চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

প্রিপারেটরির বাতাসে যতো গুজব

অনেকেরই মনে থাকার কথা পিলখানা ট্র্যাজেডির পর ঢাকা সেনানিবাসে সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে দরবারে যোগ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার কিছু অডিও ক্লিপ পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো হয়েছিলো। সেখানে কয়েকজন কর্মকর্তা মহা আজগুবি কিছু বিষয়-আশয় নিয়ে এসেছিলেন যা বাস্তবতার ধারেকাছেও ছিলো না।

ওই দরবারে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা দেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তা যে অপেশাদার ভাষায় কথা বলেছিলেন সেটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য ছিলো না। হয়তো সহকর্মী-বন্ধুদের হারিয়ে আবেগতাড়িত ছিলেন তারা। কিন্তু তাদের ভাষার প্রকাশের চেয়েও বেশি উদ্বেগের ছিলো তাদের কথার বিষয়বস্তু।

যে গুজবে সাধারণ মানুষ চায়ের আড্ডায় ঝড় তুলে, ওইরকম গুজব সামরিক কোনো কর্মকর্তা যখন প্রধানমন্ত্রীর সামনে অভিযোগের সুরে তুলে ধরেন, তখন সচেতন মানুষের উদ্বিগ্ন হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে সাধারণ মানুষও গুজবের পেছনে ছুটলে পরিণতি যে কতো খারাপ হতে পারে সেটা আবারও বোঝা গেছে মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুল এন্ড কলেজের ঘটনায়।

ওই স্কুলের এক শিক্ষার্থীর দু’ অভিভাবকের একজন হিসেবে মাসের শুরুর দিকে জানতে পারি ইংলিশ ভার্সনের এক শিক্ষার্থী টয়লেটে গিয়ে একজন পুরুষ পরিচ্ছন্নতা কর্মী দ্বারা যৌন হয়রানির শিকার হতে যাচ্ছিলো। তার চিৎকারে সহপাঠীরা এগিয়ে আসে। তখন সবাই মিলে চিৎকার করলে একজন শিক্ষক সেখানে আসেন। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের সামনে ওই পরিচ্ছন্নতা কর্মীকে দেখিয়ে দেয়।

এরকম ঘটনা শুনে একজন অভিভাবক হিসেবে স্বভাবত:ই বিপন্ন বোধ করি। স্কুল কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বললেও মেয়েদের একটি স্কুলে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কেনো পুরুষরা থাকবে অন্য অভিভাবকদের মতো আমাদের মনেও সেই প্রশ্ন জাগে।

কয়েকদিন চলে গেলেও স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে শাস্তিমূলক কোনো ব্যবস্থার কথা না জেনে বিপন্নতাবোধ আরো বাড়ে। তবে এ ভেবে কিছুটা সাহস পাই যে বিক্ষুব্ধ অভিভাবকরা বুধবার (১৩ মে) সমাবেশ ডেকেছেন।

কিন্তু এর মধ্যেই গুজবের ডালপালা ছড়াতে থাকে। এক অভিভাবক ফোন করে বলেন, প্রথম শ্রেণীর এক ছাত্রী এক মাস ধরে ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। কয়েকজন এমনকি এটাও জানান যে স্কুল কম্পাউন্ডে ধর্ষণের শিকার এক ছাত্রী হাসপাতালে মারা গেছে। কিছু অভিভাবকের কথায় মনে হয়, স্কুলটি যৌন নিপীড়নের এক উন্মুক্ত কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে যেখানে পাঠদান বলে কিছু নেই।

স্বভাবত:ই যাচাই করে টয়লেটে এক ছাত্রীর যৌন নিপীড়নের শিকার হতে যাওয়ার ঘটনাটি ছাড়া অন্য কোনো তথ্য/গুজবের সত্যতা পাওয়া যায়নি। যে মেয়েটি মারা গেছে বলে প্রচার হয়, তার বিষয়ে খোঁজ-খবর করে জানতে পারি, মৃত্যুর একটি ঘটনা ঘটেছে কয়েক বছর আগে। তবে দু:খজনক ওই ঘটনাটির সঙ্গে যৌন নিপীড়নের কোনো সম্পর্ক ছিলো না। মেয়েটি অসুস্থ ছিলো। স্কুলে আসার পর মারা যায়। ওই মেয়েটির মা এখনও স্কুল কম্পাউন্ডে এসে চিরতরে হারিয়ে যাওয়া মেয়েকে খোঁজ করে।

বিজ্ঞাপন

বিষয়টি যে অনেকে জানেন না এমন নয়। কিন্তু সন্তানের নিরাপত্তার কথা ভেবে উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা সত্য-মিথ্যা বাতাসে ভেসে বেড়ানো সব কথাকেই সত্য মনে করে। এর সঙ্গে স্কুল কর্তৃপক্ষ বেকুবের মতো ব্যবস্থা গ্রহণে দেরি করায় গুজবের ডালপালার সঙ্গে ক্ষোভও বাড়তে থাকে।

বিক্ষুব্ধ অভিভাবকরা ১৩ মে স্কুলের অধ্যক্ষ এবং উপাধ্যক্ষর সঙ্গে দেখা করলে তারা এমনভাবে কথা বলেন যাতে ক্ষোভ আরো বেড়ে যায়। এর সঙ্গে যোগ হয় নতুন গুজব। নারী উপাধ্যক্ষ নাকি তাদের বলেছেন, ফুল থাকলে ভোমরা আসবেই।

এমন কথার সত্যতা না থাকলেও ওই কথার প্রচারে অভিভাবকরা দাবানলের আগুনের মতো জ্বলতে থাকেন। সঙ্গে ফেসবুকে অতি উৎসাহী কিছু অ্যাক্টিভিস্ট কোনো খোঁজ-খবর ছাড়াই এমন সব পোস্ট দিতে থাকেন যাকে গণমাধ্যমের মর্যাদা দিয়ে অভিভাবকরা ওইসব কথাকে আরো বেশি সত্য বলে মনে করতে থাকেন।

কিছু অভিভাবক নিপীড়ক হিসেবে সংখ্যালঘু পরিচয়ের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়ে ফোনে ফোনে এক ধরণের সাম্প্রদায়িক প্রচারণাও চালাতে থাকেন।

এসবের অনিবার্য পরিণতি হিসেবে শনিবারের সেই ঘটনা। ক্ষোভের আগুনে জ্বলতে থাকা কিছু অভিভাবক এদিন শুধু তাদের সন্তানদের সামনে সন্তানদের স্কুলে ভাঙচুরই চালাননি, শিক্ষকদেরও মারধোর করেন। রাস্তায় সন্তানের হাতে ‘রেসপেক্ট উইমেন’ প্ল্যাকার্ড ধরিয়ে দিয়ে ভেতরে গিয়ে স্কুলটির জ্যেষ্ঠতম নারী শিক্ষককে শারীরিকভাবে হেনস্তা করেন।

তবে একথা ঠিক শুরু থেকেই প্রিপারেটরি স্কুল কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে শুধু স্কুল ব্যবস্থাপনার নিজস্ব বিষয় মনে না করে এখন যেসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেগুলো প্রথমেই নিলে এতো গুজব ছড়াতো না। এতোকিছু ঘটতোও না। এক্ষেত্রে তাদের আরেক সমস্যা ছিলো উপযুক্ত ভাষায় অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ। যে বিষয়টি ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হিসেবে বুয়েট অধ্যাপক ম. তামিম সমাধান করতে পেরেছেন, সেটা শুরুতেই স্কুল অধ্যক্ষ এবং উপাধ্যক্ষর করতে পারা উচিত ছিলো। কিন্তু উপযুক্ত যোগাযোগের সেই পাঠ কি তারা তাদের দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে পেয়েছেন? আর না পেয়ে থাকলেও তাদের অভিজ্ঞতা থেকেই তো এটা অর্জনের কথা ছিলো।

তারপরও শিক্ষকের গায়ে হাত তোলা অভিভাবকরা কিরকম মানুষ! সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে সকল অভিভাবক উদ্বিগ্ন থাকবেন এটাই স্বাভাবিক। তবে সন্তানের সামনে যখন তার শিক্ষককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয় তখন কোন শিক্ষা পায় সন্তান!

শেষ পর্যন্ত তবু সন্তানরাই কিন্তু ভরসার জায়গায় রেখেছেন আমাদের। জ্যেষ্ঠতম নারী শিক্ষকের গায়ে হাত তোলার পর কিছু অভিভাবক যখন আরো বেশি কিছু করতে না পারার কারণে তর্জন-গর্জন করছিলেন, তখন কলেজ শাখার এক ছাত্রী চোখে জল রেখেই প্রতিবাদী কণ্ঠে বলছিলো: আমাদের শিক্ষকদের গায়ে হাত তোলা এই আপনারা কোন মানুষ! আমাদের শিক্ষকদের এ অবমাননা আমরা মানতে পারছি না।

জাহিদ নেওয়াজ খান: এডিটর, চ্যানেল আই অনলাইন।

বিজ্ঞাপন