চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বসবাস অযোগ্য নয়, রাজধানী এখন মৃতপ্রায় নগরী

রাজধানীতে যানজট নতুন বিষয় নয়। পথে নেমে ভোগান্তি নগরবাসীরা নিয়তির লিখন হিসেবেই মেনে নিয়েছেন। তবে সম্প্রতি তা যেনো সীমা ছাড়িয়ে গেছে। রাজধানীতে দিন দিন বেড়েই চলছে যানজটের তীব্রতা।

অসহনীয় এ যানজটে অতিষ্ঠ রাজধানীবাসী। কর্মক্ষেত্রে যাওয়া এবং কর্মক্ষেত্র থেকে ঘরে ফেরার মধ্যেই নাগরিকদের সব শক্তি ও সময় নিঃশেষ হতে চলেছে। মহাখালী থেকে মোহাম্মদপুর আসতে আগে যেখানে লাগত ৪৫ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা, এখন লাগছে দুই থেকে তিন ঘণ্টা।

বিজ্ঞাপন

যানজটের সঙ্গে গ্যাস, গণপরিবহন সংকটসহ বিভিন্ন সমস্যা মিলিয়ে ঢাকা শহর হয়ে উঠেছে বসবাসের একদম অযোগ্য শহর। পরিবহনে গন্তব্যে পৌঁছানোর কোনো নিশ্চয়তা নেই। আমাদের সাধের রাজধানী পরিণত হয়েছে এখন মৃতপ্রায় এক নগরীতে। অপরিকল্পিত উন্নয়নের ফসল হচ্ছে ঢাকা শহরের এই যানজট, এই স্থবিরতা!

কিন্তু কেনো এমন অসহনীয় যানজট? পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং ট্রাফিক পুলিশরা বলছেন, বর্তমানের এই যানজটের অন্যতম কারণ বাণিজ্য মেলা। এই মেলার কারণে আগারগাঁও, শ্যামলী লিংক রোড, মিরপুর রোড, আসাদগেট, মানিক মিয়া এভিনিউ, ফার্মগেট, বিজয় সরণি, তেজগাঁও প্রভৃতি সড়কে স্বাভাবিক যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় এক অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর যৌথ উদ্যোগে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা শেরেবাংলা নগর এলাকায় গত ২০ বছর ধরে পুরো জানুয়ারি মাস ধরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। স্থানীয় উৎপাদকদের মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতা সৃষ্টি, বিভিন্ন পণ্যকে গ্রাহকের কাছে সরাসরি তুলে ধরা, রপ্তানি আয় বাড়ানো ইত্যাদি এ মেলার প্রধান উদ্দেশ্য বলে প্রচার করা হয়।

কিন্তু এই উদ্দেশ্য এখন আর অবশিষ্ট আছে বলে মনে হয় না। বাণিজ্য মেলায় বিদেশি ক্রেতাদের সরাসরি পণ্যের অর্ডার দেয়ার পরিমাণ মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। মেলায় এখন যা পাওয়া যায়, নিউমার্কেট, চাঁদনিচকসহ রাজধানীর বেশিরভাগ মার্কেটেই তা পাওয়া যায়।

অনেকে তো এ মেলাকে ‘প্লাস্টিক মেলা’ বলেও অভিহিত করে থাকেন। মেলায় একে তো নিম্নমানের পণ্য, তার উপর প্রায় সব পণ্যের দামই বেশি, এমনকি খুচরা বাজারের চেয়েও। তাহলে কী লাভ প্রতি বছর হাঁকডাক করে সারা বছরে এ রকম একটি মেলার গতানুগতিক আয়োজনে? শুধুই দেশীয় ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার জন্য?

বিজ্ঞাপন

সবচেয়ে বড় কথা, যে মেলার কারণে এক মাস ধরে অসহনীয় অবর্ণনীয় যানজট ও জনজট লেগে থাকে, লাখ লাখ মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পথে নিশ্চল-স্থবির বসে থাকতে হয়, সে মেলা যদি আর্থিকভাবে কিছু উপকারীও হয়, তবু তা বন্ধ করে দেয়া কি উচিত নয়? লাখ লাখ মানুষের এক মাসের ভোগান্তির মূল্য একশ কিংবা দেড়শ কোটি দিয়ে কি বিবেচনা করা উচিত?

তার মানে এই নয় যে, আমরা বাণিজ্য মেলার বিরুদ্ধে। বাণিজ্য মেলা, আমদানি মেলা, রপ্তানি মেলা, বৃক্ষ-পাতা-ফল-ফুল-পাখি মেলা, খেলা, যাত্রা, সার্কাস যা খুশি তাই আয়োজন করা যেতে পারে এবং তা করাও উচিত। সে সব এক মাস, দুই মাস এমনকি বছরের পর বছর, যুগের পর যুগও চলতে পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগের মুখোমুখি ফেলে এমন কোনো আয়োজনই কাম্য নয়। এমনকি তা যদি কোনো মহৎ আয়োজন হয় তবু নয়! বাণিজ্য মেলাকে অবশ্যই রাজধানীর বাইরে নিয়ে যেতে হবে। সংশ্লিষ্টরা সাভার বা পূর্বাচলের কথা ভেবে দেখতে পারেন।

সময় না বাড়িয়ে অবিলম্বে রাজধানীবাসীর জন্য চরম দুর্ভোগের এই তথাকথিত বাণিজ্য মেলা অবিলম্বে বন্ধ করে দেয়া দরকার। শুধু বাণিজ্য মেলাই নয়, যানজট সৃষ্টি হয় বা সৃষ্টি হতে পারে, জনদুর্ভোগের কারণ হয়- এমন সব কিছুই সচেতনভাবে পরিহার করতে হবে।

যানজট কমাতে ভিআইপিদের চলাফেরাও নিয়ন্ত্রিত হওয়া চাই। প্রয়োজনে ঘরে বসে, ডিজিটাল পদ্ধতির প্রয়োগ ঘটিয়ে ভিআইপিরা কাজ করুন। সারাদিন ঘুমিয়ে রাত এগারোটার পর যত খুশি ছুটোছুটি করুন। একটি শহরের হাজার-হাজার লাখ লাখ মানুষ দিনের পর দিন রাজপথে দুর্বিষহ জীবন কাটাবেন, আর কর্তাব্যক্তিরা সবাইকে, সব কিছুকে যতক্ষণ খুশি ‘থামিয়ে রেখে’ উন্নয়নের গান শোনাবেন- তা মেনে নেয়া যায় না। এর প্রতিবিধান করা উচিত।

রাজধানীর যানজট নিয়ে আলাপ-আলোচনা, উদ্যোগ-আয়োজন কিছু কম হয়নি। কিন্তু এসবের নিট ফলাফল হচ্ছে- আরও যানজট, অধিকতর যানজট! এ ধারা চলতে থাকলে পুরো শহর, পুরো দেশ অচল হয়ে পড়তে বাধ্য।রাজধানীকে, দেশকে অচল-স্থবির বানিয়ে রেখে নিশ্চিন্তে ক্ষমতার কাবাব-পরোটা খাওয়া খুব বেশিদিন সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। প্রতিকারহীন যানজটে অতিষ্ঠ ক্ষুব্ধ-বিরক্ত মানুষ যদি ঢিল ছোঁড়া শুরু করে, র‌্যাব-পুলিশ তো দূরের কথা কামান দিয়েও তা ঠেকানো যাবে বলে মনে হয় না। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা মনে রাখলে ভাল করবেন।

সরকারের যদি রাজধানীর প্রতি, রাজধানীর মানুষের প্রতি ন্যূনতম দায়িত্ববোধ থাকে, তাহলে ঢাকা শহরকে যানজটমুক্ত করা এক নম্বর এজেন্ডা হওয়া উচিত।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View