আগেকার দিনে রাজকবি প্রচলিত ছিল। এসব কবিরা রাজার স্তুতি গাইতো আর রাজকোষ হতে মাসোহারা নিতো। আধুনিক যুগে তার ধরণ বদলেছে। কবি, লেখক, বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষকরা কেউ সরকারপন্থী, কেউ সরকার বিরোধীপন্থী। সরকারপন্থীরা সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থাকে ও সরকারি বেতন ভাতা ও বাড়িগাড়ির সুবিধা ভোগ করে থাকে। যেমন বাংলা একাডেমি, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, শিল্পকলা একাডেমি, বিটিভি ও জাতীয় প্রেসক্লাবসহ আরও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান।
সরকার বদলের সাথে সাথে এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, কর্মচারীদেরও পরিবর্তন ঘটে। পরিবর্তন হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও। এখানে আওয়ামী লীগের আমলে আওয়ামী সমর্থক ভিসি ও বিএনপির আমলে বিএনপি সমর্থক ভিসি থাকে। শিক্ষকরা সরকারপন্থী ও সরকার বিরোধীপন্থী হিসেবে প্রকাশ্যে নির্বাচনী যুদ্ধেও জড়িয়ে পড়ে। সরকার বিরোধী অবস্থানে থেকে যারা যত বেশি দমনপীড়ন ও নির্যাতনের শিকার হয় তাদের তত বেশি সুদিন অপেক্ষমান থাকে। প্রতিষ্ঠার ভিত পোক্ত করতে হলে নিজেকে আগে আলোচনা ও সমালোচনার পাত্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
ফরহাদ মজহার হয়তো সেই তত্ত্বেই চটকদার লেখালেখি ও বক্তৃতা বিবৃতি দিয়ে যাচ্ছেন। একসময় তিনি বামরাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। আর এখন তিনি নিজেকে পুরোপুরি উল্টিয়ে দিয়েছেন। জামায়াত, হেফাজত ও মানবতার শত্রু রাজাকার, আলবদর ও উগ্র জঙ্গি গোষ্ঠীর পক্ষেও তিনি সাফাই গেয়ে থাকেন। অতি বাম অতি তাড়াতাড়ি অতি ডান হয়ে যায়। ফরহাদ মজহার এই কথাটির জ্বলন্ত উদাহরণ। চরমপন্থী বাম হতে এখন তিনি চরমপন্থী ডানে মোড় নিয়েছেন। তার লেখনী পাঠকদের বিপথগামী করতেও সহায়ক বটে। তবু তাকে গুম করে ফেলা কোন বিবেকবান মানুষেরই সমর্থন করা সম্ভব নয়। এর আগে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী ও সালাউদ্দীনের নিখোঁজ হয়ে যাওয়া দেখেছি। ইলিয়াস আলী বেঁচে আছেন না মরে গেছেন তার কোন খবর নেই। তবে সালাউদ্দীন আছেন বলে শোনা যায়।
ফরহাদ মজহার নিখোঁজ হওয়ার সংবাদ মিডিয়ায় ও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর হয়। যশোর থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। তিনি একটি যাত্রীবাহী বাসে ঘুমাচ্ছিলেন। তাকে কী অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে? যশোরে কীভাবে গেলেন? কারা কীভাবে তাকে নিল? নাকি তিনি নিজ হতেই গেছেন? এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর প্রকাশ দরকার।
পুলিশ বলছে, এটা ছিল ফরহাদ মজহারের স্বাভাবিক ভ্রমণ। বিএনপি বলছে, সরকারই হচ্ছে ফরহাদ মজহার নাটকের প্রযোজক ও পরিচালক। আওয়ামী লীগ বলছে, তদন্তের আগে কিছু বলা ঠিক নয়। ফরহাদ মজহার বলছেন, তিনি ওষুূধ কিনতে যেয়ে অপহৃত হন।
কিন্তু এক্ষেত্রে প্রশ্ন, এতো ভোরবেলায় কি ওষুধের দোকান খোলা থাকে? ফরহাদ মজহার ইস্যু দেশ জুড়ে আলোচিত। মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়া সূত্রে তা ছড়িয়ে গেছে দেশের বাইরেও। এর প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে সরকারেরও তেমন কোন তৎপরতা নেই। নইলে নিজের জিম্মায় নিজেই এত দ্রুত মুক্তি পেলো কী করে? একজন কবি, কলামিস্ট কেন অপপ্রচার ছড়াবেন? সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই লিখেছেন যে ফরহাদ মজহার উদ্দেশ্য ছাড়া কিছুই করেন না। এক্ষেত্রে কী ছিল তার উদ্দেশ্য?
ফরহাদ মজহার একজন সাবেক স্বঘোষিত নাস্তিক, বর্তমানে ধর্মান্ধ উগ্র আস্তিক ও সাম্প্রদায়িক শক্তির কট্টর অনুসারী। তবে তিনি আস্তিক হয়েছেন কিনা তা তিনি ও স্রষ্টা জানেন। ফরহাদ মজহার বিএনপির থিঙ্কট্যাংক, হেফাজতের তাত্ত্বিক উপদেষ্টা। পেট্রোল বোমা মেরে মানুষ হত্যার সাফাই গাইতে গিয়ে তিনি বলেছেন, বোমা হামলাকারীরা যদি সন্ত্রাসী হয় তাহলে মুক্তিযোদ্ধারাও সন্ত্রাসী। সরকার হেফাজতের সাথে ভোটের জন্য আপোষকামিতা প্রদর্শন করেছেন আর ফরহাদ মজহারতো হেফাজতের তাত্ত্বিক উপদেষ্টা। সুতরাং এ সরকারেও তার ভয় কী? তাকে হয়রানি করলে হেফাজত তেড়ে আসবে এই ভয়েই কি সহজ শর্তে ছেড়ে দেয়া হলো?
রাজাকার ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা গণজাগরণের বিপরীতে হেফাজতকে দাঁড় করানোয় অগ্রগণ্য ভূমিকা ছিল ফরহাদ মজহারের। ভোটের ও কৌশলের রাজনীতি নীতিবোধের আর কোন অবশিষ্ট রাখছেনা। ফরহাদ মজহার হয়তো স্বপ্ন দেখছেন বিএনপি জামায়াত জোট ক্ষমতায় যাবে আর তিনি হবেন সরকারের নীতিনির্ধারক। হয়তো তিনি একটি প্রতিষ্ঠানের বড়কর্তা হয়ে বাড়িগাড়ি হাঁকাবেন। কবি, লেখক ও কলামিস্টরা লেখনীর মাধ্যমেই তাদের অবস্থান পরিষ্কার করে থাকেন। তাদের আকাঙ্ক্ষাও থাকে এমনটিই। তিনি যে রাজনীতির পক্ষে লিখছেন সে রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হতে শুরু করে তা সংশ্লিষ্ট সকলেই তা জানুক।
আজকাল পুরস্কার পেতেও লবিং করা হয়। অনেকেই চেয়েও নেয়। বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, জাতীয় প্রেসক্লাব ও বিটিভির মহাপরিচালক নিয়োগ পেতে দেখা যায় কতজনের কত লবিং। লবিংয়ে যারা এগিয়ে যেতে পারে তারাই পদাসীন হয়। সরকারকে তারা বুঝাতে চেষ্টা করে বিরোধীপক্ষে থাকার সময় নির্যাতন, হয়রানির স্মৃতিচারণ।
মূলত চেনাজানা, পরিচিতি ও দৃষ্টি আকর্ষণের কাজটা বিরোধীপক্ষে থাকার সময় সেরে নিলে তা সহজ হয়। ফরহাদ মজহার হয়তো সে কাজটিই সেরে নিচ্ছেন। তার পছন্দের দল প্রেসব্রিফিংয়ে ফরহাদ মজহার ইস্যু তুলে ধরছে। সরকারপক্ষও ফরহাদ মজহারকে নিয়ে কথা বলছে। সুতরাং বুদ্ধিজীবীর বুদ্ধি প্রয়োগ সফল হয়েছে। সরকার বদলের সাথে সাথে ফরহাদ মজহারের ও তার সাঙ্গপাঙ্গদেরও যে বদল হবে সেটা নিশ্চিত। তবে জটিল প্রশ্ন হলো দেশের কী হবে?
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








