুপারিশ করেছে সরকারি কর্ম কমিশন। তার মধ্যে পররাষ্ট্র ক্যাডারের ২৫ জন প্রার্থীর মধ্যে ৭ জনই বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করেছে, ১৩ জন পাশ করেছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এ পরিসংখান থেকে সহজেই অনুমেয় যে ডাক্তার, প্রকৌশলীরা তাদের পেশা পরিবর্তন করছে, শুধু তাই নয় অন্যান্য পেশাতে যাদের সম্পৃক্ত হওয়ার কথা তারাও নানাবিধ কারণে পেশা পরিবর্তন করছে। যেমন কৃষিবিদরাও পুলিশ, পররাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। খোলা চোখে দেখা যায়, প্রার্থীদের বিসিএসে প্রশাসন, পররাষ্ট্র ও পুলিশ ক্যাডারে আগ্রহ বেশি। বিশেষায়িত পেশা থেকে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য বরাদ্দকৃত ক্যাডারে প্রার্থীরা বেশি পরিমাণে ঝুঁকছে। এটিও অত্যন্ত আগ্রহের প্রশ্ন হতে পারে; বিসিএসে প্রশাসন, পররাষ্ট্র ও পুলিশ ক্যাডারে কেন চাকুরি প্রার্থীদের আগ্রহ বেশি সেটি খুঁজে বের করা গণমাধ্যমের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলে মনে করি। তাহলেই থলের বেড়াল বের হয়ে আসতে পারে এবং শিক্ষার্থীরা সার্বিকভাবে ত্রুটি বিচ্যুতি জেনে তথ্যযোগে পরামর্শ নিয়ে ভবিষ্যৎ লক্ষ্য নির্ধারণে কাজ করে যেতে পারবে।

বিজ্ঞাপন

করোনার সামগ্রিক পরিস্থিতিতে পরিস্থিতি মোকাবেলায় ডাক্তার, নার্স ও পুলিশদের ভূয়সী প্রশংসা সর্বজনবিদিত এবং অগ্রগামী ভূমিকায় তাদের গৌরব সর্বত্র সমাদৃত। বিশেষ করে যারা ডাক্তার এবং পুলিশদের নানা বাক্যবাণে জর্জরিত করত তারাও করোনাকালে পুলিশ এবং ডাক্তারদের যথার্থ দায়িত্বকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। প্রসঙ্গক্রমে একটি ঘটনার উল্লেখ করা প্রয়োজন যার পরিপ্রেক্ষিতে মানুষ হিসেবে আমাদের সামাজিকতা, নৈতিকতা, মানবিকতা, মানবিক মূল্যবোধসহ সামাজিক বাস্তবতায় বিবেচ্য ক্রমে পাঠোদ্ধার করা সম্ভবপর হবে। করোনায় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ময়মনসিংহের চরপাড়ায় একজন ডাক্তার করোনায় সংক্রমিত হবার ফলশ্রুতিতে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করেন এলাকাবাসী এবং দুপুরের খাবারের সময়টুকুও মানতে নারাজ ছিল এলাকাবাসী। অর্থাৎ করোনা যোদ্ধাদের আমরা কিভাবে মূল্যায়ন করেছি সেটার হিসেবটুকু মেলাতে উক্ত ঘটনাটি প্রাসঙ্গিক হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া যায়। কিন্তু উল্টো পরিস্থিতি যদি বিবেচনায় নেয়া যায় তাহলে দেখা যায়, ৩৮তম বিসিএস এর ফলাফল প্রকাশিত হবার পরে উক্ত ডাক্তার মেয়েটি প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। পরবর্তীকালে দেখা যায় ডাক্তার মেয়েটিকে অভিবাদন ও শুভেচ্ছা জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রশংসার ঝড় বয়ে যায়। আমরা কাদের মূল্যায়ন করি এবং আমাদের সামাজিক বাস্তবতা কতটুকু সে হিসেব মেলাতে উক্ত ঘটনাটি অপরিহার্য হিসেবে পরিগণিত হবে। উল্লেখ্য যে, করোনার ভয়াবহতা আঘাত হানার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরিতে ব্যস্ত যেখানে তাদের মূল কাজ ছিল ভ্যাকসিন তৈরি করা কিংবা রোগ প্রতিরোধে কার্যকরী কোন ব্যবস্থাপত্র প্রণয়ন করা। কিন্তু সামগ্রিক পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক ও সুখকর করার স্বার্থে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অগ্রগামী ভূমিকা সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের চাহিদা পূরণ করতে পারত।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

ছেলেমেয়েদের ছোট বেলা থেকেই যে বিষয়ে অভ্যস্ত করে তোলা হয় প্রথাগত নিয়মানুসারে তার বাইরে এসে কোন সুচিন্তক অভিলাস কিংবা মতামত বাস্তবায়ন করা তাদের পক্ষে অসম্ভবপর হয়ে উঠে। কারণ, পরিবারের মোটিভেশন এবং শিক্ষার্থীদের সার্বিক পরিবেশ অনুকূলে না থাকলে ক্যারিয়ারকে সুচারূরুপে গঠন করা সম্ভব নয়, কাজেই শিক্ষার্থীকে ভবিষ্যৎ লক্ষ্য নির্ধারণের স্বার্থে অভিভাবক, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের সম্পূরক সমন্বয়তার প্রয়োজন রয়েছে। আবার শিক্ষার্থীরা নানা বিষয় দেখে তাদের মধ্যে প্রচলিত সময়ের সম্মিলনে সমাজের গুরুত্বকে অনুধাবন করতে পারে এবং সেটিকে মাথায় রেখেই ক্যারিয়ার অরিয়েন্টেড প্রস্তুতি নিয়ে থাকে। সে কারণেই দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর অধিকাংশ শিক্ষার্থী ১ম বর্ষ থেকেই বিসিএসের প্রস্তুতি নিয়ে থাকে এবং অনেককে কোচিং এ ভর্তি হতে দেখা যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশের ক্রান্তিলগ্নে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষা গবেষণা দিয়ে সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা তেমন পালন করতে পারছে না। বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ হচ্ছে জ্ঞান সৃজন করা, জ্ঞানের চর্চা করা, উদ্ভূত জ্ঞানকে পরিস্থিতি মোকাবেলায় কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে জনকল্যাণ করা। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ের ক্ষেত্রে অন্তরায় হিসেবে কাজ করে থাকে ক্যারিয়ার ভিত্তিক পড়াশোনা, চাকুরি নিয়ে শিক্ষার্থীদের ভীতি, পেশাগত বৈচিত্র্যতার অপ্রতুলতা ইত্যাদি। তবে মোদ্দা কথা হচ্ছে, একাডেমিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ক্যারিয়ার অরিয়েন্টেড চাকুরির ব্যবস্থা নিশ্চয়তার মাধ্যমেই শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে নিঃসন্দেহে।

করোনার সংকটকে কাটিয়ে তোলার নিমিত্তে শিক্ষা ব্যবস্থাকে যেমনভাবে ঢেলে সাজাতে হবে ঠিক তেমনভাবে শিক্ষার্থীদের যথোক্ত চাকুরির সুব্যবস্থা করতে হবে যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের অনার্স, মাস্টার্সের একাডেমিক জ্ঞানকে দেশগড়ার প্রত্যয়ে নিয়োজিত রাখতে পারে। সে ক্ষেত্রে তত্ত্বীয় জ্ঞানকে চাকুরির ক্ষেত্রে কাজে লাগানোর উপযুক্ত ফোরাম সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ জ্ঞানে শিক্ষিতদের বিশেষ জায়গায় কাজে লাগানো এবং যথোক্ত মর্যাদার অনুশীলন করতে হবে রাষ্ট্রকে। তাহলে দেখা যাবে, শিক্ষা ব্যবস্থায় বিশেষ করে কারিকুলামে নিশ্চিতভাবে পরিবর্তন আসবে এবং বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার সোপান পর্যায়ক্রমে ঈর্ষণীয় অবস্থায় পৌঁছবে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)