চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বাংলা একাডেমি কি তাদের প্রতিষ্ঠাকালীন কর্মসূচি থেকে সরে এসেছে?

বেশ কয়েক বছর ধরে একুশে বইমেলার আয়োজন এবং ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে আসছে বাংলা একাডেমি, যা বাংলা একাডেমির প্রতিষ্ঠাকালীন কর্মসূচির মধ্যে আদৌ ছিল না। এ কাজটি করতে গিয়ে বাংলা একাডেমিকে যেমন অনেক শ্রম ও লোকবল নিয়োগ করতে হচ্ছে, তেমনি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জড়িয়ে পড়তে হচ্ছে নানা সমালোচনায়। এমনকি স্টল ও স্থান বরাদ্দ নিয়ে নানা সময় উঠছে বৈষম্যের অভিযোগ।

অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০১৮ এর আগে ‘বাংলা একাডেমি ও বইমেলা’ শিরোনামে ফেসবুকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে লেখক জাকির তালুকদার বিষয়টি আবারও তুলে ধরেছেন।

বিজ্ঞাপন

ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি লিখেছেন: ‘‘যে কাজটি বাংলা একাডেমির প্রতিষ্ঠাকালীন কর্মসূচির মধ্যে আদৌ ছিল না তা হচ্ছে একুশের বইমেলার আয়োজন এবং ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন। কিন্তু এটাই এখন বাংলা একাডেমিকে ব্যাপক সময়-শ্রম-লোকবল ব্যবহার করতে বাধ্য করছে। বইমেলা বাংলা একাডেমিকে কয়েক বছর ধরে বিতর্কিত করছে, বিব্রত করছে, সত্য-মিথ্যা নানা ধরনের গালিগালাজ শুনতে বাধ্য করছে। আবার সেসবের উত্তর দিতে গিয়ে বাংলা একাডেমিকে জড়িয়ে পড়তে হচ্ছে আরো বেশি বিতর্কে।

অনেক বছর ধরেই বিভিন্ন মহল থেকে বলা হচ্ছে যে বইমেলার দায়িত্বটি বাংলা একাডেমির কাঁধ থেকে নামিয়ে তা দেওয়া হোক প্রকাশক সমিতির হাতে। পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশেই বইমেলার আয়োজন এবং ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকে প্রকাশকদের সমিতি। কিন্তু বাংলাদেশের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় যেমন কর্ণপাত করে না এই ধরনের কথায়, তেমনই প্রকাশক সমিতিকেও দায়িত্ব নিতে আগ্রহী বলে মনে হয়নি কখনো। প্রকাশকদের সমিতি কোনো দায়িত্ব নেবে না, কিন্তু অধিকার ভোগ করবে অনেক। এককথায়—ফোঁপড়দালালি। ‘তোমার চিবুক ছোঁবো কালিমা ছোঁবো না’। এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রকাশকরা পেশাদারিত্বের পথে যেতে অনিচ্ছুক। লেখকদের অসচেতনতা প্রকাশকদের অবাধে নিজেদের সুকর্ম ও কুকর্ম চালিয়ে যেতে ব্যাপক সহায়তা করছে। প্রকাশকদের মধ্যে কিছু আবার তথাকথিত ‘বড় প্রকাশক’ হয়ে উঠেছেন। তারা বাংলা একাডেমিকে বাধ্য করছেন বইমেলাতে নিজেদের জন্য সুবিধাজনক সিদ্ধান্ত, সুবিধাজনক স্টল, সুবিধাজনক প্যাভিলিয়ন দিতে।

প্রকাশকদের এই প্রভাব কিন্তু তাদের প্রকাশিত বই বা পেশাদারিত্ব দিয়ে নয়। বরং এই প্রভাব তারা অর্জন করেছেন সরকার এবং সরকারি দলের বিভিন্ন স্তরের অনৈতিক সহযোগিতায়। তাই তারা কোনো দায়িত্ব পালন বা জবাবদিহিতার আওতায় না থেকে দিব্যি অগ্রাধিকার ভোগ করে থাকেন। কখনো কখনো নিয়ন্ত্রকের ভূমিকাতেও অবতীর্ণ হতে পারেন। একুশের এই বইমেলা থেকে লেখকরা নন, বাংলা একাডেমি নয়,– বরং সর্বতোভাবে লাভবান হয় এই তথাকথিত ‘বড় প্রকাশক’রা।

বিজ্ঞাপন

বছর গড়াচ্ছে, আর বেশি করে অভিযোগের আঙুল উঠছে বাংলা একাডেমির দিকে। সব অভিযোগ অমূলক, এমনটি বলা যাবে না। তবে অনেকগুলোই বাংলা একাডেমির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবার কথা নয়। কিন্তু আয়োজক এবং ব্যবস্থাপক সংস্থা হিসাবে জবাবদিহিতা একমাত্র বাংলা একাডেমিকেই করতে হয়। সেই কারণেই দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার যে মুক্তবাজার পুঁজিবাদী অর্থনীতির দেশে বড় পুঁজি বিনিয়োগকারীর কাছে ছোট পুঁজি হেরে যাবে। কিন্তু বিষয়টি যখন বই, তখন তাকে পুঁজিবাদী পণ্যের মানদণ্ডে মাপা যাবে না সবসময়। ন্যূনতম সাংস্কৃতিক চেতনা যার মধ্যে আছে, তাকে অবশ্যই বই নিয়ে আলাদা করে ভাবতে হবে। বাংলা একাডেমির জন্য এটা তো ফরজ। বইয়ের স্টল বা স্থান বরাদ্দের জন্য নিলাম ডাকার প্রতিযোগিতায় ছোট এবং পুঁজিহীন প্রকাশকদের যাতে নামতে না হয়, তাই তাদের সুরক্ষার ব্যবস্থা বাংলা একাডেমিকে করতেই হবে। ছোট প্রকাশনীর পুঁজি হচ্ছে ভালো এবং চিন্তামূলক বই। সেইসাথে তরুণদের বই। এই ধরনের বইকে সামনে তুলে ধরার একমাত্র সুযোগ তাদের কাছে একুশের বইমেলা।

তাই বাংলা একাডেমিকে এই ক্ষেত্রে ‘পজেটিভ ডেসক্রিমিনেশন’ নীতি কিছুটা হলেও গ্রহণ করতে হবে। নারী-পুরুষদের ক্ষেত্রে যেটি নারীর পক্ষে ব্যবহার করা হয়, তা বইয়ের ক্ষেত্রেও সুফল বয়ে আনবে।

বাংলা একাডেমিকে স্টল বরাদ্দ এবং স্থান বরাদ্দের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানাচ্ছি।’’