চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বিএনপি-জামায়াত নিকাহনামার বদলে দরকার যে তালাকনামা

কয়েকদিনের ব্যবধানে খুন হলেন ইতালি ও জাপানের দুই নাগরিক। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ পর্যবেক্ষকদের ওয়েবপোর্টাল ‘সাইট’ জানালো খুনের পিছনে আইএস। বিশেজ্ঞরা বলছেন, আইএস-এর খুনের স্টাইল এরকম নয়। তবে দুই বিদেশির খুন হওয়ার পর এখন আলোচনায় জঙ্গিবাদ। এ অবস্থায় বিএনপিও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান জানান দিলো।

বিজ্ঞাপন

রীতিমতো সংবাদ সম্মেলন করেই জঙ্গি দমনে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিতে সরকারকে আহ্বান জানিয়েছেন দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ আহ্বান অবশ্যই রাজনীতিতে একটা ইতিবাচক দিক। প্রধানমন্ত্রী চ্যাম্পিয়ন্স অব দ্য আর্থ পুরস্কার পাওয়ায় বিএনপির অভিনন্দন জানানোও ছিলো আরেকটি ইতিবাচক রাজনীতি। তবে জামায়াতের সঙ্গে থেকে জঙ্গিবাদ দমনে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান প্রশ্ন জাগায় বৈকি।

দল হিসেবে জামায়াত যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িত। অবশ্যই মৌলবাদী দল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মওদুদী তত্ত্বের মাধ্যমে জঙ্গি ধারণা জামায়াতের মাধ্যমে উপমহাদেশে ছড়িয়েছে। সেই জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির সখ্য নতুন নয়। যদিও বিএনপি বারবারই বলার চেষ্টা করে জামায়ায়াতের সঙ্গে তাদের আন্দোলনের জোট, নির্বাচনী জোট, কৌশলগত জোট ইত্যাদি, ইত্যাদি। বিএনপি যাই বলুক না কেন এদেশের সিংহভাগ মানুষই রাজনৈতিকভাবে ব্যাপক সচেতন। যা-তা বুঝিয়ে পার পাওয়া যাবে না। তাতে অনেক প্রশ্নই সামনে চলে আসবে। জামায়াতকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুনর্বাসন করেছে কে? জামায়াতের সঙ্গে প্রথম রাজনৈতিক জোট বেঁধেছে কে? ঘৃণ্য যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতাদের গাড়িতে পতাকা লাগিয়ে দিয়েছে কে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সবাই জানে। অবশ্য ৯৬ এর আগে জামায়াতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সখ্যতাও মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া দলটির জন্য একটা কালো দাগ হয়েই থাকবে।

বিশ্ব রাজনীতিও এখন জঙ্গি দমন নিয়ে বেশ গোলমেলে। আইএস জঙ্গি দমনে মার্কিন ও তার মিত্ররা যখন মধ্যপ্রাচ্য দাপাচ্ছে ঠিক তখনই রাশিয়াও সিরিয়ায় আইএস নির্মূলে মাঠে নেমেছে। যুক্তরাষ্ট্রের আাঁতে ঘা লাগলেও কিচ্ছুটি বলতে পারছে না। এ অবস্থায় জঙ্গি দমনে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিতে বিএনপির আহ্বান বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটু গোলমেলেই ঠেকছে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতকে পুনর্বাসন করেছে বিএনপি। যুদ্ধারাধীদের মন্ত্রী বানিয়েছে বিএনপি। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর সারাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন জামায়াতের জঙ্গি চরিত্রের প্রকাশ বাংলাদেশের মানুষ দেখেছে, তখন ক্ষমতায় বিএনপি-জামায়াত জোট। জেএমবি, বাংলা ভাইয়ের উত্থান বাংলাদেশের মানুষ দেখেছে। কোন সময় কাদের ছত্রচ্ছায়ায় জেএমবির উত্থান তাও মানুষের অজানা নয়। জেএমবি জামায়াতেরই জঙ্গি রূপ। আফগান যুদ্ধে কারা গেছে? জামায়াত কর্মী রিক্রুট করে আফগানিস্তানে ট্রেনিংয়ে পাঠিয়েছে। সেখান থেকে জঙ্গিবাদের বিষবাস্প বাংলাদেশে ছড়িয়েছে সেকথা কারই বা অজানা!

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা কারা ঘটিয়েছিলো? সবই বেরিয়ে আসবে। হরকাতুল জিহাদ কারা? কাদের সৃষ্টি? মানুষ নিশ্চয় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নয়। সবাই সব কিছুই দেখতে পায়।

আর জামায়াতের রাজনৈতিক সন্ত্রাসতো রগ কাটার মতো নৃশংসতা। জামায়াতের ছাত্র সংগঠন শিবিরইতো এই রগকাটা সন্ত্রাস বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আপ্ল্যাই করেছে। এখনও করছে। এইতো ক’দিন আগেই সারাদেশে জামায়াতের জঙ্গি কর্মকাণ্ড খুব সহজেই কি মানুষ ভুলে যাবে? জামায়াতের সন্ত্রাসের আরো একটি ভয়াবহ রূপ ছিলো মানুষ পুড়িয়ে মারা।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ঠেকাতে আন্দোলনের নামে যখন একের পর এক মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করা হচ্ছিলো তখন বিএনপি কিছুই বলেনি। এমনকি অংশী হয়েছে ওইরকম জঙ্গি হামলার। জামায়াতের নগ্ন থাবায় যখন রক্তাক্ত হয়েছে সাতক্ষীরা তখনও বিএনপি চুপ। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরুর পর জামায়াতের নেতাদের বিচারের রায় নিয়েও বিএনপির প্রতিক্রিয়া ছিলো না।

এ বিষয়ে বিএনপির অবস্থান মানুষের জানা নেই। জামায়াত ছাড়তে আন্তর্জাতিক মহলের চাপ থাকা সত্ত্বেও বিএনপি-জামায়াত বন্ধন ছেঁড়ার নয়। এ অবস্থায় বিএনপির জঙ্গিবিরোধী অবস্থান হাস্যকরই বটে। তারপরও মির্জা ফখরুলের মুখে জঙ্গিবিরোধী অবস্থান ভালোই লেগেছে।

এই ভালো লাগার রেশ ধরে রাখতে বিএনপিকে যে আরো কিছু করতে হবে। খুব বেশি কিছু নয়, জামায়াতকে তালাক দিতে হবে। শুধু কথায় নয় কাজে করেই প্রমাণ করতে হবে। মির্জা ফখরুল বললেই হবে না, খালেদা জিয়াকেও সরব হতে হবে। বিএনপি যদি সত্যিই মনে প্রাণে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় তাহলে খালেদা জিয়াকে স্পষ্ট ভাষায় জামায়াত ছাড়ার ঘোষণা দিতে হবে। খালেদা জিয়ার মুখেই জামায়াত ছাড়ার ঘোষণার পর জঙ্গি নির্মূলে জাতীয় ঐক্যের প্রস্তাব শুনলে সবাই হয়ত আশ্বস্ত হবে। জামায়াতের সঙ্গে সখ্যতা, জামায়াতকে রাজনীতিতে আনা, যুদ্ধারাধীদের মন্ত্রী বানানো যে রাজনৈতিক ভুল ছিলো তা স্বীকার করে ক্ষমা চাইলে নিশ্চয় দোষের হবে না।

বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে জামায়াতকে বিদায় দিতে একমত হতে আওয়ামী লীগকে প্রস্তাব দেবে বিএনপি? এক্ষেত্রে দু’দলের ঐকমত্য স্বপ্ন হলেও অবাস্তব নয়। এরকম স্বপ্ন এদেশের মানুষই দেখে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন