চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

প্রাণের সখা আহমাদ মাযহার

সবচেয়ে কঠিন হচ্ছে আহমাদ মাযহারকে নিয়ে কিছু লেখা। কিছুতেই এই লেখাটা গুছিয়ে তোলা যাইনি। ’৭৯ সাল থেকে বন্ধুত্ব। একদিনের জন্যও ছেদ পড়েনি। প্রায় চল্লিশ বছর। মাযহারই আমার একমাত্র সাহিত্যিক বন্ধু। পারিবারিক বন্ধু।

আমার সাহিত্য বিষয়ের ভাবনা চিন্তা ও আমার নিরীক্ষাধর্মী লেখার উৎসাহী পাঠক হচ্ছে মাযহার। আমার ক্ষ্যাপাটে ও উদ্ভট আচরণ সবচেয়ে বেশি সহ্য করেছে মাযহার। আমার নানা কীর্তি কাহিনীর বিভিন্ন স্থানে মাযহার বহুবার অপদস্থ হয়েছে। হজম করেছে সেসব। লোকে আমাকে না পেয়ে আমার গালাগাল মাযহারকে শুনিয়েছে। মাযহার তার অপরিসীম ধৈর্য শক্তির পরিচয় দিয়ে গালি শুনেছে। আমার বহু অক্ষমতার দায় মাযহার পালন করেছে। অনেক বই আমি আর মাযহার ভাগাভাগি করে পড়েছি।

বিজ্ঞাপন

মাযহার বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এমএ করেছে। মাযহার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রথম দিককার পাঠাগার স্থাপন করেছে। মাযহার সামান্য বেতনে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে চাকরি করেছে। চাকরি নয়, সায়ীদ স্যারের সাহচার্যের জন্যে লেগে থেকেছে। সায়ীদ স্যারের চরম দীক্ষাগুরু মাযহার। মাযহার সাহিত্যের রস আস্বাদন করেছে সায়ীদ স্যারের হাত ধরে। ক্লাসে ছন্দ শিখেছে সায়ীদ স্যারের কাছে। আমরাও সায়ীদ স্যারের সান্নিধ্যে সহজেই পৌঁছেছি মাযহারের কারণে।

মাযহারের শুরু হলো শিশুসাহিত্যের হাতেখড়ি দিয়ে। কিশোর বাংলায় মাযহার অনেক লিখতো। পরে বাংলা অনার্স পড়া শুরু করেও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের অনেক পাঠকচক্রে অংশ নিয়ে ভারি ভারি প্রবন্ধ লেখা শুরু। মাযহারের চিন্তার জগৎ পরিবর্তিত হতে লাগলো। যে কোন বিষয়কে সাহিত্য ও দর্শণের আলোকে বিচার করার সহজাত ক্ষমতা তার তৈরি হলো। তবে আনন্দের কথা শিশুসাহিত্যের সংশ্রব মাযহার ত্যাগ করেনি।

শিশুসাহিত্য বিষয়ে দুই বাংলায় মাযহারই সবচেয়ে বেশি প্রবন্ধ লিখেছে। এর মূল্য মাযহারের অবশ্যই প্রাপ্য। ওপার বাংলাতেও প্রাবন্ধিক হিসেবে মাযহার ব্যাপক প্রশংসিত।

মাযহার দুর্দান্ত নিষ্ঠাবান। একটা কাজ শুরু করলে সে কঠিন কামড় দিয়ে কাজটা শেষ করবে।

মাযহারের বন্ধু ও সহধর্মিনী শিরীন বকুল। নিজেও লেখক। এবং বিখ্যাত নাট্যশিল্পী। বকুলকে নিয়ে আলাদা লিখতে হবে। তবে প্রসঙ্গক্রমে বলি- বকুল মাযহারের ছায়াসঙ্গী। মাযহারকে আগলে রেখে সংসার যাত্রার দীর্ঘপথ সে পাড়ি দিয়েছে। তাদের একমাত্র সন্তান সুদীপ্ত প্রিয়দর্শন। আমি, অমি, আমরা সবাই এক পরিবারের সদস্য। দেশ বিদেশে কত ঘুরেছি! প্রিয় বলে থাকেন- তার সবচেয়ে প্রিয় মামা হচ্ছে আমীরুল ইসলাম। প্রিয় এখন আমেরিকাতে লেখাপড়া করে। বছরে একবার আমেরিকা যাই। অমির সাথে প্রিয় তখন আমরা নিত্যসঙ্গী। বকুলও বাংলায় দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছে। বাংলা ভাষা-সাহিত্যে এমএ। বকুল খুব মেধাবী। রুচিবান ও উন্নত সাংস্কৃতিক বলয় থেকে ওর আগমন। বকুলের কাছ থেকেও আমরা অনেক সমৃদ্ধ হয়েছি। অনেক শিখেছি।

যাহোক মাযহারের কথা লিখছিলাম। মাযহার সাহিত্যের পেছনে নিরন্তর শ্রম দিয়ে আজ উচ্চ আসনে পৌঁছে গেছে। বাংলা সাহিত্যের গত একশো বছরের যে তথ্য উপাত্ত মাযহারের কাছে সুসংরক্ষিত। শুধু বই নয়- বিগত শতাব্দীর পত্রিকাসমূহ সম্পর্কেও মাযহারের ব্যাপক আগ্রহ। ঢাকা, কলকাতা ঘুরে ঘুরে, লাইব্রেরি বা কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাত ব্যবহার করে ব্যাপক সমৃদ্ধ হয়েছে।

মাযহারের আগ্রহ শিশুসাহিত্য ও বাংলা ভাষায় লিখিত যে কোন প্রবন্ধ বা প্রাবন্ধিক। নিরন্তর অধ্যয়ন মাযহারকে রবীন্দ্র বা নজরুল বিশ্লেষকেও রূপান্তর করেছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিকাশে কামরুদ্দীন আহমদ কিংবা আবদুল হক সম্পাদিত। মাযহারের সুচারু গবেষণা সকল মহলেই আলোচিত।

প্রাবন্ধিক মাযহারকে গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ ও রচনা করা উচিত। সময় ও সুযোগ পেলে সেটা হবে।

তবে আহমাদ মাযহারের অন্য বিষয় নিয়ে কিছু বলি। মাযহার খেতে খুব ভালোবাসে। আমার রান্না মাযহারের খুব প্রিয়। আমার সবচেয়ে বাজে রান্নাও মাযহারের প্রশংসায় উৎকৃষ্ট হয়ে ওঠে। মাযহার সবকিছুকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারে। কারো কোন ক্ষতি মাযহার কখনো করেনি। পরগাছার মতো আচরণও নেই তার। মাযহার কুটকচালে স্বভাবের নয়। কারও বিরুদ্ধে সে কখনো উচ্চকণ্ঠ নয়। অসাধারণ ব্যক্তিক ক্ষমতা আছে মাযহারের। মিথ্যা অপবাদ দেয় না কাউকে। আর মানবিকতায় হৃদয় পূর্ণ তার। টাকার পেছনে কখনো সে দৌড়ায়নি। ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্য নিজেকে বিক্রি করেনি।

মাযহার অনেক উন্নত রুচি মনের মানুষ। অসম্ভব সৎ। তাই খুব দৃঢ়। তার প্রতিবাদের ভাষাও তীব্র। তার ভালোবাসার ক্ষমতাও তীব্র। আমি জীবনে সবচেয়ে বেশি মতামত ব্যক্ত করেছি মাযহারের কাছে। সাহিত্য নিয়ে সবচেয়ে বেশি কথা বলেছি মাযহারের সাথে। সবচেয়ে বেশি কর্ত-কুতর্ক করেছি মাযহারের সাথে।
আমাদের ঘনিষ্ঠজনেরা বহুবার সাক্ষী থেকেছেন মাযহার আর আমার ঝগড়ায়। আমি উচ্চকণ্ঠে ঝগড়া করি। মাযহার নিচুকণ্ঠে। বকুল হয়তো স্বামীর পক্ষ না নিয়ে বন্ধুর পক্ষ নিয়ে নিলো। তুষের আগুন জ্বলে উঠল তর্কে-বিতর্কে। পানাহারের সময় এই তর্ক বিতর্ক বেশি হয়। মাযহার এবং আমি- সামান্য পরিমাণ সোমরস গলধঃকরণ করি। খুব ভালোবাসি সোনালি তরল। একটু নিয়মিত খেতাম। আমাদের মদ্যপানের সবচেয়ে দীর্ঘতম সঙ্গী আমি আর মাযহার। মদ খাওয়ার পর নেশা চড়ে উঠলে কত যে ঝগড়া হয়েছে। আমাদের এই ঝগড়া দেখতে দেখতেই বড় হয়েছে অমি আর প্রিয়। ওদের মুখে থাকে লজ্জার হাসি।

ভ্রমণেও আমরা কটতর্কে পারঙ্গম। মনে পড়ে গোয়াতে অমির বকা খেয়ে ঝগড়া থামালাম। দার্জিলিঙে প্রিয় বকা দিলো। অমি-প্রিয় বড় হয়েছে। আমরা একসাথেই মদ্যপান করি। এসব নিয়ে মাযহার-আমার কোন সংস্কার নেই। চয়ন ইসলাম ও লিলি ইসলামও সংস্কারের বাইরে। চয়নদা’র বাসায় কত পার্টি হয়েছে আমি রান্না করি। হুইস্কি পান চলতে থাকে। আমাদের পরবর্তী জেনারেশন অমি, প্রিয়, ঋষভ আমরা একসাথে হইচই করি। পার্টি করি। খাইদাই। অবসরে ঘুরে বেড়াই।

বিজ্ঞাপন

আমাদের জীবনটার পেছন পানে তাকালে আনন্দে মন ভরে ওঠে।আমরা যা চেয়েছি তা পেয়েছি। মাযহারেরও কোন আক্ষেপ নেই। এখন সে নিউইয়র্কবাসী। মিউজিয়াম আর লাইব্রেরি ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই তো চেয়েছিলাম মাযহার। দেশে বিদেশে যেখানে থাকুক না কেন- বই পড়তে চেয়েছে মাযহার।
ঢাকায় যখই থাকে সব ধরনের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। গানের অনুষ্ঠান, মঞ্চ নাটক, নৃত্যানুষ্ঠান, আলোচনা অনুষ্ঠান, বই প্রকাশনা, সাহিত্য সভা- সুযোগ পেলেই মাযহার ছুটে চলে যাবে। পুরো অনুষ্ঠান মাযহার উপভোগ রবে।

মাযহার অসম্ভব ধৈর্যশীল। ধীরস্থির মাযহারের এই মানবিক ও ধৈর্যশীলতাকে আমি শ্রদ্ধা করি। মাযহারের নিষ্ঠার প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা। আমাদের সময়কালে মাযহারের মত অকুণ্ঠ নিষ্ঠার সাথে কেউ কাজ করেনি। মাযহারের প্রবন্ধ মৌলিক প্রতীম। আবদুল মান্নান সৈয়দের মত অসাধারণ প্রতিভাও এখন মাযহারের কল্যাণে জীবন্ত হয়ে আছে।

মাযহার যা বিশ্বাস করে তা অকপটে বলে। দ্বিধাহীন ভাবে বলে দেয়। মাযহারকে প্ররোচিত করে কিছু লোকনো যায় না। হৃদয় থেকে মাযহার লিখে থাকে। তাই অনুরোধ-উপরোধ তাকে প্রভাবিত করে না।

অর্থনৈতিকভাবে মধ্যবিত্ত জীবনের জন্য যা প্রয়োজন মাযহার সবই অর্জন করেছে। আমরা অতি দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসেছি। সংস্কার, গ্লানি, আত্মসম্মানবোধ সব কষ্ট করে অর্জন করেছি। মাযহারেরও পারিবারিক জীবন শৈশব-কৈশোরে আমাদের মতই ছিলো। তাই আমাদের বন্ধুত্ব গাঢ় হতে সময় লাগেনি। আমরা দারিদ্রের সমস্ত সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করেছি। এ আমাদের জীবনের বড় অর্জন। এসব অমি বা প্রিয় বুঝবে না। কারণ ওরা স্বচ্ছলতার মধ্যে বেড়ে উঠেছে।

কোন বিষয়ে জয়ী হতে চাইনি আমরা। আমরা আনন্দের মধ্যে দিন কাটাতে চেয়েছি। দুশ্চিন্তাহীন জীবন। বন্ধুবান্ধবদের সাথে হইচই হাসি আনন্দ গানে আমরা বুড়ো হয়ে গেলাম।

ঢাকায় থাকার সময় আমাদের প্রতিদিন দেখা হতো। সুদূর নিউইয়র্কে প্রতিদিন কোন এক বেলা মাযহারের সাথে কথা হয়। ভাবের আদান প্রদান হয়।

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারকে আমি মাযহার দুজনেই পিতার চেয়েও বেশি শ্রদ্ধা করি। ভালোবাসি। একদা হাতিরপুলে মাযহারের বাসায় কত আড্ডাই না আমরা দিয়েছি। ইদানিং আমার মোহাম্মদপুরের ফ্ল্যাটে। আড্ডায় নিত্যসঙ্গী সায়ীদ স্যার, লুৎফর রহমান রিটন, আসলাম সানী, আহমাদ মাযহার, আমি। সে সব আড্ডায় মধ্যরাত পর্যন্ত চলেছে। খাওয়া দাওয়া তর্ক আর পানাহার।

চয়নদার বাসাতেও আরেক রকম আড্ডা। গান। পান।

এখন যেন এসব স্মৃতি হয়ে গেছে! আবার সবাইকে এক হতে পারব? প্রাণের সখা আয় আয়। মিলনের ছন্দে আনন্দে আবার কি বাঁশি বাজবে?

সাহিত্য নিয়ে মাযহারের অনেক স্বপ্ন। বিশেষ করে বই ও বই সংক্রান্ত বিষয়ে ওর খুব আগ্রহ। বুক রিভিউ নিয়ে ‘বইয়ের জগৎ’ নামে একটি লিটল ম্যাগাজিনও দীর্ঘদিন সম্পাদনা করেছে। আশ্চর্য রকমের ক্রিয়েটিভ পত্রিকা ছিলো সেটা। ছোটদের জন্য একটা লিটল ম্যাগাজিনের আমৃত্য স্বপ্ন মাযহারের।

মাযহার এখন উন্নত বিশ্বে উন্নত সংস্কৃতি চেতনায় উন্নত স্বপ্ন দেখছে!

এবারও বইমেলায় মাযহার এক মাসের জন্য এলো। বইমেলা সরাসরি উপস্থাপনা করল। কিছু আড্ডা, কিছু কথকতা- সময় যেন উড়ে চলে গেল।

মাযহার ক্রিকেট পাগল। মাযহারে বিশ্ব ফুটবল দেখার পোকা। মাযহার ব্রাজিলের ঘোরতর সাপোর্টার। মাযহার রবীন্দ্র সঙ্গীত ভালোবাসে। মাযহার চিত্রকলার সমজদার। ইম্প্রেশনিক পেইন্টাররা মাযহারের খুব প্রিয়। সমা ও টেট গ্যালারিতে সে সব প্রত্যক্ষ করেছে মাযহার সাহেব।

মাযহারের সুস্থতা কামনা করি সবসময়। কারণ মাযহারই আমাদের বাঁচিয়ে রাখার ক্ষমতা রাখে। আমাদের নিয়ে মাযহার প্রবন্ধ লিখবে। সেই প্রবন্ধের মধ্যে যৎকিঞ্চিৎ সাহিত্য সাধনা যদি মূল্য পায় সেও কম কি!