চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বলিউডেই চোখ জেরিনের

তখনো পড়ালেখা করছেন। গ্র‌্যাজুয়েশন চলছে। দিল্লীর সারদা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাংলাদেশ ছেড়ে গেছেন প্রায় দুই বছর হলো। থাকেন নতুন দিল্লীতে। জার্নালিজমের প্রতি টান থেকেই ঢাকা ছেড়ে দিল্লীতে পড়তে গিয়েছিলেন। একাডেমিক পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে গণমাধ্যম নিয়ে প্রফেশনাল জীবনে পা রাখবেন, এমন স্বপ্নে যখন বিভোর ঠিক সেই মুহূর্তেই ডাক আসে আরাধ্য বলিউড থেকে! রীতিমত অবিশ্বাস্য কাণ্ড!

না। অভিনয় ক্যারিয়ারে নয়! সহ-পরিচালক হিসেবে কাজ করতে সত্যি সত্যিই এক সকালে বলিউডের ডাক পেয়েছিলেন ঢাকার মেয়ে জেরিন হোসেন! সে কি আনন্দ তার! কিন্তু তাই বলে সাংবাদিককতায় পড়তে গিয়ে সিনেমায় নিজেকে জড়াবেন? এটা কি পূর্ব পরিকল্পিত?

জেরিন হোসেন জানান, সাংবাদিকতার পাশাপাশি ডিরেকশানের প্রতিও ছিলো তার প্রবল ঝোঁক। তাছাড়া সাংবাদিকতায় পড়াকালিন সময়েই তাকে সিনেমা সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়েও পড়তে হয়েছে। একাডেমিক প্রয়োজনেই। মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ে পরের সেমিস্টারটি ছিল টিভি প্রডাকশনের ওপর! আর যখন বলিউড থেকে সহ-পরিচালক হওয়ার প্রস্তাবটি আসে তখন গ্রীষ্মের ছুটিও চলছিলো। সব মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করলেন না জেরিন। ছুটে গেলেন মুম্বাই! নির্মাণের পথে।

ভিজ্যুয়াল মিডিয়ায় নতুন নন জেরিন। বাংলাদেশে যখন ছিলেন, তখন মিডিয়াতেই কাজ করতেন নিয়মিত। দুটি বেসরকারি টেলিভিশনের জনপ্রিয় দুটি শোয়ের সহ-প্রযোজক ছিলেন। এশিয়াটিকের দুটি গেম শো করেছেন। কাজ করেছেন ক্যামেরার সামনেও। একটি জুসের বিজ্ঞাপনেও দেখা গিয়েছিলো তাকে। যুক্ত ছিলেন থিয়েটারের সঙ্গেও। মানে এই অঙ্গন তার চেনা! বেশ পরিচিত! তবে ভয় ছিলো ‘বলিউড যাত্রা’ নিয়ে! ভাবনা ছিলো, বলিউড তাকে কীভাবে গ্রহণ করে?

কতো বড় ইন্ডাস্ট্রি, কতো রকমের মানুষ, কতো কতো মিথ, কতো রকমের ভাবনার সম্মিলনে দাঁড়িয়ে আছে বলিউড! আর সেখানে বাংলাদেশ থেকে আসা কোন্ এক জেরিন হোসেন নস্যি! তাকে কে মূল্যায়ণ করবে? এমনটা ভাবতে ভাবতেই প্রযোজনা সংস্থা ‘ড্রামরোল পিকচার্স’-এ যোগ দিলেন। কিন্তু বলিউডে পা রেখে জেরিন দেখলেন পুরো উল্টো চিত্র।

বিজ্ঞাপন

কে নারী, কে পুরুষ কিংবা কে কোন দেশ থেকে এসেছে সেটা তাদের কাছে মূল্যহীন। এখানে কাজের মূল্য সবচেয়ে বেশি, সবাই এখানে প্রফেশনাল। পরিচয় হলো ‘ড্রামরোল পিকচার্স’-এর পরবর্তী প্রজেক্ট ‘আংরেজি ম্যায় কেহতা হ্যায়’-এর নির্মাতা হরিষ ব্যাসের সাথে। সেই সাথে সাক্ষাৎ হলো পুরো টিম মেম্বারদের সাথে। জেরিনের সামনে উন্মোচিত হল এক নতুন দুনিয়ার!

সেই শুরু। হরিষ ব্যাসের ছয়জন সহকারির তিন নম্বর সহকারি পরিচালক হিসেবে বলিউডে যাত্রা শুরু করলেন জেরিন। প্রি-প্রোডাকশান থেকে শুরু করে ছবি মুক্তি পর্যন্ত এই টিমের সঙ্গে ছিলেন তিনি। কাজের ভেতরে থেকে দেখেছেন বলিউডে কাজের ধরন। কতোটা প্রফেশনাল অয়েতে কাজ করেন সেখানকার ডিরেক্টর থেকে শুরু করে আর্টিস্ট পর্যন্ত সবাই। আর এসমস্তই পাঠ নিয়েছেন। শিখেছেন প্রতিনিয়ত। গভীর ভাবে অনুধাবন করেছেন, একটি সিনেমা নির্মাণ মানে একটি গভীর সমুদ্রে জাহাজ চালানোর মতো বিষয়! যে জাহাজের ক্যাপ্টেন হলেন নির্মাতা। আবার তারই সাথে সাথে এও দেখেছেন যে, একটি দুর্দান্ত সিনেমা হয়ে উঠার পেছনে শুধু ডিরেক্টরের একার ভূমিকা থাকে না, সবার সম্মলিত প্রচেষ্ঠায় একটা সিনেমা দুর্দান্ত হয়ে উঠে সে পাঠটিও তিনি সেখান থেকে নিয়েছেন। দেখেছেন, সিনেমা নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে নির্মাতা হরিষ ব্যাস কীভাবে সবাইকে নিয়ে বসতেন। টেকনিক্যাল হেড থেকে শুরু করে এডি, সবার কমেন্ট গুরুত্বের সাথে দেখতেন। ‘অ্যাংরেজি ম্যায় কেহতা হ্যায়’-এর উদাহরণ টেনে জেরিন বলেন, একজন সহ-পরিচালকের ভালো লাগাও যখন ডিরেক্টর গুরুত্ব দিচ্ছেন তখন কিন্তু যে কারোরই কনফিডেন্ট লেভেলটা বেড়ে যাবে। বলিউডে এই চর্চার ব্যাপারটা আমি দেখেছি। যা আমাদের এখানে কোনো প্রোডাকশনে কখনো দেখিনি। এখানেতো সব একনায়কতন্ত্র চলে। কারো কোনো স্পেস নেই কথা বলার। একজনই সব সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে থাকেন। তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

বলিউডে জেরিনের প্রথম কাজ ‘অ্যাংরেজি ম্যায় কেহতা হ্যায়’ বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ছবিটি গেল বছরে বেশকিছু আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও বেশ দাপট দেখিয়েছে। এরমধ্যে গেল বছরে অনুষ্ঠিত সাউথ ইন্টারনেশনাল ফিল্ম ফেস্টিভালের ১৪তম আসরে ‘দর্শক জরিপে সেরা ছবি’র পুরস্কার অর্জন করে। ফাইভ কন্টিনেন্টস ইন্টারনেশনাল ফিল্ম ফেস্টিভালে ‘বেস্ট ডিরেক্টর’সহ মোট সাতটি বিভাগে পুরস্কার অর্জন করে ‘অ্যাংরেজি ম্যায় কেহতা হ্যায়’। এছাড়া চলতি বছরে ৮ম দাদা সাহেব ফালকে উৎসবে ‘সেরা চিত্রনাট্য’ বিভাগে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে ছবিটি। এই ছবিতে কাজ করে সিনেমা নিয়ে নতুন উদ্যম খুঁজে পেয়েছেন জেরিন। ভবিষ্যতে যা কাজে লাগাতে চান তিনি। এটাকে শক্তি হিসেবে দেখছেন তিনি।

পেশনের জায়গা চলচ্চিত্র নির্মাণ হলেও জেরিনের প্রফেশনাল জায়গা সাংবাদিকতা। দিল্লীতে এনডিটিভিতে ইন্টার্ন করার পর এখানেই আপাতত কাজ করছেন। এনডিটিভির ‘সেল গুরু’ নামের অনুষ্ঠানেরও সহ-প্রযোজক ছিলেন তিনি। নিউজে কাজ করেছেন টেকনোলজি বিভাগে। তবে ভারতীয় নাগরিক না হওয়ায় তিনি এনডিটিভির সঙ্গে স্থায়ী ভাবে কাজ করতে পারছেন না। আবার এদিকে মুম্বাইয়েও সিনেমা ডাকছে তাকে। পেশা হিসেবে কোনটি বেছে নিবেন তিনি?

-এমন প্রশ্নে বিচলিত নন জেরিন। সাফ জানিয়ে দিলেন, জার্নালিজমের প্রতি আলাদা টান আছে তার। এনডিটিভিতে কাজের পর গেল মাস থেকে ভারতে বিবিসিতে অ্যাসাইনমেন্ট ভিত্তিতে কাজ শুরু করেছেন। গত এক বছরে মুম্বাইয়ের বেশকিছু প্রোডাকশন হাউজ থেকে ডাক পেয়েছেন জেরিন। কিন্তু ছোট বোন দিল্লীতে একটি স্কুলে পড়ছেন বিধায় আপাতত মুম্বাইয়ে স্থায়ী ভাবে যেতেও পারছেন না। তবে আলাপে আলাপে জেরিন জানালেন, শিগগির বলিউডে আরো কয়েকটি প্রজেক্টে কাজের সম্ভাবনার কথা। হয়তো অচিরেই আসতে পারে বাংলাদেশি মেয়ের সুসংবাদটি। হয়তো ধীরে ধীরে বলিউডেই থিতু হওয়ার পরিকল্পনা আঁটছেন জেরিন।

ছবি: ওবায়দুল হক তুহিন

বিজ্ঞাপন