চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বঙ্গবন্ধু প্রয়াত হয়েও অনেক বেশী ক্ষমতাধর

পৃথিবীতে সর্বকালে এমন সব ব্যক্তিরা জন্মগ্রহণ করেছেন, যারা শুধুমাত্র জনমানবের মুক্তির লক্ষ্যে নিজের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যটুকু বিলিয়ে দিয়েছেন হাসিমুখে। ঐসব ব্যক্তিরা কখনও নিজেদের ভবিষ্যতের কথা ভাবেননি। তারা ভেবেছেন সমাজের সর্বস্তরের নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষের কথা। সাধারণ মানুষের কথা ভাবতে গিয়ে সমাজের নির্লোভ মানুষেরা সকল সময় নির্যাতিত হয়েছেন, নষ্ট মানুষের হাতে। তারপরও নষ্ট মানুষেরা সমাজের প্রগতির চাকাকে কখনও পশ্চাৎমুখী করতে পারেনি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তেমনি এক নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষের নেতা। যিনি সমাজের দুঃখি মানুষের মুখে হাসি ফুটাতে গিয়ে হাসিমুখে কারাবরণ করেছেন। বঙ্গবন্ধুর সাহসের ফসল হলো আজকের বাংলাদেশ।

এরকম একজন সাহসী মানুষ এই জনপদে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বলেই আজ আমরা একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হতে পেরেছি। আজকে যারা রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বড় বড় দায়িত্বশীল পদে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন কিংবা ব্যবসা করে বড় ব্যবসায়ী হয়েছেন কিংবা রাজনীতি করে মন্ত্রী হয়েছেন, তারা তা হতে পেরেছেন শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধু এদেশের মানুষকে নিয়ে একটি সুন্দর স্বপ্ন দেখেছিলেন বলে। হৃদপিণ্ড ছাড়া যেমন একটা দেহের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না, ঠিক তেমনি বঙ্গবন্ধুকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস সৃষ্টি হতে পারে না। যে যে-কথাই বলুক না কেন বঙ্গবন্ধু এদেশের মানুষকে ভালোবেসে ছিলেন বলেই বাঙালি একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বসবাস করে তার প্রতিদিনের স্বাপ্নিক দিনগুলো যাপন করতে পারছে। সমুদ্র যেমন জড়বস্তুকে তার বুকে স্থান দেয় না, ঠিক তেমনি করে ইতিহাস কখনো মিথ্যাচারকে তার আশ্রয়ে বড় হতে দেয় না। দেশ স্বাধীন হয়েছে আজ প্রায় ৪৯ বছর অতিবাহিত হয়ে যাচ্ছে। অথচ একশ্রেণীর লোক (যারা একাত্তরে আমাদের বিরুদ্ধাচরণ করেছিল) আজ দিবাস্বপ্ন দেখে বঙ্গবন্ধুকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে। নিবোর্ধরা নির্বোধের মতোই কাজ করে। তারা নির্বোধ বলেই মিথ্যার স্বর্গ রচনা করে বসবাস করতে চায়।

বিজ্ঞাপন

আমাদের দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যখন বঙ্গবন্ধু ফিরে এলেন তখন অনেকেই ভেবেছিলেন পাকিস্তানিরা বঙ্গবন্ধুকে কখনও জীবিত ফেরত দেবে না। তারা পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে আমাদের মহান নেতাকে মেরে ফেলবে। কিন্তু পাকিস্তানিরা বিশ্বজনমতের চাপে বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলার সাহস দেখাতে পারেনি। অথচ পাকিস্তানিরা যেখানে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার সাহস পায়নি, সেখানে এদেশে কিছু জঘন্য মানুষ রাতের আঁধারে বঙ্গবন্ধুকে তার পরিবারসহ হত্যা করেছে শুধুমাত্র আমাদের দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য। তারা জানত এদেশের খেটে খাওয়া মানুষ বঙ্গবন্ধুকে বাদ দিয়ে কোন কিছু চিন্তা করে না। তাই তার বিরুদ্ধে কখনও জনমত সৃষ্টি করা যাবে না। একজন নেতার বিরুদ্ধে তখনই জনমত সৃষ্টি করা যায় না, যখন সেই নেতাকে একটি দেশের আবালবৃদ্ধবনিতা মন, প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে ৭১’র পরাজিত প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে আমাদের যুদ্ধ জয়ের অর্জনকে ধ্বংস করার অভিপ্রায়ে উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল। ইতিহাস স্বাক্ষী দেয় সত্যকে একটা সাময়িক সময় পর্যন্ত বাধাগ্রস্ত করা যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সত্য আপন মহিমায় আপন শক্তি নিয়ে মানুষের চোখে ধরা দেয়। পাকিস্তানের ২৪ বছরের শোষণের কথা এদেশের মানুষ ভুলে যাবে তা কেবল বোকারাই ভাবতে পারে। একাত্তরে যেভাবে এদেশের মানুষকে পাকিস্তানিরা হত্যা করেছিল, মানুষের ঘরবাড়ি পুড়িয়েছিল, শিশুদের নির্যাতন করেছিল, নারীদের উপর অত্যাচার নিপীড়নের স্টিমরোলার চালিয়েছিল তা হৃদয়বান বাঙালিরা কখনও ভুলে যেতে পারে না। অথচ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর এমন একটা ভাবধারা সৃষ্টি করা হয়েছিল যেন দেশটা আবার পুরনো ধারায় চলে যাবে। যারা দেশকে স্বাধীন করার জন্য নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল তাদের উপর অনেক ক্ষেত্রে শুরু হয়েছিল অত্যাচার নিপীড়ন। ক্ষমতার জোরে তখন বঙ্গবন্ধুকে সর্বক্ষেত্রে বাদ দিয়ে চলার একটা প্রবণতা সৃষ্টি করা হয়েছিল। সেই প্রবণতায় বিভ্রান্ত হয়ে অনেকেই সেদিন বিভ্রান্ত হয়েছিলেন। যারা বিভ্রান্ত হয়েছিলেন, সেই শ্রেণির লোকেরা বিভ্রান্ত হয়েছিলেন লোভের তাড়নায় কিংবা নিজেদেরকে বাঁকা পথে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে। এখানে আরেকটি কথা বলে রাখা প্রয়োজন, যারা ৭৫ এর পটপরিবর্তনের পর স্বজ্ঞানে বিভ্রান্ত হয়েছিলেন কিংবা স্বপক্ষ পরিবর্তন করেছিলেন তাদের মধ্যে সবাই কিন্তু আমাদের মহাকাব্যিক, মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধবাদী দলের মানুষ ছিলেন না। তাদের মধ্যে এমন লোকজনও ছিলেন যারা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে দেশমাতৃকার জন্য মরনপণ লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করেছিলেন। অনেকেই বলে থাকেন আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধও যদি নয়মাসে শেষ না হয়ে, নয় বৎসরে শেষ হতো তাহলে এই শ্রেণির বিভ্রান্ত লোকেরা মুক্তিযুদ্ধের মাঠ ত্যাগ করে তখনই স্বপক্ষ পরিবর্তন করে দেশমাতার বিরুদ্ধবাদীদের দলে চলে যেত। তাদের অর্থাৎ এই শ্রেণির লোকদের ভাগ্য ভালো আমাদের দেশ নয়মাসে স্বাধীন হয়েছিল, তা’না হলে আজ তারা নিজেদেরকে মুক্তিযোদ্ধা কিংবা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক বলে দাবী করতে পারতো না।

বিজ্ঞাপন

একটা জাতি সামনের দিকে অগ্রসর হয় তার মূল্যবোধের উপর ভর করে। আমরা এ অঞ্চলের বাঙালির ইতিহাসকে যদি নড়াচড়া করি, দেখব এ দেশের মানুষ কখনই মিথ্যাচার কিংবা অন্যায় কর্মকাণ্ডকে কখনও অবলীলায় গ্রহণ করেনি। যখনি ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা কিংবা ক্ষমতাধর গোষ্ঠীরা এদেশের সহজ-সরল মানুষের উপর অন্যায়ভাবে কিছু করতে চেয়েছে, তখনি এদেশের মানুষেরা অন্যায়কারীদের বিরুদ্ধে তাদের ন্যায্য দাবী নিয়ে গর্জে উঠেছে। তাদের সেই সাহসের ফসলই হলো আজকের বাংলাদেশ। এদেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল শান্তিতে থাকবে বলে। দেখা যায় মানুষের মধ্যে যে একটি বন্ধন একাত্তরে সৃষ্টি হয়েছিল, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে সেই বন্ধনকে ভাঙ্গার জন্য প্রতিক্রীয়াশীল গোষ্ঠী সক্রিয়ভাবে মিথ্যাচারকে আশ্রয় করে মাঠ গরম করেছে। যে মানুষ একাত্তরে স্বপ্ন দেখেছিল স্বাধীন দেশের কিংবা স্বাধীন সত্তার, সে কখনো বিভ্রান্ত হয়নি। জেনে শুনে বিভ্রান্ত হয়েছে তারাই, যারা ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধকে ভালো চোখে দেখেনি।

প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী জীবিত বঙ্গবন্ধুর চেয়ে প্রয়াত বঙ্গবন্ধুকে বেশি করে ভয় পায়। তারা যখন দেখে বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা করার পরও এবং মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত অর্জনকে ধ্বংস করার অপপ্রয়াস করেও মানুষের মন থেকে ৭১’র চেতনাকে মুছে ফেলা সম্ভব হচ্ছে না, তখনই প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী বুঝে নেয় জীবিত বঙ্গবন্ধুর চেয়ে প্রয়াত বঙ্গবন্ধু অনেক বেশী ক্ষমতাধর। হত্যাকারীরা কখনও ভাবতে পারেনি কিংবা বঙ্গবন্ধুকে পরিবারসহ মেরে ফেলার পর যারা ৭৫’এ আনন্দিত হয়েছিলেন তারাও কখনও চিন্তা করেনি ৭৫’র হত্যাকাণ্ডের খুনিরা ফাঁসিতে ঝুলবে। মূল কথা হচ্ছে বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন বলেই আমাদের এই দেশমাতৃকাকে আমরা স্বাধীন করতে পেরেছিলাম অর্থাৎ পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ হয়েছিল বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার স্বপ্ন এদেশের মানুষের মধ্যে চরম বিশ্বাসে এঁকেছিলেন বলেই। এই জনপদে অনেক নেতার জন্ম হয়েছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ছাড়া আর কেউ এতোটা দীপ্ত সাহস নিয়ে দেশের মানুষকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখাবার সাহস করেননি। মনে হয় এ কথার সাথে কেউ দ্বিমত পোষণ করবেন না। যারা বঙ্গবন্ধুর এই অবদান স্বীকার করেন না, তারা তা ইচ্ছে করেই স্বীকার করেন না। তবে এ কথা ঠিক কেউ স্বীকার করুক বা না করুক সত্য সকল সময় ভোরের আলোর মতই সকল সময় সত্যের বার্তা নিয়ে উদ্ভাসিত হয়। ঠিক তেমনি বিরুদ্ধবাদীরা কিংবা যাদের বঙ্গবন্ধুর এই অবদানের জন্য গাত্রদাহ হয়, তারা যতই বঙ্গবন্ধুর ত্যাগকে অস্বীকার করুক না কেন, ইতিহাস কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে ঠিক জায়গায়ই বসাবে। এটা কারো মানা কিংবা না মানা কিংবা স্বীকার করা কিংবা অস্বীকার করার ওপর নির্ভর করবে না।

তাই আবারও বলছিলাম আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়া। তবে আমাদের দুর্ভাগ্য হলো আমরা কখনও ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেই না।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)