চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বন্যপ্রাণী পাচার যুদ্ধের কেন্দ্রে আফ্রিকা

জাহিদুল করিম: বরাবরই বিচিত্র বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে বিশ্বের বুকে অনন্য স্থান রয়েছে আফ্রিকা মহাদেশের। তবে বন্যপ্রাণী শিকারী, পাচারকারী ও ব্যবসায়ীদের আগ্রাসী তৎপরতার কারণে বিলুপ্তির পথে রয়েছে জলহস্তী, হাতি, শিম্পাঞ্জি, ওরাং-ওটাং, গরিলাসহ অন্যান্য প্রাণীরা। বিশেষ করে ‘নর্দান হোয়াইট রাইনো’ নামে খ্যাত শ্বেত জলহস্তীকে চরম বিপন্ন প্রাণী বলছেন প্রাণীবিজ্ঞানীরা কারণ বর্তমানে সারা বিশ্বে এর সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র পাঁচ-এ। যে প্রাণীটি লাখো বছর পৃথিবীতে বেঁচে আছে সেই প্রাণীটির বিলুপ্তি আজ মানুষের কারনে সময়ের ব্যাপার মাত্র। এই ঘটনাই বলে দেয় আফ্রিকাসহ সারা বিশ্বেই কতখানি বিপন্ন আজ বন্যপ্রাণীরা।

শুধু শ্বেত জলহস্তীই নয়, বন্যপ্রাণী শিকারের অবৈধ ব্যবসার কবলে পড়ে হুমকির মুখে রয়েছে বিশ্বের অবশিষ্ট ২৮ হাজার পাঁচশ জলহস্তী। মাদক , অস্ত্র ও মানবপাচারের মতো ভয়ংকর অপরাধ চক্রের সাথে এখন যোগ দিয়েছে বন্যপ্রাণী শিকারকারীরা। এক হিসাবে বছরে এই ব্যবসার পরিমাণ এখন ১২ বিলিয়ন ডলার। আর বন্যপ্রাণী হত্যার এই মহোৎসবে ‘গ্রাউন্ড জিরো’ হচ্ছে আফ্রিকা মহাদেশ। সাম্প্রতিককালে স্বচ্ছলতার মুখ দেখা এশিয়ান দেশগুলোয় জলহস্তীর শিং ও হাতির দাঁতের ব্যাপক চাহিদার প্রেক্ষিতে এই প্রাণীদের বিপুল সংখ্যায় হত্যা করা হচ্ছে। এভাবে নির্বিচারে বন্যপ্রাণীদের নির্মুলে শংকিত মহাদেশটির প্রাণী সংরক্ষণবিদেরা।

Advertisement

সংকট থেকে উত্তরণে কর্মপন্থা নির্ধারণে আলোচনায় ও বিতর্কে অংশ নিতে এই সপ্তাহে বতসোয়ানার কাসানিতে এক সামিটে বসছেন পরিবেশবাদীরা ও রাজনীতিবিদরা। গতবছর যুক্তরাজ্য সরকার ও প্রিন্স চার্লস ও উইলিয়াম হ্যারির আয়োজনে লন্ডনের বহুল প্রচারিত কনফারেন্সের ফলো-আপ হিসেবে আয়োজন এই বতসোয়ানা সামিটের। লন্ডন কনফারেন্সে দুর্নীতিরোধ, শিকারীদের কঠোরতর শাস্তি দেবার জন্য আইন তৈরী ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর সদস্য নিয়োগের আশ্বাস দিয়ে ‘লন্ডন ঘোষণা’-য় স্বাক্ষর করে ৪৬টি দেশ। স্বাক্ষরের সময় ব্রিটেনের তৎকালীন পররাষ্ট্র মন্ত্রী উইলিয়াম হেগ মন্তব্য করেছিলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, আজ আমরা পরিবর্তনের সূচনা করলাম।’

প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়নে এই এক বছরে নেয়া পদক্ষেপের চুলচেরা বিশ্লেষণ যখন কাসানি সামিটে হবে, নি:সন্দেহে বলা যায় অনেক বিষয়েই অগ্রগতির মাত্রা সন্তোষজনক নয়। চিকিৎসার জন্য  অথবা সম্পদশালী ব্যক্তিদের বিত্তের চিহ্ন হিসেবে চীন ও ভিয়েতনামে হাতির দাঁতের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এই প্রবণতা বন্ধ করতে দেশ দুটির বিশিষ্ট মানুষদেরকে নিয়ে অনেক প্রচারণা সত্বেও গত বছর দক্ষিণ আফ্রিকায় রেকর্ড এক হাজার দুইশ পনেরটি জলহস্তীকে হত্যা করা হয়েছে, ২০১৩ সালের চাইতে যার পরিমাণ ২০ শতাংশ বেশী। গ্রেট এপস সারভাইভাল পার্টনারশিপ এর এক হিসেবে আফ্রিকার জঙ্গল থেকে গত ১৪ মাসে কমপক্ষে ২২০টি শিম্পাঞ্জি, ৩৩টি বোনোবস এবং ১৫টি গরিলা হারিয়ে গেছে। জাতিসংঘের এক হিসাবমতে, ২০১১ থেকে ২০১৩ সালে প্রতিবছর গড়ে ২০০০০ হাতি হত্যার শিকার হয়েছে, যদিও শিকারীদের দমনে বেশ কিছু ক্ষেত্রে সাফল্য দেখিয়েছে কেনিয়া, তাঞ্জানিয়া এবং উগান্ডার মতো দেশগুলো।   

তবে নানা ত্রুটি-বিচ্যূতি সত্বেও, বন্যপ্রাণী নিয়ে ব্যবসার বিষয়টি নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক এজেন্ডার বিষযবস্তুতে পরিণত করার   জন্য লন্ডন কনফারেন্সের ভূমিকা প্রশংসনীয়। ২০১৪ সালে প্রথমবারের মতো বিদেশের তুলনায় আফ্রিকার মাটিতে বেশী বন্যপ্রাণীর চালান ধরা পড়ে। প্রিন্স উইলিয়াম একটি টাস্কফোর্স গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন যারা বিভিন্ন এয়ারলাইন্স ও শিপিং কোম্পানির সাথে যৌথভাবে কাজ করবে যেন বন্যপ্রাণীদের অবৈধ চালান বন্ধ করা যায়।

আফ্রিকার তথা বিশ্বের সমস্ত জঙ্গলের বন্যপ্রাণীদের রক্ষা করা না গেলে  পরিবেশ ভারসাম্য নষ্টের পাশাপাশি যে বিপর্যয়ের মুখে পৃথিবী পড়বে, সেটা যত দ্রুত আমরা অনুধাবন  করতে পারব এবং এই বিপর্যয় রোধে উদ্যোগী হব, ততখানিই আমাদের জন্য মঙ্গল। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে আমাদের ভূমিকা ও প্রতিশ্রুতি সার্বজনীন ও ন্যায়নিষ্ঠ হবে, এটাই বতসোয়ানা সামিটের কাছে প্রত্যাশা।